Logo
Logo
×
   

Advertisement

আনন্দ নগর

বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ব্যান্ড-সংস্কৃতির গল্প

কোথায় হারাল সেই শ্রোতা

Advertisement

এফ আই দীপু

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কোথায় হারাল সেই শ্রোতা

Advertisement

একসময় ব্যান্ড মানেই ছিল ক্যাসেটের দোকানে নতুন অ্যালবামের খোঁজ, টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে প্রিয় গানের জন্য অপেক্ষা, দেওয়ালে প্রিয় শিল্পীর পোস্টার আর কনসার্টে হাজারও কণ্ঠে একসঙ্গে গান গাওয়া। আশির দশকের সোলস, মাইলস, ফিডব্যাক, চাইম, ফিলিংস (বর্তমানে নগর বাউল), ওয়ারফেজ থেকে নব্বইয়ের এলআরবি, আর্ক, আর্টসেল, শিরোনামহীন- ব্যান্ডসংগীত শুধু বিনোদন ছিল না, হয়ে উঠেছিল একটি প্রজন্মের আনন্দ-বিনোদনের অংশ। আজ সেই সংস্কৃতি কি হারিয়ে গেছে? উত্তর অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ নয়। বরং শ্রোতা হারায়নি, বদলে গেছে শ্রোতার গান শোনার পদ্ধতি, রুচি ও অপেক্ষার ধরন।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের বিকাশে আজম খান ও তার ব্যান্ড উচ্চারণ-এর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। সত্তরের দশকে সোলসসহ কয়েকটি ব্যান্ড নতুন প্রজন্মের সামনে পশ্চিমা সংগীতের প্রভাবমিশ্রিত বাংলা রক ও পপের নতুন দরজা খুলে দেয়। সোলসের যাত্রা শুরু ১৯৭২ সালে; ১৯৮২ সালে প্রকাশিত ‘সুপার সোলস’ ব্যান্ডটির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

আশির দশক ছিল মূলধারায় ব্যান্ডসংগীতের প্রতিষ্ঠার সময়। টেলিভিশন, ক্যাসেট এবং স্টেজ শো-এ তিন মাধ্যম ব্যান্ডকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। মাইলস, ফিডব্যাক, ওয়ারফেজ, রেনেসাঁ, উইনিং, অবসকিউর, ডিফারেন্ট টাচ্সহ একের পর এক ব্যান্ড তৈরি করে নিজস্ব শ্রোতাগোষ্ঠী। একই সময়ে ওয়ারফেজের হাত ধরে হার্ডরক ও হেভি মেটালও শক্ত অবস্থান তৈরি করে।

নব্বইয়ের দশকে এসে সেই স্রোত আরও বিস্তৃত হয়। এলআরবি, অর্থহীন, শিরোনামহীন, আর্টসেল, নেমেসিসসহ নতুন প্রজন্মের ব্যান্ড যোগ করে বিকল্প রক, মেটাল, ফোক-রক ও পরীক্ষামূলক সংগীতের নানা ধারা।

পুরোনো ব্যান্ডপ্রেমীদের কাছে গান ছিল ‘অভিজ্ঞতা’। একটি নতুন অ্যালবাম বাজারে আসার আগে মাসের পর মাস অপেক্ষা, ক্যাসেট কেনা, গান মুখস্থ করা-সবকিছুর মধ্যেই ছিল আলাদা উত্তেজনা। তখন শ্রোতার সামনে বিকল্পও ছিল কম। ফলে একটি ব্যান্ডের সঙ্গে তৈরি হতো দীর্ঘমেয়াদি আবেগের সম্পর্ক। জেমসের কণ্ঠ, আইয়ুব বাচ্চুর গিটার, মাইলসের সুর কিংবা ওয়ারফেজের গর্জন-এসব শুধু গান নয়, হয়ে উঠেছিল কৈশোর ও তারুণ্যের স্মৃতি। বছর কয়েক আগেও ব্যান্ড ঘিরে আয়োজিত বড় কনসার্টেও দেখা গেছে, বহু বছর পরও দর্শক পুরোনো গানগুলোর প্রতিটি লাইন সমস্বরে গাইছেন। অর্থাৎ পুরোনো ব্যান্ডের প্রতি আবেগ একেবারেই শেষ হয়ে যায়নি।

এখনকার শ্রোতার হাতে ক্যাসেট নেই, কিন্তু গান আছে হাজার গুণ বেশি। ইউটিউব, ফেসবুক, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ও শর্ট ভিডিও-সবখানেই গান পৌঁছে যাচ্ছে মুহূর্তে। ফলে বদলে গেছে ‘হিট’ হওয়ার সংজ্ঞাও। আগে একটি ব্যান্ডের একটি অ্যালবাম জনপ্রিয় হতে সময় লাগত; এখন একটি গান কয়েক দিনের মধ্যেই ভাইরাল হতে পারে। আবার শ্রোতা একই শিল্পীর পাশাপাশি কে-পপ, হিপহপ, ইন্ডি, ইলেকট্রনিক, পাশ্চাত্য রক ও বাংলা ফোক-সবই শুনছেন।

বিশ্বজুড়ে স্ট্রিমিংয়ের বিস্ফোরণ এ পরিবর্তনের বড় উদাহরণ। ২০২৫ সালে বিশ্বে অন-ডিমান্ড মিউজিক স্ট্রিমের সংখ্যা ৫.১ ট্রিলিয়নে পৌঁছায়। ফলে শ্রোতার কাছে গান এখন আর ‘অ্যালবাম’ নয়, বরং মুহূর্ত ও মুডভিত্তিক প্লেলিস্টের অংশ। বাংলাদেশেও স্ট্রিমিংকে ব্যান্ডসংগীতের নতুন সম্ভাবনা হিসাবে দেখা হচ্ছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশে স্পটিফাই চালু হওয়ার পর শিল্পী ও শ্রোতাদের কাছে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল বিতরণের নতুন দরজা খুলে যায়।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি ব্যান্ডের শ্রোতা কমেছে? বাস্তবতা বলছে, শ্রোতা কমার চেয়ে শ্রোতা ছড়িয়ে পড়েছে। উদারহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০২৪ সালের বৈষ্টমী রকফেস্ট-এ ঢাকার অনুষ্ঠান ছিল সব বয়সি দর্শকে পরিপূর্ণ। যদিও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে এ আয়োজনটি পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়ে যায়। একই বছরের ডিসেম্বরে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কনসার্টেও বিপুল দর্শকের উপস্থিতি দেখা যায়। দর্শকের অতিরিক্ত ভিড় ও নিরাপত্তাজনিত কারণে অনুষ্ঠান আগেই শেষ করতে হয়েছিল। ২০২৫ সালে নজরুলসংগীতের রক সংস্করণ নিয়ে আয়োজিত কনসার্টে সোলস, ওয়ারফেজ, শিরোনামহীন, আর্টসহ ১০টি ব্যান্ড অংশ নেয়। আর ২০২৬ সালের আগস্টে ‘কনসার্ট ফর ডেমোক্রেসি’তে টানা বৃষ্টির মধ্যেও হাজারও মানুষ সোলস, মাইলস, ওয়ারফেজ, ডিফারেন্ট টাচ ও অ্যাশেজের গান শুনতে মাঠে ছিলেন। অর্থাৎ লাইভ ব্যান্ডের প্রতি মানুষের আকর্ষণ এখনো প্রবল।

এখানে নতুন ও পুরোনো শ্রোতার প্রতি একটি বিশেষ পার্থক্য লক্ষ করা যায়। পুরোনো শ্রোতা সাধারণত একটি ব্যান্ডের ‘ভক্ত’; নতুন শ্রোতা অনেক বেশি ‘গানকেন্দ্রিক’। আগে বলা হতো, ‘আমি ওয়ারফেজের ভক্ত।’ এখনকার তরুণ হয়তো একই প্লেলিস্টে ওয়ারফেজ, আর্টসেল, জেমস, কোক স্টুডিও বাংলা, আন্তর্জাতিক রক ও হিপহপ পাশাপাশি রাখে।

আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো অ্যালবাম সংস্কৃতির অবসান। আগে একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম ছিল ব্যান্ডের পরিচয়। এখন একক গান, মিউজিক ভিডিও, সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট এবং লাইভ পারফরম্যান্স-সব মিলিয়ে শিল্পীর পরিচয় তৈরি হয়।

তবে এর সঙ্গে এসেছে নতুন সংকট। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে ব্যান্ডশিল্পীরা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে নিয়মিত কনসার্ট আয়োজন কঠিন হয়ে পড়ছে; অনেক অনুষ্ঠান শেষ মুহূর্তে বাতিলও হচ্ছে।

পুরোনোরা নস্টালজিয়া, নতুনরা উত্তরাধিকার; ব্যান্ডসংগীতের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই-এটি প্রজন্ম বদলালেও স্মৃতি বদলায় না। ২০২৫ সালে সোলসের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত কনসার্টে বিভিন্ন সময়ের সদস্য ও শিল্পীরা একত্র হয়েছিলেন। একইভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে পুরোনো গানকে নতুন সংগীতায়োজনে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালে কোক স্টুডিও বাংলায় ওয়ারফেজের ‘অবাক ভালোবাসা’ নতুনভাবে উপস্থাপন তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

তাই প্রশ্নটা সম্ভবত ‘কোথায় গেল সেই শ্রোতা?’ নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত-‘কেন আগের মতো এক জায়গায় দেখা যাচ্ছে না সেই শ্রোতাদের?’

উত্তরটি সময়ের পরিবর্তনে। ক্যাসেটের দোকান থেকে তারা চলে গেছে ইউটিউবের স্ক্রিনে, অ্যালবাম থেকে প্লেলিস্টে, নির্দিষ্ট ব্যান্ডের আনুগত্য থেকে বহুমাত্রিক সংগীতরুচিতে। কিন্তু কনসার্টে মঞ্চে প্রিয় ব্যান্ডের শিল্পীর সঙ্গে যখন হাজারও কণ্ঠ একসঙ্গে গেয়ে ওঠে-‘চাঁদ তারা সূর্য’ কিংবা ‘অবাক ভালোবাসা’-তখন বোঝা যায়, বাংলাদেশের ব্যান্ডসংস্কৃতি হারিয়ে যায়নি; এর শ্রোতা শুধু নতুন ঠিকানায় চলে গেছে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম