Logo
Logo
×
   

Advertisement

আনন্দ নগর

কল্পনার চেয়ে বাস্তবের গল্পেই কেন মজছেন দর্শক

Advertisement

এফ আই দীপু

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কল্পনার চেয়ে বাস্তবের গল্পেই কেন মজছেন দর্শক

‘পরাণ’ সিনেমার একটি দৃশ্যে শরীফুল রাজ ও বিদ্যা সিনহা মিম।

Advertisement

পর্দায় একসময় দর্শক খুঁজতেন স্বপ্ন, অসম্ভবকে সম্ভব করা নায়ক, অবিশ্বাস্য প্রেম, চোখ ধাঁধানো অ্যাকশন কিংবা বাস্তবতার বাইরে কোনো রোমাঞ্চকর জগৎ। এখন সেই চাহিদার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে আরেক প্রবল আকর্ষণ, নিজের জীবনকে পর্দায় দেখা। যে গল্পে নায়ক-নায়িকা খুব সাধারণ, সমস্যাগুলো পরিচিত, সম্পর্কগুলো জটিল এবং শেষটাও সবসময় রূপকথার মতো নয়। বিশ্বজুড়ে সিনেমার এই পরিবর্তনকে বলা যায় বাস্তবতার দিকে প্রত্যাবর্তন। হলিউড, বলিউড থেকে বাংলাদেশের সিনেমা, সবখানেই দর্শকের একটি বড় অংশ এখন এমন গল্প চাইছেন, যার সঙ্গে নিজের জীবন, সমাজ ও অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

* নায়ক নয়, এখন গল্পই প্রধান

বাস্তবধর্মী সিনেমা মানেই শুধু সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত সিনেমা নয়। সাধারণ মানুষের জীবন, সামাজিক সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন, শ্রেণি বৈষম্য, পেশাগত চাপ, একাকিত্ব কিংবা সমকালীন রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতাও এর বিষয় হতে পারে। মূল কথা হলো, গল্প ও চরিত্র যেন দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।

বলিউডে ‘দ্য লাঞ্চবক্স’, ‘পিকু’, ‘মাসান’, ‘গাল্লি বয়’, ‘আর্টিকেল ১৫’, ‘নিউটন’, ‘টুয়েন্টিথ ফেল’ কিংবা ‘জলি এলএলবি’-এর মতো সিনেমা দেখিয়েছে, বড় বাজেট বা অতিমানবীয় নায়ক ছাড়াও দর্শককে হলে টানা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বাস্তব ঘটনা ও মানুষের জীবনের গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমার পরিসরও বেড়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমকে বলিউড অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ী বলেছেন, বাস্তবধর্মী সিনেমায় বড় তারকারা যুক্ত হওয়ায় এসব গল্প এখন আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। তার ভাষায়, দর্শক বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সহজেই সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন।

* কেন এই পরিবর্তন

এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত দর্শকের সচেতনতা বৃদ্ধি। ইন্টারনেট, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে দর্শক এখন শুধু নিজ দেশের সিনেমা দেখেন না; বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সিনেমা ও সিরিজ সহজেই দেখার সুযোগ পান। ফলে গল্প বলার ধরন, অভিনয়, নির্মাণশৈলী, সবকিছু বিচার করার ক্ষমতাও বেড়েছে।

নির্মাতা মধুর ভান্ডারকর মনে করেন, ওটিটির কারণে দর্শক বিশ্ব সিনেমার সঙ্গে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত হয়েছেন। ফলে বলিউডের গল্প বলার ধরনও বদলেছে। তার নিজের নির্মাণের ধরনও বাস্তবতাকেন্দ্রিক বলে জানিয়েছেন তিনি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘কৃত্রিম বাস্তবতা’। প্রতিদিন মানুষ এমন এক দুনিয়া দেখছেন যেখানে সবাই যেন সুখী, সফল ও নিখুঁত। সেই অতিরঞ্জিত বাস্তবতার বিপরীতে সিনেমায় দর্শক খুঁজছেন অসম্পূর্ণ, দুর্বল ও মানবিক চরিত্র। সাম্প্রতিক সিনেমা বিশ্লেষণেও বলা হচ্ছে, সামাজিক মাধ্যমে সাজানো জীবনের ভিড়ে মানুষ পর্দায় আরও বেশি সত্যতা ও স্বাভাবিকতা খুঁজছেন।

* বাংলাদেশেও বদলটা স্পষ্ট

বাংলাদেশের সিনেমায়ও গত কয়েক বছরে এ পরিবর্তনের শক্তিশালী উপস্থিতি দেখা গেছে। আয়নাবাজি, পরাণ, রেহানা মরিয়ম নূর, সুড়ঙ্গসহ বিভিন্ন সিনেমা দর্শকের সামনে প্রচলিত নায়ক-নায়িকা নির্ভরতার বাইরে নতুন ধরনের গল্প ও চরিত্র হাজির করেছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে ‘পরাণ’র সাফল্য ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। পরাণ মাত্র ১১টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলেও চতুর্থ সপ্তাহে ৬০টি হলে প্রদর্শিত হয়। এ সিনেমা দেখিয়েছে, দর্শক শুধু পরিচিত ফর্মুলা নয়, নতুন পরিবেশ ও নতুন ধরনের গল্পও গ্রহণ করতে প্রস্তুত। সিনেমাটির পরিচালক রায়হান রাফি নিজেও স্বীকার করেছিলেন, তিনি শুরুতে ভাবেননি যে গল্পটি সব শ্রেণির দর্শকের সঙ্গে এতটা সংযোগ তৈরি করবে। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের প্রতিক্রিয়া তাকে সেই ধারণা বদলাতে বাধ্য করে।

