আওয়ামীপন্থি শিল্পীরা এখনো সক্রিয়
বিশ্বের অধিকাংশ দেশের শোবিজ তারকাদের রাজনীতিতে সংশ্লিষ্টতা দেখা গেছে। ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও। নাটক-সিনেমা বা সংগীতাঙ্গনের অনেককেই দেখা গেছে রাজনীতির ময়দানে। তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে শিল্পীদের যে রাজনৈতিক অবস্থান, তা নিয়ে বেশ বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেক শিল্পীই সমালোচিত হয়েছেন। কারণ, শিল্পীর দায়িত্ববোধ থেকে সরে গিয়ে, জনগণের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে তারা ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থনে মত্ত হয়েছিলেন। এ ছাড়া আন্দোলনপরবর্তী শিল্পীদের এমন কাণ্ড এখনো থেমে নেই, বরং এতে যোগ দিয়েছেন নতুন করে অনেক শিল্পী। যাদের বলা হচ্ছে ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’। বিস্তারিত রয়েছে প্রতিবেদনে।
Advertisement
রিয়েল তন্ময়
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সিনেমা, নাটক, গান ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিল্পীরা সাধারণ মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছেন। পেয়েছেন তারকাখ্যাতি। বিনোদন জগতের সেই খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতির মাঠে সুবিধা গ্রহণ নতুন কিছু নয়। বিনোদন জগতের মুখ্য চরিত্র হিসাবে তারা পরিচিত। তাদের ভূমিকা শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রসার ও তথ্যপ্রবাহের দ্রুততার কারণে শোবিজ তারকাদের বক্তব্য, পোস্ট এবং কর্মকাণ্ড মুহূর্তেই প্রচার পায়, যা তাদের প্রভাবকে আরও বৃদ্ধি করেছে। আর এটিকেই যখন উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভিন্ন খাতে ব্যবহার করে জনগণের ক্ষতির চিন্তা করা হয় বা নিজ স্বার্থ হাসিলে ব্যবহার করা হয়, তখন শিল্পীর শিল্পী মর্যাদা আর অক্ষুণ্ন থাকে না। সাম্প্রতিক সময়ে তেমনই কিছু বিতর্কিত কাজে জড়িয়ে শোবিজ তারকারা হারিয়েছেন তাদের প্রতি জনগণের সম্মান, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালীন বাংলাদেশের শোবিজ অঙ্গনের অনেকেই তাদের সমর্থন প্রকাশ করেছেন। অভিনেতা, নির্মাতা ও সংগীতশিল্পীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। এ প্রকাশিত সমর্থন তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করে। অন্যদিকে ফ্যাসিস্টের সহযোগী হিসাবে কাজ করেছেন শোবিজ অঙ্গনের দুই শতাধিক নামি-বেনামি শিল্পী। তারা ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান দমাতে তৎকালীন স্বৈরাচার সরকার শেখ হাসিনার পক্ষে কাজ করেছেন। এমনকি আন্দোলন প্রতিহত করতে নিজেদের মধ্যে প্রতিনিয়ত যোগসাজশ করতেই চালু করেছিলেন একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। নাম ‘আলো আসবেই’। এতে পরিকল্পনা করা হয় ছাত্রদের গায়ে ‘গরম পানি’ ঢেলে দেওয়ার। এমনকি আন্দোলনকে সমর্থন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাল প্রোফাইল ধারীদের চিনে রেখেছেন বলেও হুমকি প্রদান করা হতো। এ ছাড়া যেসব শিল্পী প্রকাশ্যে বা পরোক্ষভাবে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পক্ষে কাজ করেছেন তাদেরও নানাভাবে হুমকি এবং মামলার ভয় দেখানোও হয়েছে। তবে তাদের সেই সুযোগ আর আসেনি। বলা যায়, শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ায় আলো আসার আগেই অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে ফ্যাসিস্টের দোসর হিসাবে সেসব চিহ্নিত আওয়ামী সুবিধাভোগী শিল্পী।
গত বছরের ৫ আগস্ট হাসিনা পালিয়ে গেলে সেই ‘আলো আসবেই’ গ্রুপের বেশকিছু স্ক্রিনশট ফাঁস হয় এবং বেরিয়ে আসে নব্য মীরজাফরদের নাম। এ তালিকায় রয়েছেন ফেরদৌস, রিয়াজ, সাজু খাদেম, আজিজুল হাকিম, বদরুল আনাম সৌদ, রওনক হাসান, ফজলুর রহমান বাবু, আশরাফ কবীর, সাইমন সাদিক, জায়েদ খান, হারুনুর রশিদ, ঝুনা চৌধুরী, লিয়াকত আলী লাকি, সৈয়দ আওলাদ, সাইফ খান, স্মরণ সাহা, সায়েম সামাদ, শাকিল (দেশনাটক), শহীদ আলমগীর, মুশফিকুর রহমান গুলজার, মিলন ভট্টাচার্য, এসএ হক অলীক, রাজিবুল ইসলাম রাজিব, অরুণা বিশ্বাস, তানভীন সুইটি, জ্যোতিকা জ্যোতি, শামীমা তুষ্টি, সুবর্ণা মুস্তাফা, বিজরী বরকতুল্লাহ, সোহানা সাবা, স্বাগতা, শমী কায়সার, আশনা হাবীব ভাবনা, উর্মিলা শ্রাবন্তী কর, হৃদি হক, নূনা আফরোজ, রোকেয়া প্রাচীসহ আরও অনেকে। যাদের অনেকেই পালিয়ে গেছেন বিদেশে। আবার অনেকেই গা ঢাকা দিয়ে আছেন, তবে সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়। প্রতিনিয়ত অন্তর্বর্তী সরকারের সমালচনা করতে দেখা যাচ্ছে তাদের। আবার অনেকেই নিয়মিত নাটক, সিনেমার কাজও করছেন। এ দের আবার কাজের সুযোগ করে দিচ্ছেন কেউ কেউ।
এদিকে গত ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছেন শোবিজের অনেকেই। যাদের ইতোমধ্যে ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’ নামে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ১৬ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ছবি সংবলিত একটি ব্যানার টাঙ্গিয়ে জুতা নিক্ষেপ কর্মসূচিও পালন করেন বিপ্লবী জনতার একাংশ। এ ঘটনায় তারকাদের রাজনৈতিক অবস্থান এবং জনমতের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধা জানানো ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’ তালিকায় রয়েছেন অভিনেতা শাকিব খান, আর্টসেল ব্যান্ডের সদস্য সংগীতশিল্পী লিঙ্কন, শিল্পী রাহুল আনন্দ, অভিনেতা সাজু খাদেম, রওনক হাসান, খায়রুল বাসার, ইরফান সাজ্জাদ, জাহের আলভি, আরশ খান, স্বাধীন খসরু, কচি খন্দকার, সুমন আনোয়ার, অভিনেত্রী অরুণা বিশ্বাস, নাজিফা তুষি, মুমতাহিনা টয়া, সুনেরাহ বিনতে কামাল, পিয়া জান্নাতুল, পারসা মেহেজাবিন, মেহের আফরোজ শাওনসহ আরও অনেকে।
‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’ হিসাবে চিহ্নিত এমন শিল্পীদের শক্ত হাতে প্রতিহত করারও ডাক দেন ছাত্রসমাজ। সব ধরনের কাজ থেকে তাদের বয়কট করারও দাবি তোলেন তারা। এমনকি যারা তাদের নিয়ে কাজ করবেন প্রয়োজনে তাদেরও বয়কট করা হবে এবং চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার কথাও জানায় ছাত্রসমাজ।
