কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কি বিনোদনশিল্পের জন্য হুমকি?
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একসময় সিনেমায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছিল কল্পবিজ্ঞানের বিষয়। এখন সেই কল্পনাই ক্যামেরার সামনে। চরিত্র তৈরি, কণ্ঠস্বর বদল, বয়স কমানো, সেট বানানো, ভিএফএক্স, চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে পুরো সিনেমা তৈরিতেও ঢুকে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। ফলে প্রশ্নটি এখন আর ‘এআই বিনোদন দুনিয়া তথা সিনেমায় আসবে কি না’ নয়; বরং এআই আসার পর সিনেমায় মানুষের জায়গাটা কতটা থাকবে, তা নিয়ে। বিশ্বজুড়ে এর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, এআই একইসঙ্গে বিনোদন শিল্পের জন্য সুযোগ এবং হুমকি।
* পুরো সিনেমাই যখন এআইয়ের তৈরি
এআই দিয়ে নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার পরীক্ষাও শুরু হয়ে গেছে। হলিউডে তো বটে, উপমহাদেশেও এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালে ভারতের কর্ণাটকের নির্মাতা এস. নারসিমহামূর্তি নির্মাণ করেন কন্নড় সিনেমা ‘লাভ ইউ’। নির্মাতাদের দাবি, এটি পুরোপুরি এআই ব্যবহার করে তৈরি প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমাগুলোর একটি; ৯৫ মিনিটের সিনেমাটি সিবিএফসি সনদও পায়। এর নির্মাণ ব্যয় ছিল আনুমানিক ১০ লাখ রুপি।
ভারতে একই সময়ে ‘মহারাজ ইন ডেনিমস’ ও ‘নাইশা-এর মতো প্রকল্প সামনে আসে। ‘মহারাজ ইন ডেনিমস’-এর নির্মাতারা এআই দিয়ে চরিত্র, দৃশ্য ও ভিজ্যুয়াল তৈরির মাধ্যমে বড় বাজেটের ঐতিহাসিক গল্পকে কম খরচে পর্দায় আনার চেষ্টা করেছেন। ‘নাইশা’-র পরিচালক বিবেক আঞ্চালিয়া জানিয়েছেন, সিনেমাটির পেছনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ ঘণ্টা এআই-নির্ভর কাজ হয়েছে।
বলিউডে এআই-নির্ভর সিনেমার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হতে যাচ্ছে ‘চিরঞ্জীবি হনুমান : দ্য ইটারনাল’। জাতীয় পুরস্কারজয়ী পরিচালক রাজেশ মাপুসকর পরিচালিত এ সিনেমাটি আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মুক্তির কথা রয়েছে। নির্মাতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ভারতের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এআই-নির্মিত প্রেক্ষাগৃহের সিনেমা হিসাবে হাজির হতে যাচ্ছে।
* এআই-সহায়িত সিনেমার সাফল্যও কম নয়
তবে এআই দিয়ে তৈরি সিনেমা বলতে শুধু পুরো সিনেমাকে বোঝালে বাস্তব চিত্রটি অসম্পূর্ণ থাকবে। ইতোমধ্যে হলিউড ও বলিউডের বড় বড় সিনেমায় এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৪ সালের হরর সিনেমা ‘লেট নাইট উইথ দ্য ডেভিল’-এ মাত্র কয়েকটি এআই-নির্মিত ছবি ব্যবহারের খবর প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র সমালোচনা হয়। কিন্তু বিতর্ক সিনেমাটির ব্যবসা থামাতে পারেনি। এটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ কোটি ৫৪ লাখ ডলার আয় করে; যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বোধনী সপ্তাহেই আয় করে ২৮ লাখ ডলারের বেশি।
অন্যদিকে এআই-নির্ভর প্রযুক্তি বড় বাজেটের সিনেমায় খরচ ও সময় কমাতেও সাহায্য করছে। ‘দ্য ব্রুটালিস্ট’-এ অভিনেতা অ্যাড্রিয়ান ব্রডি ও ফেলিসিটি জোন্সের হাঙ্গেরিয়ান উচ্চারণ পরিশুদ্ধ করতে রিস্পিচার-এর এআই ভয়েস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। অর্থাৎ এআই অভিনেতার অভিনয় করেনি; বরং মানুষের অভিনয়কে পরিশীলিত করেছে।
ভারতেও প্রযুক্তির সম্ভাবনা দেখা গেছে। ২০২৫ সালের অ্যানিমেশন সিনেমা ‘মহাঅবতার নরশিমা’ এআই-সহায়ক প্রযুক্তি ও আধুনিক অ্যানিমেশন ব্যবহারের মাধ্যমে বড় বাণিজ্যিক সাফল্য পায়। বিভিন্ন বক্স অফিস হিসাবে এর বিশ্বব্যাপী আয় প্রায় ৩০০ কোটি রুপি ছাড়িয়েছে, আর নির্মাণ ব্যয় ছিল আনুমানিক ৪০ কোটি রুপি।
তবে বিপরীত উদাহরণও আছে। ‘দ্য লাস্ট স্ক্রিনরাইটার’-এর চিত্রনাট্য পুরোপুরি চ্যাটজিপিটি দিয়ে লেখা হয়েছিল। লন্ডনের প্রিন্স চার্লস সিনেমাহলে এর প্রিমিয়ার হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ২০০টি অভিযোগের পর প্রদর্শনী বাতিল হয়। পরে এটি অনলাইনে প্রকাশ করা হয়।
* বলিউডে ভয়টা আরও ব্যক্তিগত
অভিনেতাদের জন্য সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ‘ডিজিটাল ডাবল’। মুখ, কণ্ঠ, শরীর-সবকিছুই যখন অ্যালগরিদম নকল করতে পারে, তখন একজন তারকার উপস্থিতির মূল্য কোথায়? বলিউড অভিনেতা অভিষেক বচ্চন সরাসরি বলেছেন, ‘এআই স্কেয়ারস মি’, অর্থাৎ এআই নিয়ে তিনি শংকিত। তার মতে, সঠিকভাবে ব্যবহার না হলে এটি অভিনেতাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, দর্শক সিনেমায় মানুষের অসম্পূর্ণতার সঙ্গেও সংযোগ খুঁজে পায়। অন্যদিকে পরিচালক শেখর কাপুর ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি আঁকছেন। তার বক্তব্য, একসময় অমিতাভ বচ্চন বা শাহরুখ খানের মতো তারকার প্রয়োজন নাও হতে পারে; পরিচালক এআই দিয়ে নিজের ‘স্টার’ তৈরি করতে পারবেন এবং সেই চরিত্রের ওপর নিজস্ব কপিরাইটও রাখতে পারবেন। এটি নিছক ভবিষ্যৎ-কল্পনা নয়। ভারতের আদালত দেশটির বেশ কয়েকজন তারকাশিল্পীর নাম, ছবি, কণ্ঠ ও ব্যক্তিত্ব এআই, ডিপফেক বা অন্য প্রযুক্তির মাধ্যমে অনুমতি ছাড়া ব্যবহারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।
* হলিউডেও তারকারা সতর্ক
হলিউডের আশঙ্কা আরও পুরোনো। ২০২৩ সালের লেখক ও অভিনেতাদের ধর্মঘটের অন্যতম বড় ইস্যু ছিল এআই। অভিনেতা টম হ্যাঙ্কস তার চেহারা ব্যবহার করে এআই-নির্মিত ভুয়া বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে ভক্তদের সতর্ক করেছেন। অভিনেত্রী স্কারলেট জোহানসন-এর সঙ্গে ওপেনএআই-এর ‘স্কাই’ কণ্ঠ নিয়ে বিতর্কও দেখিয়েছে, একজন তারকার কণ্ঠ কত সহজে প্রযুক্তির মাধ্যমে অনুকরণ করা যায় এবং সম্মতি ও অধিকার কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালেও উদ্বেগ কমেনি। যুক্তরাজ্যে নিকোলা কফলান, হিউ বনেভিল, ম্যাট লুকাসসহ বহু অভিনয়শিল্পী অনুমতি ছাড়া এআই ভয়েস ক্লোনিংয়ের বিরুদ্ধে প্রচারে যুক্ত হয়েছেন।
* বিশেষজ্ঞদের চোখে ভবিষ্যৎ
এআইয়ের অন্যতম পথিকৃৎ নোবেলজয়ী জিওফ্রি হিন্টন প্রযুক্তির কারণে ব্যাপক কর্মসংস্থান সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে মেটার প্রধান এআই বিজ্ঞানী ইয়ান লেকুন এআই নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কের সমালোচনা করেছেন এবং মনে করেন, সঠিক কাঠামো ও নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সিনেমা গবেষণাতেও দেখা যাচ্ছে, এআই ইতোমধ্যে সম্পাদক, ভিএফএক্স শিল্পী, সাউন্ড ডিজাইনারসহ একাধিক কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। তবে গবেষকদের মতে, মানবিক অভিজ্ঞতা, আবেগ, ব্যর্থতা ও ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এখনো চলচ্চিত্রের সৃজনশীলতার কেন্দ্রে।
* হুমকি, নাকি নতুন হাতিয়ার
এআইয়ের সুবিধা স্পষ্ট-কম খরচে বড় দৃশ্য, দ্রুত ভিএফএক্স, বয়স পরিবর্তন, বহুভাষিক ডাবিং, ভার্চুয়াল চরিত্র, ছোট নির্মাতার হাতে বড় বাজেটের কল্পনা বাস্তবায়ন এবং প্রাক-প্রযোজনার সময় কমানো। ভারতের সিনেমা শিল্পে এআই ব্যবহারে কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় প্রচলিত পদ্ধতির এক-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত নামতে পারে বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু বিপদও ততটাই বাস্তব, চাকরি হারানো, শিল্পীর কণ্ঠ ও চেহারা চুরি, কপিরাইট লঙ্ঘন, ডিপফেক, ভুয়া তথ্য এবং সবচেয়ে বড় কথা মানবিক সৃজনশীলতার অবমূল্যায়ন। তাই এআইকে সিনেমার ‘ভিলেন’ বানিয়ে থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আবার তাকে অবাধে ছেড়ে দেওয়াও বিপজ্জনক। ভবিষ্যতের সিনেমা সম্ভবত হবে মানুষ ও মেশিনের যৌথ সৃষ্টি, যেখানে গল্প, আবেগ ও সিদ্ধান্ত থাকবে মানুষের হাতে; আর এআই হবে শক্তিশালী সহকারী। কারণ দর্শক শেষ পর্যন্ত নিখুঁত সিনেমা দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যায় না; যায় একটি গল্পে নিজেকে খুঁজে পেতে। সেই অনুভূতিটাই আপাতত এআইয়ের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা।