বাংলাদেশে বাস্তব ঘটনা নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত শিশুতোষ সিনেমা ‘ছুটির ঘণ্টা’ ছিল সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত। এটি পরিচালনা করেছেন আজিজুর রহমান। সুন্দরবনকে জলদস্যু মুক্ত করার বাস্তব ঘটনা দীপঙ্কর দীপন নির্মাণ করেছেন ‘অপারেশন সুন্দরবন’। সত্য ঘটনা অবলম্বনে নব্বইয়ের দশকে মফস্বলের কলেজ পড়ুয়া একজোড়া তরুণ-তরুণীর প্রেমের গল্প চিত্রায়িত হয়েছে ‘ইতি চিত্রা’। এটি পরিচালনা করেছেন রাইসুল ইসলাম অণিক। রায়হান রাফির ‘জানোয়ার’ সিনেমাটির চিত্রনাট্য করোনা ভাইরাসের মহামারি রোধে সংগ নিরোধকালীন বাংলাদেশের গাজীপুরে ঘটা একটি পরিবারের চার সদস্যের খুন ও ধর্ষণের মর্মান্তিক ঘটনাকে ভিত্তি করে রচিত হয়েছে। একই নির্মাতার ‘তান্ডব’ সিনেমাটির কাহিনি বাংলাদেশের একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ওপর সংঘটিত একটি হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। রাফির ‘তুফান’ সিনেমার গল্প নব্বই দশকের বাংলাদেশের একজন গ্যাংস্টারকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। তার নির্মিত প্রথম হিট সিনেমা ‘পরাণ’ নির্মিত হয়েছে বরগুনার রিফাত শরীফের আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যে ঘটনার জন্য মিন্নির ফাঁসির আদেশ হয়। এটি পরিচালনা করেন রায়হান রাফি। একই নির্মাতার ‘দামাল’ও মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ ফুটবল দলের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে নির্মিত। অন্যদিকে নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ‘শনিবার বিকেল’ বানিয়েছেন গুলশানের আর্টিজান হামলা নিয়ে। যদিও এটি বাংলাদেশে মুক্তি দেওয়া হয়নি। উপরোক্ত সিনেমাগুলোর মধ্যে অনেকই দর্শক প্রশংসা পেয়েছে। তরুণ নির্মাতাদের মতে, ‘আমাদের মানুষ, আমাদের অঞ্চল, আমাদের বাস্তবতা’র গল্প বলতে চান ও পর্দায় দেখতে চান।

* দর্শক নিজের গল্প খুঁজছেন

দেশে সত্য ঘটনা নিয়ে সিনেমা নির্মাণের আগ্রহ বেশি দেখা গেছে নির্মাতা রায়হান রাফির। তার প্রায় প্রত্যেকটি সিনেমাই দেশের কোনো না কোনো ঘটনার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে। পরাণসহ একাধিক ব্যবসাসফল সিনেমার পরিচালক মনে করেন, তার সিনেমা দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রধান কারণ, দর্শক সেখানে নিজেদের জীবন খুঁজে পান। এ নির্মাতার মতে, মানুষ তার গল্পের চরিত্রগুলোর মধ্যে নিজেকে খোঁজেন। এ ‘নিজেকে খুঁজে পাওয়া’ই সম্ভবত বাস্তবধর্মী সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি। একজন দর্শক যখন পর্দায় নিজের পরিবার, প্রেম, বন্ধুত্ব, সংকট, পেশা কিংবা সামাজিক বাস্তবতার ছায়া দেখতে পান, তখন সিনেমার সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু বিনোদনের থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অংশ।

* বাস্তবতা মানেই কি বাণিজ্যিক সাফল্য

তবে বাস্তবধর্মী গল্প জনপ্রিয় হচ্ছে মানেই সব বাস্তবধর্মী সিনেমা ব্যবসাসফল, এমন নয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক চিত্রও তা প্রমাণ করে। ‘পরাণ’সহ কিছু সিনেমা ব্যতিক্রমী সাফল্য পেলেও একই ধরনের সামাজিক বাস্তবতার গল্প নিয়ে নির্মিত অনেক সিনেমা দর্শক টানতে পারেনি। ফলে শুধু ‘বাস্তব’ হলেই হবে না; প্রয়োজন শক্তিশালী চিত্রনাট্য, আকর্ষণীয় উপস্থাপনা, অভিনয় এবং সঠিক বিপণন। এখানেই বাস্তবধর্মী সিনেমার বড় চ্যালেঞ্জ। দর্শক বাস্তবতা চান, কিন্তু বাস্তবতার একঘেয়েমি চান না। তারা এমন গল্প চান, যেখানে বাস্তব জীবনের সত্য থাকবে, আবার সিনেমার নিজস্ব নাটকীয়তা, নান্দনিকতা ও আবেগও থাকবে।

সিনেমা যেমন শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা থেকে পালানোর মাধ্যম, তেমনি বাস্তবতাকে নতুন করে দেখার আয়নাও। সময় বদলেছে, দর্শকের চোখও বদলেছে। এখন তারা শুধু পর্দার নায়ককে অনুসরণ করতে চান না; বরং তার পাশে নিজের জীবনটাকেও দেখতে চান। সত্যিকারের পরিবর্তনটি তাই ‘বাস্তব বনাম কল্পনা’র লড়াই নয়। বরং দর্শক এখন এমন কল্পনা চান, যার শিকড় বাস্তব জীবনে প্রোথিত। আর এই কারণেই বিশ্ব সিনেমার পাশাপাশি বাংলাদেশের সিনেমাও গল্পের কেন্দ্র ধীরে ধীরে তারকা থেকে সরে এসে মানুষের দিকে, জীবনের দিকে এবং বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম