Logo
Logo
×
   

Advertisement

আনন্দ নগর

তারকার ফ্যাশন যখন ট্রেন্ড

সালমান শাহর ফ্যাশনের শক্তি ছিল বৈচিত্র্যে। তিনি ওভারসাইজড ও ফিটেড, দুধরনের শার্টই পরতেন; ব্যাক-ব্রাশড হেয়ারস্টাইল ছিল তার পরিচয়ের অংশ। ব্যান্ডানা, নেপালি টুপি, মধ্যপ্রাচ্যের রুমাল, ব্রেসলেট, চেইন, রিং এবং বিভিন্ন ধরনের সানগ্লাস তার স্টাইলের উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ। গোলাকার, এভিয়েটর, ক্লাম্বমাস্টার ও ওয়েফেরার-বিভিন্ন ধরনের চশমায় তাকে দেখা গেছে।

Advertisement

এফ আই দীপু

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

তারকার ফ্যাশন যখন ট্রেন্ড

Advertisement

পর্দায় কিংবা কোনো উৎসবের লালগালিচায় প্রিয় তারকার পরিধেয় পোশাক কিংবা সাজসজ্জার অনুষঙ্গ দেখে ভক্তদের পরদিনই দোকানে গিয়ে একই সামগ্রী খোঁজা-এ দৃশ্য চিরাচরিত। একসময় সিনেমার নায়ক-নায়িকার পোশাক অনুকরণ করতে মানুষকে প্রেক্ষাগৃহ, পত্রিকার ফ্যাশন পাতা কিংবা টেলিভিশনের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন সেই প্রভাব কয়েকগুণ বেড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন শপিং ও তাৎক্ষণিক ছবির কারণে। ফলে হলিউড, বলিউড কিংবা ঢালিউডের তারকারা শুধু বিনোদনের মানুষ নন; তারা অনেক সময় হয়ে ওঠেন চলতি ফ্যাশনের ‘ট্রেন্ড সেটার’।

এর পেছনে যে শুধু অনুমান কাজ করে তা নয়, গবেষণায়ও এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালে জার্নাল অফ গ্লোবাল ফ্যাশন মার্কেটিং-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১ হাজার ৫৮ জন ভারতীয় ভোক্তার ওপর জরিপ করে দেখা গেছে, বলিউডের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ততা পোশাক নির্বাচন, পোশাক কেনা এবং চুলের স্টাইল-তিন ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব ছিল আরও বেশি।

* হলিউডে তারকার ফ্যাশন-প্রভাব

হলিউডে তারকার ফ্যাশন-প্রভাবের সবচেয়ে পরিষ্কার উদাহরণগুলোর একটি জেনডায়া। ফ্যাশন শপিং প্ল্যাটফর্ম লিস্ট-এর ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, অস্কারে জেন্ডায়ার হলুদ ভ্যালেন্টিনো পোশাক পরার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনলাইনে ওই রঙের পোশাকের অনুসন্ধান বেড়েছিল ২২২ শতাংশ। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে তার বালমেইন-এর ‘ওয়েট-লুক’ পোশাকের পর ব্র্যান্ডটির পোশাকের অনুসন্ধান বেড়ে যায় ১৯০ শতাংশ; আর ভারসাচি পরার পর ৪৮ ঘণ্টায় ওই ব্র্যান্ডের পোশাকের অনুসন্ধান বাড়ে ১২২ শতাংশ।

অর্থাৎ তারকার পোশাক শুধু ‘ভালোলাগা’র বিষয় নয়, তা সরাসরি মানুষের অনুসন্ধান ও কেনাকাটার আচরণ বদলাতে পারে।

বেলা হাদিদ-এর ক্ষেত্রেও একই চিত্র। লিস্ট-এর ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, তার পোশাকের পর অনুরূপ পোশাকের অনুসন্ধান গড়ে ১ হাজার ৯০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তার পরা কোরসেটের অনুসন্ধান ৭০ শতাংশ এবং কার্গো প্যান্টের অনুসন্ধান ৫৬ শতাংশ বেড়েছিল। নিউইয়র্কে তার পরা আল্ট্রা-মিনি প্ল্যাটফর্ম উগ বুটসের অনুসন্ধান ২৪ ঘণ্টায় বেড়েছিল ১৫২ শতাংশ এবং জুতাটি দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।

হলিউডের এই প্রভাব অবশ্য নতুন নয়। জেমস ডিনের ডেনিম, সাদা টি-শার্ট ও লেদার জ্যাকেট একসময় তারুণ্যের বিদ্রোহী পুরুষত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। আজ সেই প্রভাব ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, গুগল সার্চ ও ই-কমার্স-এর মাধ্যমে আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গুগল-এর দীর্ঘমেয়াদি ফ্যাশন সার্চ তথ্যেও কিম কার্দাশিয়ান, জেনিফার এনিস্টোন, সেলেনা গোমেজের মতো তারকারা সবচেয়ে বেশি অনুসন্ধান করা স্টাইল আইকনদের তালিকায় ছিলেন।

* বলিউডে তারকা ও ফ্যাশনের সম্পর্ক

বলিউডে তারকা ও ফ্যাশনের সম্পর্ক আরও গভীর। শাহরুখ খান, সালমান খান, কাজল, কারিনা কাপুর, দীপিকা পাড়ুকোন, আলিয়া ভাট, ক্যাটরিনা কাইফ, প্রত্যেকেরই এমন পোশাক রয়েছে, যা সিনেমার পর্দা ছাড়িয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান, পার্টি কিংবা সাধারণ পুরুষ কিংবা নারীর পোশাকে জায়গা করে নিয়েছে।

বলিউডের প্রখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার মনিশ মালহোত্রার কাজ এ সম্পর্কের বড় উদাহরণ। তিনি জানান, ১৯৯৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রঙিলা’ সিনেমায় উর্মিলা মাতন্ডকরের ক্রপ টপ, ডানগারি, টি-শার্ট ও জিন্স তরুণদের নজর কাড়ে এবং ওই সময়ের জন্য নতুন ধারা তৈরি করে। ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ সিনেমায় ট্র্যাক প্যান্টস, ক্রপ টপস ও ব্রেসলেটও তিনি ব্যবহার করেছিলেন, যে ধরনের পোশাক পরবর্তী সময়ে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। মালহোত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, সিনেমার জনপ্রিয়তার সঙ্গে তার ডিজাইনের চাহিদাও বেড়েছে। তিনি বলেন, বলিউড-প্রভাবিত বিয়ের সংস্কৃতি এত শক্তিশালী হয়েছে যে, পর্দায় তার তৈরি পোশাক দেখে অনেক কনে নিজেদের বিয়ের পোশাক ও এমনকি বিয়ের সাজসজ্জা পরিকল্পনা করতে চেয়েছেন।

অন্যদিকে আরেক ফ্যাশন ডিজাইনার সব্যসাচী মুখোপাধ্যায় তারকা ও সাধারণ মানুষের পোশাকের পার্থক্যকে খুব বড় করে দেখেন না। তিনি বলেন, তারকা কিংবা সাধারণ মানুষ, দুজনকেই শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী পোশাক পরানো হয়। তার নকশার শাড়ি আলিয়া ভাট, আনুশকা শর্মা, ক্যাটরিনা কাইফ থেকে শুরু করে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ও হলিউড তারকাদের পোশাকেও দেখা গেছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীপিকা পাড়ুকোন ও অন্য তারকারা শাড়ি পরার মাধ্যমে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী পোশাককে নতুন করে বৈশ্বিক আলোচনায় এনেছেন। সব্যসাচীর নিজস্ব ইতিহাসেও দেখা যায়, ২০২২ সালে দীপিকার আন্তর্জাতিক রেড কার্পেটে শাড়ি পরা এবং পরবর্তী সময়ে মেট গালায় শাড়ির উপস্থিতি এই পোশাককে বৈশ্বিক ফ্যাশন আলোচনায় আরও দৃশ্যমান করে।

* ঢালিউডের চিরসবুজ উদাহরণ সালমান শাহ

বাংলাদেশে তারকা-ফ্যাশনের সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ সম্ভবত সালমান শাহ। ৯০-এর দশকে তিনি শুধু জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন না, তরুণদের পোশাক ও চেহারার ভাষাই বদলে দিয়েছিলেন। ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ (১৯৯৩)-এর পর তার স্লেক সানগ্লাস, টুপি ও আধুনিক পোশাক তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। সালমান শাহর ফ্যাশনের শক্তি ছিল বৈচিত্র্যে। তিনি ওভারসাইজড ও ফিটেড, দুধরনের শার্টই পরতেন; ব্যাক-ব্রাশড হেয়ারস্টাইল ছিল তার পরিচয়ের অংশ। ব্যান্ডানা, নেপালি টুপি, মধ্যপ্রাচ্যের রুমাল, ব্রেসলেট, চেইন, রিং এবং বিভিন্ন ধরনের সানগ্লাস তার স্টাইলের উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ। গোলাকার, এভিয়েটর, ক্লাম্বমাস্টার ও ওয়েফেরার, বিভিন্ন ধরনের চশমায় তাকে দেখা গেছে।

বাংলাদেশি ফ্যাশনসংশ্লিষ্টদের মতে, তার কালারসেন্সও ছিল আলাদা; ন্যাচরাল শেডের পোশাক ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই অনুষঙ্গ তাকে সময়ের চেয়ে এগিয়ে রেখেছিল। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগের বহু আগে তার স্টাইল গণমানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। অর্থাৎ সেলেব্রিটি ফ্যাশনের প্রভাব যে শুধু সোশ্যাল মিডিয়ানির্ভর নয়, সালমান শাহ তার জীবন্ত প্রমাণ।

* কেন তারকাদের অনুসরণ করে মানুষ

তারকার পোশাকের প্রতি আকর্ষণের পেছনে রয়েছে পরিচিতির শক্তি। দর্শক তারকার সঙ্গে আবেগগতভাবে যুক্ত থাকেন। প্রিয় অভিনেতার পোশাক তাই শুধু পোশাক থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে তার জীবনযাপন, আত্মবিশ্বাস কিংবা ব্যক্তিত্বের প্রতীক।

গবেষণায়ও সেলেব্রিটি এনডোর্সমেন্টের কার্যকারিতা পাওয়া গেছে। ৪৬টি গবেষণা এবং ১০ হাজার ৩৫৭ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে করা একটি মেটা-এনালাইসিস দেখিয়েছে, সেলেব্রিটি এনডোর্সমেন্টের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে, যদিও সেই প্রভাব নির্ভর করে ব্যক্তি, পণ্য ও পরিস্থিতির ওপর।

তবে ফ্যাশন ডিজাইনার সব্যসাচী একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও দিয়েছেন। তার মতে, তারকারা যখন অতিরিক্তভাবে স্টাইলিস্টনির্ভর হয়ে পড়েন এবং নিজের পোশাক নির্বাচনে ব্যক্তিগত ভূমিকা হারান, তখন তাদের ‘স্টাইল আইকন’ হয়ে ওঠার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এ কারণেই হয়তো সালমান শাহর মতো তারকার প্রভাব এত দীর্ঘস্থায়ী। তিনি শুধু পোশাক পরতেন না, পোশাককে নিজের ব্যক্তিত্বের অংশ করে তুলেছিলেন।

তবে, তারকা ও সাধারণ মানুষের ফ্যাশনের সম্পর্ক একমুখী নয়। তারকারা যেমন সাধারণ মানুষের পোশাকের পছন্দ বদলান, তেমনি মানুষের চাহিদা, সামাজিক মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া ও বাজারের প্রবণতাও তারকাদের নতুন পোশাক বেছে নিতে বাধ্য করে। এ পারস্পরিক আদান-প্রদানের মধ্যেই তৈরি হয় ‘ট্রেন্ড’। আর সিনেমার পর্দায় এক তারকার শরীরে দেখা সেই ট্রেন্ড কখন যে পাশের বাড়ির তরুণের শার্ট, তরুণীর শাড়ি কিংবা বিয়ের সাজে পৌঁছে যায়, তার হিসাব রাখা কঠিন। সেটিই তারকা-ফ্যাশনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম