Logo
Logo
×
   

Advertisement

আনন্দ নগর

কনটেন্টের ভিউ বাড়ে, কিন্তু রয়্যালটি কোথায়

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আয় বাড়লেও অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের শিল্পী-স্রষ্টারা

Advertisement

এফ আই দীপু

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কনটেন্টের ভিউ বাড়ে, কিন্তু রয়্যালটি কোথায়

Advertisement

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বিনোদন শিল্পের ব্যবসার ধরনই বদলে দিয়েছে। আগে একটি গান বা নাটক থেকে আয় অনেকটা নির্ভর করত অ্যালবাম বিক্রি, টেলিভিশন সম্প্রচার কিংবা এককালীন পারিশ্রমিকের ওপর। এখন ইউটিউব, ফেসবুক, স্ট্রিমিং সেবা ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে একই কনটেন্ট বারবার ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে ‘একবার পারিশ্রমিক নিয়ে কাজ শেষ’-এই পুরোনো ধারণার পাশাপাশি ‘কনটেন্ট যত আয় করবে, স্রষ্টাও কি ততবার অংশ পাবেন?’-এ প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের কপিরাইট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সাহিত্য, নাটক, সংগীত, রেকর্ড, সিনেমা, সম্প্রচারসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ কপিরাইটের আওতাভুক্ত। কপিরাইট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক না হলেও মালিকানা ও আইনি জটিলতার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসাবে কাজ করে।

* গানে সবচেয়ে স্পষ্ট সংকট

সংগীতাঙ্গনে রয়্যালটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন আছে। একটি গানের ক্ষেত্রে গীতিকার ও সুরকারের স্বত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি নির্দিষ্ট রেকর্ডিংয়েরও আলাদা স্বত্ব থাকে। ডিজিটাল স্ট্রিমিংয়ের ফলে এসব স্বত্বের ব্যবহার আরও বহুগুণ বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে কপিরাইট ও মেধাস্বত্ব বিশেষজ্ঞ সংগীতশিল্পী জুয়েল মোর্শেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে সংগীতের রয়্যালটি কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই অসম্পূর্ণ; বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যবহারের জন্য রয়্যালটি সংগ্রহ ও বণ্টনের কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।’

তবে পরিস্থিতি বদলানোর উদ্যোগও আছে। বাংলাদেশে গীতিকার, সুরকার ও পারফর্মারদের স্বত্ব ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ লিরিসিস্ট, কম্পোজারস অ্যান্ড পারফর্মারস সোসাইটি ‘(বিএলসিপিএস) কাজ করছে। সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী ও সংগীতশিল্পী হামিন আহমেদ বলেছেন, ‘একজন স্রষ্টার পক্ষে তার গান কোথায়, কতবার ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেখান থেকে কত রয়্যালিটি পাওনা-সবকিছুর হিসাব রাখা কঠিন। এ জায়গায় কালেকটিভ ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন বা সিএমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’ সংগীতশিল্পী সুজিত মোস্তফা গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময় বলেছেন, ‘কপিরাইট নিয়ে শিল্পীদের লড়াই এখনো শেষ হয়নি; অনেক শিল্পী নিজের অধিকার সম্পর্কেই যথেষ্ট জানেন না।’ সংগীতশিল্পী কাজী শুভর মতে, ‘একটি গান ইউটিউব, ফেসবুক, শর্টস, রিলস কিংবা বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে অসংখ্যবার ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি ব্যবহারের বিপরীতে কার কত পাওনা, কোথা থেকে সেই রয়্যালিটি আসবে এবং কীভাবে তা স্রষ্টার কাছে পৌঁছাবে-এ ব্যবস্থাটি এখনো আমাদের দেশে যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। ফলে জনপ্রিয়তা তৈরি হচ্ছে, কিন্তু তার আর্থিক মূল্য স্রষ্টার হাতে সবসময় পৌঁছাচ্ছে না।’

* ওটিটিতে নতুন বাস্তবতা

রয়্যালটির প্রশ্ন শুধু গানেই সীমাবদ্ধ নয়। ওয়েব সিরিজ, নাটক ও সিনেমা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার পর অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকারসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মীর কাজের মূল্য নির্ধারণ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০২২ সালে একটি পত্রিকার এক গোলটেবিল আলোচনায় অভিনয়শিল্পী ইরেশ জাকের, মৌটুসি বিশ্বাস, পরিচালক শঙ্খ দাশগুপ্ত, তানিম নূরসহ বিনোদন অঙ্গনের অনেকেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। সেখানে অভিনয়শিল্পীরা বলেছেন, শিল্পীরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তাদের পুরোনো কাজ ডিজিটাল মাধ্যমে আয় করছে। তাদের মতে, ডিজিটাল সম্প্রচারের আয় থেকে শিল্পীদের অংশ পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। আলোচনায় কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন-ডিজিটাল যুগে সৃজনশীলতার অর্থনৈতিক মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাধা কোথায়? তাদের মতে, শিল্পীদের মধ্যে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতিও বড় সমস্যা।

অবশ্য এ বিষয়ে ভিন্ন মতও আছে। পরিচালক তানিম নূর মনে করেন, কাজ যদি কমিশনভিত্তিক হয় এবং চুক্তিতে স্বত্ব হস্তান্তর করা থাকে, তাহলে পরবর্তী রয়্যালটির দাবি স্বয়ংক্রিয় নয়। বরং প্রযোজক ও শিল্পীদের মধ্যে লাভ ভাগাভাগির ব্যবস্থা চুক্তির মাধ্যমে করা যেতে পারে।

অর্থাৎ সমস্যার একটি বড় অংশ আইনের পাশাপাশি চুক্তির ভাষায়, কে কত দিনের জন্য স্বত্ব দিচ্ছেন, কোন প্ল্যাটফর্মে ব্যবহার হবে, বিদেশে বিক্রি হলে কী হবে, পুনঃপ্রচার বা পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী হবে-এসব শর্ত স্পষ্ট না থাকলে পরবর্তী সময়ে বিরোধ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

* ‘ভিউ’ আছে, কিন্তু হিসাব কতটা স্বচ্ছ

ডিজিটাল রয়্যালটির আরেকটি বড় সমস্যা হলো হিসাবের স্বচ্ছতা। একটি গান বা ভিডিও কতবার দেখা হয়েছে, কোন অঞ্চল থেকে দেখা হয়েছে, বিজ্ঞাপন থেকে কত আয় হয়েছে, প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগির হার কত-এসব তথ্য সব পক্ষের কাছে সমানভাবে দৃশ্যমান নয়। ফলে শিল্পী অনেক সময় জানেন তার কাজ জনপ্রিয়, কিন্তু জানেন না সেই জনপ্রিয়তার আর্থিক মূল্য কত। বিষয়টি নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় অডিও-ভিডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ধ্রুব মিউজিক স্টেশনের (ডিএমএস) কর্ণধার সংগীতশিল্পী ধ্রুব গুহ বলেন, ‘ভিউ এখন কনটেন্টের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে দৃশ্যমান মাপকাঠি, কিন্তু ভিউ আর আয় এক জিনিস নয়। একটি ভিডিও লাখ লাখ মানুষ দেখলেও সেই ভিউ থেকে নির্মাতা কিংবা প্রযোজক কত টাকা পাচ্ছেন, সেটি নির্ভর করে প্ল্যাটফর্মের মনিটাইজেশন নীতি, বিজ্ঞাপনের বাজার, দর্শকের অবস্থান এবং কনটেন্টের মালিকানা-সবকিছুর ওপর।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাধীন শিল্পীদের কেউ কেউ সরাসরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিজেদের গান প্রকাশ করে স্বত্ব নিজেদের হাতে রাখছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগী কমে এবং আয়ের ওপর শিল্পীর নিয়ন্ত্রণ বাড়ে। অন্যদিকে কপিরাইট লঙ্ঘন ও অনুমতি ছাড়া পুনঃপ্রকাশ এখনো বড় সমস্যা। চলতি বছরের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সৃজনশীল অর্থনীতির টেকসই বিকাশের পথে পাইরেসি ও দুর্বল কপিরাইট ব্যবস্থাকে বড় বাধা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

* সমাধান কোথায়

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম প্রয়োজন সচেতনতা ও স্বচ্ছ চুক্তি। এরপর প্রয়োজন কার্যকর কপিরাইট প্রয়োগ, নির্ভরযোগ্য রয়্যালিটি-ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী কালেকটিভ ম্যানেজমেন্ট। ২০২৪ সালে বিএলসিপিএস-এর একটি সম্মেলনে সিআইএসএসি-এর উপদেষ্টা সাতোশি ওয়াতানাবে সিএমও ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন-বিশ্বজুড়ে সংগীতের মেধাস্বত্ব রক্ষা ও রয়্যালটি সংগ্রহে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে গীতিকার ও সুরকারদের রয়্যালটি সংগ্রহের উপায় নিয়ে আগেই ওটিটি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছে।

সবচেয়ে বড় কথা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে শুধু বিনোদনের জায়গা হিসাবে দেখলে চলবে না; এটি এখন পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। একটি গান, নাটক বা সিনেমা মুক্তির পরও যখন আয় করতে থাকে, তখন সেই আয়ের সঙ্গে স্রষ্টার সম্পর্ক কী হবে-তা স্পষ্ট করতেই হবে। নাহলে প্রযুক্তি শিল্পীকে বিশ্বজুড়ে দর্শক দেবে, কিন্তু সেই দর্শকের তৈরি অর্থনৈতিক মূল্য থেকে শিল্পী বঞ্চিতই থেকে যাবেন। ডিজিটাল যুগে তাই প্রশ্ন শুধু-‘কত ভিউ?’ নয়; প্রশ্ন হওয়া উচিত-‘সেই ভিউয়ের ন্যায্যমূল্য কার হাতে পৌঁছাল?’

‘একজন স্রষ্টার পক্ষে তার গান কোথায়, কতবার ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেখান থেকে কত রয়্যালিটি পাওনা-সবকিছুর হিসাব রাখা কঠিন। এ জায়গায় কালেকটিভ ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন বা সিএমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

- হামিন আহমেদ, সংগীতশিল্পী

‘ভিউ আর আয় এক জিনিস নয়। একটি ভিডিও লাখ লাখ মানুষ দেখলেও সেই ভিউ থেকে নির্মাতা কিংবা প্রযোজক কত টাকা পাচ্ছেন, সেটি নির্ভর করে প্ল্যাটফর্মের মনিটাইজেশন নীতি, বিজ্ঞাপনের বাজার, দর্শকের অবস্থান এবং কনটেন্টের মালিকানা-সবকিছুর ওপর।’

- ধ্রুব গুহ, সংগীতশিল্পী ও কর্ণধার, ডিএমএস

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম