Logo
Logo
×
   

Advertisement

আনন্দ নগর

বয়সের সঙ্গে নায়িকাদের ক্যারিয়ারে তৈরি হয় অদৃশ্য দেওয়াল

Advertisement

এফ আই দীপু

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বয়সের সঙ্গে নায়িকাদের ক্যারিয়ারে তৈরি হয় অদৃশ্য দেওয়াল

Advertisement

নায়কের বয়স ৫০ বছর পেরোলেও তিনি নায়ক। ৬০ পেরিয়েও তার প্রেমের দৃশ্য থাকে, নতুন নায়িকার সঙ্গে জুটি বাঁধেন, অ্যাকশন দৃশ্যে মারামারি করেন। অথচ নায়িকার বয়স ৩০ ছুঁতেই প্রশ্ন ওঠে-‘এখনো নায়িকা?’ বিয়ে হলে প্রশ্ন বদলে যায়-‘কবে ফিরবেন?’ আর মা হলে যেন প্রশ্নটাই হয়ে যায়-‘নায়িকার চরিত্র কি আর আগের মতো আছে?’

এ অদৃশ্য দেওয়ালের কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই, কোনো অফিসিয়াল নিয়মও নেই। কিন্তু হলিউড, বলিউড কিংবা ঢালিউড-তিন ইন্ডাস্ট্রিতেই নারী অভিনয়শিল্পীর ক্যারিয়ারকে বয়স, বিয়ে ও মাতৃত্বের সঙ্গে মেলানোর এক অদৃশ্য সামাজিক হিসাব কাজ করে। ফলে প্রতিভা ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক অভিনেত্রীর সামনে প্রধান চরিত্রের দরজা সংকুচিত হয়, অথচ পুরুষ সহশিল্পীর জন্য খুলে যায় নতুন নতুন সম্ভাবনা।

* হলিউডে ‘শেলফ লাইফ’ পাঁচ বছর!

হলিউডের বাস্তবতাও একসময় ছিল নির্মম। অভিনেত্রী কেইট ব্লাঞ্চেট জানিয়েছেন, তিনি যখন ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, তখন হলিউডে নারী অভিনয়শিল্পীর ‘শেলফ লাইফ’ ছিল প্রায় পাঁচ বছর। তার মতে, নারী প্রযোজক ও লেখকের সংখ্যা বাড়া এবং #মিটু-পরবর্তী পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে।

কিন্তু সমস্যা পুরোপুরি যায়নি। ৭৫ বছর বয়সি জেসিকা ল্যাঞ্জ সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছানোর পর অভিনেত্রীদের প্রতি হলিউডের আচরণে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি।

তবে হলিউডে পাল্টা চিত্রও আছে। ভায়োলা ডেবিস ৬১ বছর বয়সে এসে বলেছেন, বয়স তার মূল্য কমায়নি; বরং নিজের মূল্যবোধ ও আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। অন্যদিকে ডেমি মুর, নিকোল কিডম্যান, জোডি ফস্টার, মিশেল ইয়োদের মতো অভিনেত্রীরা বয়সকে পেছনে ফেলে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে কাজ করছেন।

অর্থাৎ হলিউডে দেওয়ালটি ভাঙছে-কিন্তু দেওয়াল যে ছিল, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

* বলিউডে ৩০ বছরেই ‘মা’!

বলিউডে বৈষম্যের চিত্র আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসে চরিত্র নির্বাচনে। অভিনেত্রী ডায়না পেনটি সম্প্রতি বলেছেন, নারীদের ৩০-এর কোঠাতেই একাধিক সন্তানের মা হিসাবে কাস্ট করার প্রবণতা দেখা যায়। তার অভিযোগ, অভিনেত্রীর অভিনয়ক্ষমতার চেয়ে সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা বেশি হয়।

আর শেফালি শাহ আরও সরাসরি বলেছেন-নায়ক যে কোনো বয়সের হতে পারেন, কিন্তু নায়িকার বয়স যেন ১৮ থেকে ২৫-এর মধ্যেই থাকতে হবে; নারীর জন্য যেন একটি ‘সেলফ লাইফ’ নির্ধারিত।

এখানেই প্রশ্নটি আরও গভীর হয়-একজন নারী অভিনেত্রী ৩০ বছর বয়সে মা হতে পারেন, কিন্তু ৩০ বছর বয়সি একজন নারী অভিনেত্রী কেন একইসঙ্গে নায়িকার চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারবেন না?

অবশ্য পরিবর্তনও হচ্ছে। সোনালি কুলকার্নি নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানিয়েছেন, তিনি সালমান খানের মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যদিও বাস্তবে তিনি সালমানের চেয়ে বয়সে ছোট। একইসঙ্গে তার বক্তব্য, বিয়ে-সন্তান হওয়া মানেই নায়িকার ক্যারিয়ারের সমাপ্তি হওয়া উচিত নয়।

বিপাশা বসুর সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও আরেক বাস্তবতা দেখায়। মা হওয়ার পর শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রলের শিকার হলেও ৪৭ বছর বয়সি এ অভিনেত্রী বলেছেন, এখন তিনি নিজের প্রতি বিশের দশকের চেয়েও বেশি সন্তুষ্ট।

* ঢালিউডে দেওয়ালটি আরও শক্ত

বাংলাদেশি সিনেমায় বয়স, বিয়ে ও মাতৃত্বের সমীকরণ অনেক সময় শুধু পেশাগত নয়-ব্যক্তিগত জীবনেও তার চাপ তৈরি করে। অপু বিশ্বাস ও শাকিব খানের বিয়ে ও সন্তানের বিষয়টি দীর্ঘদিন গোপন রাখার ঘটনাটি এই বাস্তবতার আলোচিত উদাহরণ। ২০১৬ সালে সন্তানের জন্মের পরও বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি। পরে অপু জানান, শাকিবের ক্যারিয়ারের কথা বিবেচনা করেই তিনি দীর্ঘ সময় বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন।

এখানে শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রশ্ন নয়; উঠে আসে একটি নির্মম পেশাগত বাস্তবতা-একজন নায়িকার বিয়ে ও মাতৃত্বকে এমনভাবে দেখা হয়, যেন তা তার তারকা-ইমেজের জন্য ঝুঁকি।

মাহিয়া মাহির ক্যারিয়ারও অন্য এক দিক তুলে ধরে। বিয়ে ও মাতৃত্বের জন্য বিরতি নেওয়ার পর তিনি আবারও ‘লিডিং অ্যাক্ট্রেস’ হিসাবে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উপযুক্ত চিত্রনাট্য না পাওয়ায় প্রত্যাবর্তন করতে পারেননি বলেই তিনি জানিয়েছিলেন। যদিও রাজনৈতিক কারণে এ নায়িকা এখন নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।

অন্যদিকে শবনম বুবলী দুই সন্তানের মা হয়েও কিন্তু এখনো ‘লিডিং ক্যারেক্টার’-এর জন্যই চুক্তিবদ্ধ হচ্ছেন। বুবলীর বর্তমান বয়স ৩৬ বছর। এ বয়সে দুই সন্তানের মা হয়েও এখনো ‘নায়িকা’, এটা তার জন্য সৌভাগ্য বলা যায়। যদিও কতদিন সেটা ধরে রাখতে পারবেন তা স্পষ্ট নয়। তবু এত বয়সের পরও একজন নারী অভিনয়শিল্পী শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারেন, আপাতত এটা তিনি প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে ঢালিউডের অনেক নায়িকাই বয়সের কারণে ইন্ডাস্ট্রি থেকে অনেকটাই হারিয়ে গেছেন বলা যায়। শাবনূর, মৌসুমী, পপি ও পূর্ণিমা এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তাদের নিয়ে কেউ কেউ অবশ্য সিনেমা নির্মাণে আগ্রহী হলেও, একসময়কার যে দর্শক ক্রেজ ছিল তাদের, সেটা এখন আর নেই বলেই অনেক নির্মাতার ধারণা।

* অদৃশ্য দেওয়ালটি আসলে কোথায়

দেওয়ালটি মূলত তিন জায়গায়।

প্রথমত, বয়সের দ্বৈত মানদণ্ড। পুরুষের বয়সকে অভিজ্ঞতা ও স্টার পাওয়ার হিসাবে দেখা হয়; নারীর বয়সকে সৌন্দর্য হারানোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

দ্বিতীয়ত, মাতৃত্বের স্টেরিওটাইপ। নারী মা হলেই তার চরিত্রের পরিসর অনেক সময় ‘নায়িকা’ থেকে ‘মা’, ‘ভাবি’ বা ‘বোন’-এ নেমে আসে।

তৃতীয়ত, গল্প বলার সংকীর্ণতা। নারী চরিত্রের প্রেম, যৌবন ও সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে গল্প বেশি তৈরি হলে বয়স বাড়ার সঙ্গে তাদের জন্য গল্পের জায়গাও কমে যায়।

তবে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, নারী নির্মাতা-প্রযোজকের অংশগ্রহণ এবং দর্শকের বদলে যাওয়া রুচি এ কাঠামো ভাঙার সুযোগ তৈরি করছে। হলিউড বলিউডে বয়স্ক নারী অভিনয়শিল্পীদের নতুন করে কেন্দ্রীয় চরিত্রে আসা তারই প্রমাণ।

এটা অবশ্যই প্রশ্নের দাবি রাখে, একজন অভিনেত্রীর বয়স বাড়ে, অভিজ্ঞতা বাড়ে, অভিনয়ের গভীরতা বাড়ে-কিন্তু তার সুযোগ কেন কমবে? ২৫-এর পর যদি নায়িকার ‘শেলফ লাইফ’ শেষ হয়ে যায়, তাহলে ৪০, ৫০ কিংবা ৬০-এর নারীর গল্প কে বলবে?

অদৃশ্য দেওয়ালটি তাই শুধু অভিনেত্রীদের সামনে নয়; এটি সিনেমার গল্প বলার সীমাবদ্ধতাও। সেই দেওয়াল ভাঙতে হলে নায়িকার বয়স নয়, তার চরিত্রের বয়স, গল্পের প্রয়োজন এবং অভিনয়ের শক্তিকেই মুখ্য করতে হবে। তাহলেই ‘নায়িকা’ শব্দটি কেবল যৌবনের সমার্থক না হয়ে, হয়ে উঠবে-একজন পূর্ণাঙ্গ অভিনেত্রীর পরিচয়।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম