নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা সিনেমায় কতটা প্রতিফলিত?
Advertisement
কাজী নজরুল ইসলামের গল্প নিয়ে নির্মিত ‘রাক্ষুসী’ সিনেমার একটি দৃশ্যে রোজিনা।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কাজী নজরুল ইসলাম শুধু একজন কবিই নন, একইসঙ্গে তিনি ছিলেন সিনেমার মানুষও। বাংলা সিনেমার শুরুর যুগেই তিনি সরাসরি এ মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি বাংলা ভাষার প্রথম কবি যিনি সিনেমার সবক’টি শাখায় কাজ করে সাফল্যের বিরল নজির স্থাপন করেছেন। তিনি ছিলেন কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার, সুরকার, পরিচালক, অভিনেতা। শুধু ক্যামেরা ছাড়া সব শাখায় কাজ করেছেন তিনি। অর্থাৎ নজরুলকে শুধু সিনেমায় যুক্ত একজন কবি হিসাবে দেখলে তার চলচ্চিত্র-সম্পর্কের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তবে কবির সরাসরি সম্পৃক্ততার পরবর্তী সময়ে সিনেমায় তার উপস্থিতির প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে গান। ২০টির বেশি সিনেমায় নজরুলের গান বা সাহিত্য ব্যবহারের নজির পাওয়া যায়। এসব সিনেমায় একটি প্রবণতা চোখে পড়ে, নজরুলের প্রেম, বিরহ ও আবেগের গান সিনেমায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও তার বিদ্রোহী, সাম্যবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সরাসরি চলচ্চিত্রায়ণ তুলনামূলকভাবে সীমিত।
* একই গান, ভিন্ন সময়ের প্রতিবাদ
নজরুলের সিনেমা-উপস্থিতির সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’। গানটি ১৯৪৯ সালের প্রথমবার নির্মল চৌধুরী পরিচালিত ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’ সিনেমায় ব্যবহৃত হয় ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আবহ তৈরি করতে। পরে ১৯৭০ সালে জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় একই গান নতুন রাজনৈতিক অর্থ পায়। ‘জীবন থেকে নেয়া’তে ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’-এর পাশাপাশি ‘এই শিকল-পরা ছল মোদের’ গানটিও ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তানি শাসনের শেষ পর্যায়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বন্দিত্ব, শোষণ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গানগুলো যুক্ত হয়ে ওঠে। ফলে এখানে নজরুল শুধু একজন গীতিকার নন; তার গান সিনেমার রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সিনেমা-গবেষণামূলক আলোচনাতেও ‘জীবন থেকে নেয়া’য় নজরুলের গানকে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উপাদান হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ দুটি সিনেমা পাশাপাশি রাখলে নজরুলের গানের একটি বিশেষ শক্তি স্পষ্ট হয়। ১৯৫০-এর দশকের ঔপনিবেশিকবিরোধী প্রেক্ষাপট হোক কিংবা ১৯৭০-এর দশকের বাঙালির রাজনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, একই গান সময় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে নতুন অর্থ তৈরি করতে পেরেছে।
* জাতীয় আবেগে নজরুল
১৯৬৭ সালের ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ সিনেমায় ব্যবহৃত নজরুলের ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফিরে একা’ ও ‘এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে’ গান দুটি জাতীয় ও ঐতিহাসিক আবেগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে সিনেমা-সংক্রান্ত একাধিক গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। এখানে নজরুলের বিদ্রোহ সরাসরি রাজনৈতিক স্লোগানে রূপ নেয়নি। বরং ইতিহাস, দেশ ও হারানোর বেদনার মধ্য দিয়ে তার গান সিনেমার আবেগকে গভীর করেছে। অর্থাৎ সিনেমায় নজরুলের রাজনৈতিক চেতনার একটি পরোক্ষ ব্যবহারও দেখা যায়।
* প্রেমের দৃশ্যে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান নজরুল
সিনেমার দীর্ঘ তালিকায় চোখ রাখলে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে অন্য এক নজরুল, প্রেম ও বিরহের নজরুল। ‘বধূ বিদায়’ সিনেমায় ‘আমার যাবার সময় হলো দাও বিদায়’, ‘লাইলী মজনু’-তে ‘লাইলী তোমার এসেছে ফিরিয়া, মজনু গো আঁখি খোলো’, ‘আগমন’-এ ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর’, ‘দুষ্টু ছেলে মিষ্টি মেয়ে’-তে ‘মোর প্রিয়া হবে ওগো রানী’, ‘চন্দ্রকথা’-তে ‘পথহারা পাখি’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’-এ ‘দূরদীপ বাসিনী’-এমন আরও বহু সিনেমায় নজরুলের গান প্রেম, বিরহ ও আবেগের আবহ তৈরি করেছে। ‘মেহের নিগার’ এ ক্ষেত্রে বিশেষ উদাহরণ। সিনেমাটিতে নজরুলের একাধিক গান ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। ‘এসো সুন্দর হে’, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’, ‘শাওন রাতে যদি’, ‘চেয়ো না সুনয়না’, ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার’ এবং ‘পদ্মার ঢেউ রে’সহ বেশ কিছু গান সিনেমার আবেগ, প্রেম ও বিচ্ছেদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এ তালিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে, সিনেমা কি নজরুলের বহুমাত্রিক সত্তার মধ্যে সবচেয়ে সহজপাচ্য, সুরেলা ও রোমান্টিক অংশটিকেই বেশি গ্রহণ করেছে? এখানে অবশ্য সতর্কতা জরুরি। শুধু গানের সংখ্যা দিয়ে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে, নির্মাতারা ইচ্ছাকৃতভাবে নজরুলের বিদ্রোহী সত্তাকে এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু প্রাথমিক নমুনায় প্রেম, বিরহ ও আবেগের গান যে দৃশ্যত বেশি উপস্থিত, তা অস্বীকার করার উপায়ও নেই।
* সাহিত্য থেকে পর্দায় অন্য এক নজরুল
নজরুলের সিনেমা-উপস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পাওয়া যায় ‘মেহের নিগার’ ও ‘রাক্ষুসী’-তে। এখানে তিনি শুধু গানের উৎস নন, সাহিত্যিক উৎসও। ‘রাক্ষুসী’ নজরুলের ‘রিক্তের বেদন’ গল্পগ্রন্থের গল্প অবলম্বনে নির্মিত। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র বিন্দি, এক প্রান্তিক নারী, যে পারিবারিক সহিংসতা ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সিনেমাটিতে নজরুলের ‘আয় ওলো সই খেলবি খেলা’ ও ‘ওরে নাইয়া ধীরে চালাও তরণী’ গান ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া যায়। এখানে নজরুলের সাহিত্যকে সিনেমার ভাষায় রূপান্তরের প্রশ্নটি সামনে আসে। তার গল্পের সামাজিক বাস্তবতা, প্রান্তিক মানুষের জীবন ও নারীর অবস্থান কতটা অক্ষুণ্ন থাকে? আর কতটাই বা বদলে যায় সিনেমা নির্মাণভাষায়? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে শুধু গান নয়, মূল সাহিত্যকর্ম ও সিনেমা, দুটিকেই পাশাপাশি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
* যে নজরুল এখনো পর্দার অপেক্ষায়
নজরুলের সাহিত্য ও গানকে সিনেমায় ব্যবহারের ইতিহাসে তাই একটি বৈপরীত্য দেখা যায়। একদিকে তার গান রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় অসাধারণ শক্তি অর্জন করেছে। ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ তার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। অন্যদিকে বেশিসংখ্যক সিনেমায় তার গান এসেছে প্রেম, বিরহ ও আবেগের অনুষঙ্গ হিসাবে। ফলে প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট হয়ে ওঠে, সিনেমায় নজরুলের গান আছে, কিন্তু নজরুলের দর্শন কী আছে? পুরোপুরি এমনও বলা যাবে না। ‘জীবন থেকে নেয়া’র মতো সিনেমা প্রমাণ করে, নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা সিনেমার রাজনৈতিক ভাষাকে শক্তিশালী করতে পারে। ‘রাক্ষুসী’র মতো সাহিত্যনির্ভর কাজ আবার তার সামাজিক চিন্তা ও চরিত্র নির্মাণের সম্ভাবনা দেখায়। কিন্তু এসব উদাহরণ ধারাবাহিক কোনো সিনেমা-প্রবাহ তৈরি করতে পারেনি। নজরুলের চিন্তার পরিধি ছিল আরও বিস্তৃত। তার বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত ছিল সাম্য, শোষিত মানুষের পক্ষে অবস্থান, ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরোধিতা এবং মানুষের মর্যাদার প্রতি গভীর আস্থা। অথচ এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে পূর্ণাঙ্গ সিনেমা নির্মাণের নজির তুলনামূলকভাবে কম।
* কেন এমন হচ্ছে
এর কারণ খুঁজতে গেলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে। নজরুলের জীবন ও চিন্তা অত্যন্ত বহুমাত্রিক; তাকে সরল জীবনীতে আটকে রাখা কঠিন। তার রাজনৈতিক অবস্থান, সাম্যবাদী ভাবনা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও বিদ্রোহকে সিনেমার কাহিনিতে রূপ দিতে গবেষণা ও ঐতিহাসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। পাশাপাশি বাণিজ্যিক সিনেমায় প্রেম ও আবেগের গান সহজে ব্যবহারযোগ্য; বিপরীতে সাম্য, শ্রেণি-বৈষম্য বা অসাম্প্রদায়িকতার মতো বিষয় গল্পের কাঠামোর গভীরে নিয়ে যেতে হয়। তবে এখানেই নতুন নির্মাতাদের জন্য সুযোগ রয়েছে। সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় বিভাজন, নারী-পুরুষের অসমতা, শ্রমজীবী মানুষের সংকট কিংবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো সমকালীন প্রশ্নকে নজরুলের চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করে নতুন সিনেমা নির্মাণ সম্ভব।
* শুধু গান নয়, নজরুলের চিন্তুাও ফিরুক
সিনেমায় নজরুলের উপস্থিতি তাই একেবারে অনুপস্থিত নয়; বরং তিনি আছেন বহুবার, গানে, সুরে, প্রেমে, বিরহে, রাজনৈতিক প্রতিবাদে এবং কখনো সাহিত্যের চরিত্রে। কিন্তু এ উপস্থিতির মধ্যে তার বিদ্রোহী ও মানবতাবাদী দর্শন কতটা বিস্তৃতভাবে জায়গা পেয়েছে, সেই প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। এ পর্যন্ত নির্মিত সিনেমাগুলো অন্তত একটি প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করে; পর্দায় সবচেয়ে সহজে ফিরে আসছেন প্রেমিক নজরুল; বিশেষ মুহূর্তে জেগে উঠছেন বিদ্রোহী নজরুল; কিন্তু সাম্যবাদী, মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক নজরুল এখনো অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। রুপালি পর্দায় নজরুলকে সত্যিকার অর্থে ফিরিয়ে আনা মানে শুধু তার গানকে নতুন সুরে গাওয়া নয়। তার প্রশ্নগুলোকে নতুন করে করা, তার প্রতিবাদের কারণগুলোকে বর্তমান সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা এবং তার মানবতার দর্শনকে গল্প ও চরিত্রের মধ্যে জীবন্ত করে তোলা। কারণ নজরুলকে স্মরণ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হয়তো তার গান বাজানো নয়, তার বিদ্রোহের কারণগুলোকে নতুন করে পর্দায় তুলে ধরা।

