তারকা নাকি অ্যালগরিদম
দর্শক কী দেখবেন ঠিক করছে কে
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একসময় দর্শক কী দেখবেন, তা অনেকটাই নির্ভর করত টেলিভিশনের অনুষ্ঠানসূচি, প্রেক্ষাগৃহের নতুন সিনেমা কিংবা পত্রিকার বিনোদন পাতার ওপর। এখন স্মার্টফোনের পর্দায় পছন্দের গান, নাটক, সিনেমা কিংবা ওয়েব সিরিজ হাজির হচ্ছে মুহূর্তেই। কিন্তু এই পছন্দের তালিকা কি পুরোপুরি দর্শকের নিজের? নাকি ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম আগেই ঠিক করে দিচ্ছে, কোন তারকাকে দেখা হবে, কোন নির্মাতার কাজ ছড়িয়ে পড়বে, আর কোন গল্পটি থেকে যাবে আড়ালে? বাংলাদেশের বিনোদনজগতে তাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নতুন এক প্রশ্ন-দর্শক কি পছন্দের তারকা দেখে কনটেন্ট বেছে নিচ্ছেন, নাকি কনটেন্ট বেছে দিচ্ছে অ্যালগরিদম?
বাংলাদেশের বিনোদনজগতে ডিজিটাল মাধ্যমের প্রভাব কতটা বেড়েছে, তা বোঝা যায় ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিসংখ্যান থেকে। ডেটা রিপোর্টাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৪২ লাখ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৬ কোটিরও বেশি। এই বিশাল দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর লড়াইয়ে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সুপারিশব্যবস্থা বা অ্যালগরিদম। দর্শক কোন ভিডিও দেখছেন, কতক্ষণ দেখছেন, কোনটিতে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন কিংবা কোনটি এড়িয়ে যাচ্ছেন-এসব আচরণ থেকে প্ল্যাটফর্ম দর্শকের আগ্রহ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। এরপর সেই ধারণার ভিত্তিতে সাজানো হয় পরবর্তী কনটেন্টের তালিকা। ইউটিউবের নিজস্ব ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তাদের সুপারিশব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো ব্যবহারকারীর আগ্রহের সঙ্গে মেলে এমন ভিডিও ও নির্মাতাকে খুঁজে পেতে সহায়তা করা। ফলে দর্শক কী দেখতে পারেন, সেই সিদ্ধান্তে তার ব্যক্তিগত পছন্দের পাশাপাশি প্ল্যাটফর্মের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাও ভূমিকা রাখে।
একসময় সিনেমার প্রচারে বড় তারকার নাম, পোস্টার, সংবাদ সম্মেলন ও টেলিভিশন সাক্ষাৎকার ছিল গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এখন সেই প্রচারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফেসবুকের রিলস, ইউটিউবের ট্রেলার, টিকটকের ছোট ভিডিও এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্রচারণা। তবে তারকার জনপ্রিয়তা আর ডিজিটাল কনটেন্টের জনপ্রিয়তা সবসময় এক নয়। পরিচিত কোনো অভিনেতার ভিডিও প্রত্যাশিত দর্শক না-ও পেতে পারে। আবার তুলনামূলক অপরিচিত কোনো শিল্পীর অভিনীত দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভিউয়ের সংখ্যা একমাত্র সাফল্যের মাপকাঠি নয়। দর্শক ভিডিওতে ক্লিক করছেন কি না, কতক্ষণ দেখছেন, মাঝপথে ছেড়ে দিচ্ছেন কি না এবং অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছেন কি না-এসবও কনটেন্টের গ্রহণযোগ্যতা বুঝতে কাজে লাগে। অর্থাৎ, তারকার পরিচিতি দর্শককে আকৃষ্ট করতে পারে; কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমে সেই দর্শককে ধরে রাখা এবং নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কনটেন্টের উপস্থাপন ও দর্শকের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারে বাংলাদেশের নির্মাতাদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। টেলিভিশন বা সিনেমাহলের প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে গিয়েও এখন দর্শকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। ছোট বাজেটের নির্মাতা, নতুন অভিনেতা কিংবা স্বাধীন কনটেন্ট নির্মাতারাও নিজেদের কাজ প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু এই সুযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দৃশ্যমানতার প্রতিযোগিতা। কোন শিরোনামে ভিডিও প্রকাশ করা হবে, থাম্বনেইলে কী থাকবে, প্রথম কয়েক সেকেন্ডে কী দেখানো হবে-এসব সিদ্ধান্ত এখন কনটেন্ট পরিকল্পনার অংশ।
ইউটিউবের সাবেক প্রকৌশলী গিয়োম শ্যাসলো বলেছেন, দর্শকের দেখার সময় বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে তৈরি সুপারিশব্যবস্থা কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত ফল তৈরি করতে পারে। তার আলোচনায় উঠে আসে, দর্শকের আগ্রহকে অনুসরণ করতে গিয়ে একই ধরনের কনটেন্ট বারবার সামনে আসার ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে। দর্শক যদি কোনো ধরনের নাটক বা ভিডিওতে বেশি সময় দেন, তাহলে নির্মাতারা সেই ধরনের কনটেন্ট তৈরিতে উৎসাহিত হতে পারেন। এতে জনপ্রিয় ধারার বিস্তার ঘটলেও ভিন্নধর্মী গল্প বা পরীক্ষামূলক নির্মাণের দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
তবে অ্যালগরিদম একাই নির্মাতার সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো বাংলাদেশভিত্তিক পর্যাপ্ত গবেষণা এখানে সামনে আসেনি। দর্শকের রুচি, বিজ্ঞাপনদাতার চাহিদা, প্রযোজকের বিনিয়োগ এবং নির্মাতার নিজস্ব পরিকল্পনাও এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।
ডিজিটাল বিনোদনে দর্শকের আচরণসংক্রান্ত তথ্য শুধু ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে লাগে না, বিজ্ঞাপন ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তেও এর গুরুত্ব রয়েছে। একটি ভিডিও কতজন দেখেছেন, কোন বয়সি দর্শক বেশি দেখেছেন, কোন অঞ্চল থেকে দর্শক এসেছেন কিংবা কোন সময় দর্শক বেশি সক্রিয় ছিলেন-এ ধরনের পরিসংখ্যান নির্মাতা ও বিপণনকারীদের প্রচারণা পরিকল্পনায় সহায়তা করতে পারে। দর্শকের তথ্যের ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন দেখানো এবং কনটেন্টের কার্যকারিতা পরিমাপ করা ডিজিটাল ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা, ব্যবহারকারীর সম্মতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রবেশাধিকারের ওপর নির্ভর করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কোনো ভিডিও বেশি দেখা হচ্ছে মানেই সেটি দর্শকের কাছে শিল্পমানের বিচারে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য-এমন নয়। ভিউ, মন্তব্য ও শেয়ার দর্শকের আচরণের কিছু দিক তুলে ধরে; কিন্তু গল্পের গভীরতা, অভিনয়ের মান কিংবা সাংস্কৃতিক প্রভাবের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করে না।
ডিজিটাল সুপারিশব্যবস্থা নিয়ে গবেষণায় একটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে-ব্যবহারকারীর আচরণ ও প্ল্যাটফর্মের সুপারিশ পরস্পরকে প্রভাবিত করতে পারে। দর্শক যে ধরনের ভিডিও দেখেন, সে ধরনের ভিডিও আরও সামনে আসতে পারে। আবার সামনে আসা ভিডিও দর্শকের পরবর্তী পছন্দকেও প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশের বিনোদনশিল্পের জন্য এই বিষয়টি কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আনে। প্রথমত, নতুন ও স্বাধীন নির্মাতাদের কনটেন্ট দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ কতটা সমান? দ্বিতীয়ত, বাংলা ভাষার আঞ্চলিক কনটেন্ট এবং ভিন্নধর্মী গল্প সুপারিশব্যবস্থায় কীভাবে জায়গা পাচ্ছে? তৃতীয়ত, দর্শকের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সে বিষয়ে তাদের জানার সুযোগ কতটা রয়েছে?
অ্যালগরিদমের প্রভাব বাড়লেও দর্শকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। দর্শক নিজের পছন্দে ভিডিও খুঁজতে পারেন, নির্দিষ্ট চ্যানেল অনুসরণ করতে পারেন, সুপারিশ এড়িয়ে যেতে পারেন কিংবা ভিন্ন ধরনের কনটেন্ট দেখতে পারেন।
ইউটিউবও ব্যবহারকারীদের সুপারিশ নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন সুবিধার কথা জানায়। তবে সমস্যা হলো, সব দর্শক জানেন না কেন একটি ভিডিও তাদের সামনে আসছে, আর অন্যটি আসছে না। ফলে প্ল্যাটফর্মের সুপারিশব্যবস্থা যত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তার স্বচ্ছতা এবং দর্শকের নিয়ন্ত্রণের সুযোগও তত বেশি আলোচনায় আসবে।
বাংলাদেশের বিনোদনজগতে এখন তারকা, নির্মাতা, প্রযোজক, বিজ্ঞাপনদাতা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম-সবাই দর্শকের মনোযোগের জন্য কাজ করছেন। এই ব্যবস্থায় অ্যালগরিদম একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী। কিন্তু দর্শক কী দেখবেন, তার সিদ্ধান্ত এককভাবে কোনো প্রযুক্তি নেয় না। বরং দর্শকের পছন্দ, নির্মাতার সৃজনশীলতা, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং প্ল্যাটফর্মের সুপারিশ-সব মিলিয়েই তৈরি হচ্ছে নতুন বিনোদন-বাস্তবতা। প্রশ্ন তাই শুধু অ্যালগরিদম কী দেখাচ্ছে, তা নয়; প্রশ্ন হলো, দর্শক কতটা জানেন এই ব্যবস্থার কার্যপ্রণালি, নির্মাতারা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন এবং বৈচিত্র্যময় বাংলা কনটেন্টের জন্য কতটা জায়গা তৈরি হচ্ছে। কারণ, শেষ পর্যন্ত বিনোদনের মূল্য শুধু কতজন দেখলেন, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। কী দেখলেন, কেন দেখলেন এবং কীভাবে সেই কনটেন্ট তাদের ভাবনায় প্রভাব ফেলল-সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

