মহেশপুর পৌরসভায় ড্রেন নির্মাণ
‘কাজের এক পার্সেন্ট আমার’
উপসহকারী প্রকৌশলীর অডিও রেকর্ডিং ফাঁস
মহেশপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মহেশপুর পৌরসভায় ব্যাপক অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলছে সরকারি ড্রেন নির্মাণকাজ। এ কাজ নিয়ে পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের ঘুস দাবির একটি অডিও রেকর্ডিং ফাঁস হয়েছে। ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিংয়ে একপর্যায়ে তাকে ঠিকাদারের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘কাজের এক পার্সেন্ট আমার।’
জানা যায়, পৌরসভার ড্রেন নির্মাণকাজের ইস্টিমেট অনুযায়ী বান্ডিং রড কম দেওয়া, লিপটিং স্লাপে ফিলেট রড ব্যবহার না করা, সিলেকশন পাথরের সঙ্গে কুষ্টিয়ার মোটা বালু ভেজালসহ ঢালাইয়ে সিমেন্টের পরিমাণ কম দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মোটা অঙ্কের ঘুস লেনদেনের মাধ্যমে পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামকে ম্যানেজ করে অনিয়মের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ঠিকাদাররা। তবে ঘুস দিতে রাজি না হলে বিভিন্নভাবে ঠিকাদারদের হেনস্তা করার অভিযোগও রয়েছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
আইইউজিআইপি প্রকল্পের আওতায় মহেশপুর পৌরসভার ১ম ও ২য় ধাপে ৪২ কোটি টাকার ড্রেন ও রাস্তা নির্মাণকাজ করছে র্যাবআরসি ও ডকইয়ার্ড নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে।
এর আগে একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশিত হলেও তৎকালীন পৌর প্রশাসকের মদদপুষ্ট হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেননি। ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘুস দাবির বিষয়টি সাইফুল ইসলামের নিজের মুখে স্বীকার করার একটি অডিও রেকর্ডিং যুগান্তরের হাতে এসে পৌঁছেছে।
ওই অডিও রেকর্ডিংয়ে ডকইয়ার্ড প্রকৌশলীদের উদ্দেশে উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামকে বলতে শোনা যায়, ‘সব দিমু সব, আপনাদের সাইডেও পাকশির বালি দিমু। চুক্তি করতেছি কি... (অশ্লীল বাক্য) ছিঁড়তে? র্যাবআরসি আমারে মাসে ৭৫ হাজার টাকা দেবে, কাজের এক পার্সেন্ট আমার। আর বাদবাকি টাকা আমারে বিলের সময় দেবে। এখন চার কোটি টাকার বিল চাই। তিন কোটি টাকার বিল পুরাইতে গেলেও আমারে মাল দেওয়া লাগবে। তা না হলে জেনুইন ফেজের বিল দিয়া দিমু। বাড়তি দিমু না। হেগো কইলাম গাড়াবাড়ীয়ায় দ্রুত ভেকু লাগান, যদি এক হাজার মিটার ড্রেন থাকে ৫০০ মিটার মাটি কাইট্টালান, চার কোটি টাকার বিল দিয়া দিমুনে। আমি হইলাম ইনচার্জ।
এই টোটাল মহেশপুর পৌরসভার যেখানে যে কাজ হইবে, সেই কাজের ইনচার্জ আমি। আমার হিসাবনিকাশ আলাদা। ওরে (ঠিকাদার) কইছি সারাদিন খাটটাখুটটা আপনার ম্যানেজাররে কওয়া লাগে যে ভাই আমারে দুই হাজার টাকা দেন। হেয় আমারে কয় হেড অফিসে কথা কন। আপনারা কি খয়রাতি সাজাইছেন আমারে। অহন চার কোটি টাকার বিল চান? আমারে সাইডে খয়রাতি বানাই থুয়বেন।
তারপর কয় (ঠিকাদার) না না আপনি রাগ হয়েন না আপনার (সাইফুল) বিষয়টা আমরা বুঝি। কী করতে হবে আপনি কন। হেরপর র্যাবআরসির সঙ্গে আমার রফাদফা হইছে এক পার্সেন্টে। র্যাবআরসি বলছে, আমারে এক পার্সেন্ট টাকা দেবে। প্রতিমাসে দেবে ৭৫ হাজার টাকা, আর বাকি টাকা বিলের সময় দেবে।’
ড্রেন নির্মাণকাজের মিস্ত্রি লিটন যুগান্তরকে বলেন, ‘কাজ শুরু থেকে পৌরসভার গেট পর্যন্ত লিপটিং স্লাপের আগাগোড়া কোথাও ফিলেট রড দেওয়া হয়নি। পৌরসভার উপপ্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম ঠিকাদারদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে রাতারাতি ঢালাই কাজ করিয়েছেন। মাছ হাটের ওই পাশের কালভার্ট থেকে মাঝখান পর্যন্ত বেশকিছু অংশে ডাবল খাঁচার পরিবর্তে রাতারাতি একটি করে খাঁচা দিয়ে সাইফুল ইসলাম ঢালাই করিয়েছেন। উনি প্রচুর পরিমাণে ঘুস খাচ্ছেন। সাইফুল সাহেব নিজে সিলেকশন পাথরের সঙ্গে কুষ্টিয়ার বালি ভেজাল দিয়ে কাজ করিয়েছেন। এসব করিয়ে তিনি ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রতিদিন ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা করে নিচ্ছেন। যদি ঠিকাদারের ম্যানেজার টাকা দিতে না চান তাহলে হেড অফিসে ওই ম্যানেজারের নামে অভিযোগ দেন সাইফুল ইসলাম।’
ডকইয়ার্ডের সদ্য চাকরি হারানো প্রকৌশলী বাকী বিল্লাহ বলেন, ‘সাইফুল ইসলাম টাকা নেওয়ার জন্য আমাদের চাপ দিতেন। টাকা না দিলে হুমকি দিতেন। যখন-তখন পাঁচ হাজার, ১০ হাজার টাকা চেয়ে বসতেন। বলতেন, ঠিকাদারকে বলেন আমাকে টাকা দিতে। উনার ভয়ে পৌরসভার কেউ কথা বলত না। উনি আমাদের সিমেন্ট বাঁচানো, রডের স্পেসিং বাড়ানো ও কুষ্টিয়ার বালু ভেজাল দিতে বলতেন। এছাড়া তিনি প্রতিদিন সাইডে আসার দরুন দুই হাজার করে টাকা দাবি করতেন।’
রেকর্ডিংয়ের ব্যাপারে উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঠিকাদাররা আমাকে ঘুস দিতে চান এটা বলেছি। আমি ঘুস নিয়েছি একা কিন্তু একবারও বলিনি। অনেক সময় অনেক বিষয়ে আলোচনা করি। মূলত আমাকে হেনস্তা করার জন্য গোপনে আমার কথাগুলো রেকর্ডিং করা হয়েছে।’
সদ্য যোগদান করা পৌর প্রশাসক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমি রেকর্ডিংটি শুনেছি। এটা খুবই দুঃখজনক। উনি যদি এ ধরনের কাজে যুক্ত থাকেন তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
