সাক্ষাৎকারের বদলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস
গণমাধ্যমের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে তারকাদের!
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের শোবিজে একটি প্রবণতা এখন বেশ দৃশ্যমান। তারকারা নিজেরাই এখন নিজেদের মুখপাত্র হিসাবে দাঁড়িয়ে গেছেন। শাকিব খান, সিয়াম আহমেদ, জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, মেহজাবীন চৌধুরী, বিদ্যা সিনহা মিম, সাবিলা নূর, পূজা চেরী, তানজিন তিশাসহ প্রায় সব তারকাই ব্যক্তিগত বা পেশাগত বিষয়ে সরাসরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য প্রকাশ করছেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে পরীমনি তার গ্রেফতারের প্রায় পাঁচ বছর পর দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে ২০২১ সালের ঘটনাকে নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেন। পরে সেই বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে খবরের বিষয় হয়ে ওঠে।
মাস কয়েক আগে মেহজাবীনের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। একটি মামলা নিয়ে তিনি ফেসবুকে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন এবং অভিযোগের বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন। সংবাদমাধ্যম তার পোস্টকে কেন্দ্র করেই বিষয়টি পাঠকের সামনে তুলে ধরে। সাম্প্রতিক সময়ে তানজিন তিশাও তাকে ঘিরে একটি মামলার বিষয়ে ফেসবুকে নিজের বক্তব্য দিয়েছেন। আর সাংবাদিকরা সেটাই নিজেদের গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন।
কেন এমন করছেন তারকারা? কারণটা খুব সরল-নিজের কথা বলার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখা। সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক প্রশ্ন করবেন, উত্তর থেকে সংবাদ তৈরি হবে, সম্পাদনা হবে এবং শেষ পর্যন্ত পাঠকের কাছে যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই মধ্যবর্তী ধাপগুলো অনেকটাই থাকে না। তারকা নিজেই ঠিক করেন কী বলবেন, কতটুকু বলবেন, কোন ছবি দেবেন এবং কোন বিষয় এড়িয়ে যাবেন। একইসঙ্গে পোস্ট প্রকাশের পর সরাসরি ভক্তদের প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়।
এটি তারকাদের কাছে নিঃসন্দেহে বড় সুবিধা। বিদ্যা সিনহা মিম যেমন এক সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিগত বিষয় ব্যক্তিগত রাখার কথা বলেছেন। আবার সামাজিক মাধ্যমে নিজের কাজ, পরিবার ও দৈনন্দিন জীবনের নানা মুহূর্তও তিনি নিজেই প্রকাশ করেন। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তার কাছে শুধু প্রচারের জায়গা নয়, নিজের ইমেজ ও ব্যক্তিগত পরিসরের সীমারেখা নির্ধারণেরও একটি মাধ্যম।
তারকাদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়। সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকারের জন্য সময় বের করা, সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলা, ছবি তোলা-সবকিছুর প্রয়োজন হয়। বিপরীতে একটি মোবাইল ফোন থেকেই কয়েক মিনিটে পোস্ট করা যায়। সেই পোস্ট মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশে তারকাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শাকিব খান থেকে জয়া আহসান, অপু বিশ্বাস, বুবলী, মেহজাবীনসহ অনেক তারকাই কাজের খবর থেকে ব্যক্তিগত বক্তব্য পর্যন্ত সরাসরি ফেসবুকে প্রকাশ করছেন।
কিন্তু সাংবাদিকতার জন্য এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন চ্যালেঞ্জ। কারণ তারকার নিজের বক্তব্য আর সাংবাদিকতার প্রতিবেদন এক জিনিস নয়। একটি পোস্টে তারকা তার নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন-সাংবাদিকের কাজ হলো সে বক্তব্যকে যাচাই করা, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, প্রেক্ষাপট খুঁজে বের করা এবং পাঠককে সম্পূর্ণ চিত্রটি দেওয়া।
দেশের প্রখ্যাত সাংবাদিকরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন স্পষ্টভাবেই। তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল তথ্য প্রবাহ থাকলেও সেখানে সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ নেই; ফলে কোন তথ্য সত্য, কোনটি গুজব বা ভুল-তা যাচাইয়ের প্রয়োজন থেকেই যায়। তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের তুলনায় দায়িত্বশীলতার ঘাটতি বড়।
অর্থাৎ একজন তারকা যখন লিখছেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা বলা হচ্ছে’, সেটি সংবাদযোগ্য বক্তব্য হতে পারে; কিন্তু সেটিই পুরো সংবাদ নয়। সাংবাদিককে খুঁজতে হবে-অভিযোগটি কী, অপর পক্ষ কী বলছে, কোনো নথি আছে কি না, আগের ঘটনার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী। তারকার পোস্ট তাই সাংবাদিকতার শেষ ধাপ নয়, বরং অনেক সময় অনুসন্ধানের শুরু।
এখানেই বদলে যাচ্ছে বিনোদন সাংবাদিকতার চরিত্রও। আগে ‘তারকা কী বললেন’ ছিল বড় খবর। এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত-‘তারকা যা বললেন, তার পেছনের ঘটনা কী?’ অর্থাৎ কোটনির্ভর সাংবাদিকতা থেকে প্রেক্ষাপট ও যাচাইনির্ভর সাংবাদিকতার দিকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
গণমাধ্যম গবেষণায়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ দ্বৈত ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। বাংলাদেশের সাংবাদিকদের নিয়ে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ফেসবুক সাংবাদিকদের খবর ছড়ানো, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া এবং সূত্র বা খবরের ক্লু খুঁজে পেতে সহায়তা করে। একইসঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে সাংবাদিকতার নৈতিক চর্চা নিয়ে ঝুঁকির কথাও গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তারকারাও অবশ্য সাংবাদিকতাকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন-এমনটা বলা কঠিন। বরং সম্পর্কটি বদলে যাচ্ছে। আগে সাংবাদিক ছিলেন তথ্য পাওয়ার অন্যতম দরজা; এখন তারকার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উৎস। সাংবাদিকের কাজ তাই শুধু বক্তব্য সংগ্রহ নয়, সে বক্তব্যের সত্যতা, প্রভাব ও প্রেক্ষাপট যাচাই করা।
এ পরিবর্তনের ইতিবাচক দিকও আছে। কোনো তারকা ভুলভাবে উদ্ধৃত হয়েছেন মনে করলে নিজের প্ল্যাটফর্মে সঙ্গে সঙ্গে বক্তব্য পরিষ্কার করতে পারেন। কোনো গুজব ছড়ালে সরাসরি প্রতিবাদ জানাতে পারেন। এতে করে তারকারা বিতর্কিত বিষয়ে নিজেদের অবস্থান দ্রুত প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছেন। নিজেদের জীবনের কোনো ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দিতে পারছেন, যেখানে একটি সাধারণ সংবাদ প্রতিবেদনে হয়তো তার পুরো বক্তব্যের জায়গা হতো না।
তবে বিপদও আছে। তারকার পোস্ট অনেক সময় আবেগপ্রবণ হতে পারে, একপক্ষীয় হতে পারে কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর দাঁড়াতে পারে। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা সংবাদমূল্যকে প্রভাবিত করতে পারে। যে পোস্টে বেশি প্রতিক্রিয়া, সেটিই যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ-এমন প্রবণতা সাংবাদিকতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ‘ভাইরাল’ আর ‘গুরুত্বপূর্ণ’ এক অর্থ বহন করে না।
ফলে তারকার নিজের বক্তব্য সাংবাদিকতার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সাংবাদিকতার জন্য নতুন এক প্রাথমিক উৎস। সাংবাদিক আমিরুল মোমেনিন মানিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সাংবাদিকতার অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসাবে দেখেছেন। আর সে বাস্তবতায় বিনোদন সাংবাদিকতার সামনে মূল প্রশ্ন এখন ‘তারকা কী বললেন’ নয়, ‘তারকার বলা কথার বাইরে আর কী জানা দরকার’।
কারণ তারকা নিজের গল্প নিজে বলতে পারেন, নিজের ছবি নিজে প্রকাশ করতে পারেন, এমনকি নিজের পক্ষে যুক্তিও দিতে পারেন। কিন্তু গল্পের অন্য চরিত্রগুলোকে খুঁজে বের করা, তথ্য মিলিয়ে দেখা, নথি যাচাই করা এবং পাঠকের সামনে পুরো ছবিটি তুলে ধরা-এ কাজটি এখনো সাংবাদিকেরই। সাক্ষাৎকারের চেয়ার হয়তো ছোট হয়ে এসেছে, কিন্তু সাংবাদিকের কাজ শেষ হয়ে যায়নি; বরং সেই কাজের ধরনটাই বদলে গেছে।

