‘মুক্তার সিন্ডিকেটের’ গলাকাটা টোল!
কমলনগরে বিআইডব্লিউটিএ’র লঞ্চঘাট দখল
শাহরিয়ার কামাল, কমলনগর (লক্ষ্মীপুর)
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কমলনগরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) অধীন মতিরহাট ও মাতাব্বরহাট লঞ্চঘাটে টোল আদায়ের নামে চরম নৈরাজ্য চলছে। মুক্তার হোসেন নামে জেলা পরিষদের এক খেয়াঘাট ইজারাদার সিন্ডিকেট তৈরি করে বেপরোয়া এ অনিয়ম করে যাচ্ছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, চরকালকিনির আলমগীর হোসেনের ছেলে মুক্তার হোসেন লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের অধীন ভোলা-লক্ষ্মীপুর (নৌ-রুট) খেয়াঘাট গত ১ জুলাই থেকে এক বছরের জন্য ইজারা নেন। ইজারার শর্ত অনুযায়ী খেয়া নৌকায় যাত্রী পারাপার ও মালামাল পরিবহণ থেকে তিনি নির্ধারিত হারে টোল আদায় করবেন। কিন্তু ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে তিনি কয়েকগুণ লাভে স্থানীয় কাদির, আক্তার, মানিক ও শাহজাহান নামে চার ব্যক্তির কাছে খেয়া ঘাটটি সাব-ইজারা দিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, জেলা পরিষদের খেয়াঘাট ইজারা নিয়ে তিনি দখলে নেন বিআইডব্লিউটিএ’র মতিরহাট ও মাতাব্বরহাট লঞ্চঘাট দুটি। মুক্তার হোসেন চট্টগ্রাম বন্দরে মুদি ব্যবসা করার সময় বিআইডব্লিউটিএ’র কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। ওই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি লঞ্চঘাট দুটির ইজারা প্রক্রিয়াও পণ্ড করে দেন। জানা গেছে, মতিরহাট ও মাতাব্বরহাট লঞ্চঘাট ইজারার জন্য বিআইডব্লিউটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় দরপত্র আহ্বান করলে আগ্রহী ব্যক্তিরা তৎপরতা শুরু করেন। মুক্তার সেই প্রক্রিয়াকে পণ্ড করতে ঘাট দুটি বিআইডব্লিউটিএ’র আওতাভুক্ত নয় দাবি করে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন (নং-৪৪২২/২৬) করেন। আদালত গত ৬ মাসের জন্য ইজারা প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ দেন। যে কারণে, সরকারি রাজস্ব আদায় সমুন্নত রাখতে বিআইডব্লিউটিএ দুজন শুল্ক আদায়কারী কর্মকর্তাকে খাস কালেকশনের দায়িত্ব দিয়ে ঘাটে পাঠায়। তোফাজ্জল হোসেন ও শামীম আল শাকিব এ দুই কর্মকর্তা কিছুদিন খাস কালেকশন পরিচালনাও করেন। এরই মধ্যে গত ২১ জুলাই মুক্তার আইনজীবীর মাধ্যমে হাইকোর্টের ওই রিট পিটিশনটির সম্পূরক (সাপ্লিমেন্টারি) শুনানি করান। আদালত তিন কার্যদিবসের মধ্যে বাদীর লিখিত বক্তব্য জমার নির্দেশ দিয়ে ১৫ আগস্ট চূড়ান্ত আদেশের দিন ধার্য করেন। তবে ওই তারিখে অজানা কারণে কোনো ধরনের সুরাহা হয়নি। মুক্তার আদালতের সেই আদেশ কপির বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে খাস কালেকশনের জন্য নিযুক্ত বিআইডব্লিউটিএ’র দুই কর্মকর্তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ঘাট ছেড়ে যেতে বাধ্য করেন। ঘাট ছেড়ে যাওয়ার বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র শুল্ক আদায়কারী কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ঘাটে প্রতিদিন চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতো। ‘মুক্তার সিন্ডিকেটের’ লোকজন আমাকে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকায় ফিরে এসেছি। এদিকে স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, হাইকোর্ট এ ব্যাপারে চূড়ান্ত রায় না দিলেও মুক্তার নিজেকে ঘাটের প্রকৃত ইজারাদার দাবি করে দুটি লঞ্চঘাট এলাকাকে পৃথক কয়েকটি গ্রুপে অন্তত ৬০ লাখ টাকায় সাব-ইজারা দিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, বিআইডব্লিউটিএ লক্ষ্মীপুর অফিসের কর্মকর্তা শাহ আলমের পরামর্শেই মুক্তার প্রথমে হাইকোর্টে রিট এবং পরবর্তীতে সম্পূরক শুনানি করিয়েছেন। কোনো চূড়ান্ত নির্দেশনা ছাড়া আদালতের শুনানির কাগজ দেখেই কর্মকর্তাদের ঘাট ছেড়ে চলে যাওয়া তাদের পারস্পরিক যোগসাজশেরই বহিঃপ্রকাশ। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তার হোসেন বলেন, আমি জেলা পরিষদ থেকে খেয়াঘাটের ইজারা নিয়েছি। বিআইডব্লিউটিএ এখানে সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিকভাবে টোল আদায়ের চেষ্টা করছিল। তাই আমি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি। একই ঘাটেতো আর দুই কর্তৃপক্ষের ইজারা চলতে পারে না। এ বিষয়ে ইউএনও রাহাত উজ-জামান বলেন, সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে ঘাটে বেআইনি টোল আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। ভুক্তভোগীদের তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুতই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদ প্রশাসক সাহাব উদ্দিন সাবু বলেন, জেলা পরিষদের খেয়াঘাটের ইজারার দোহাই দিয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র নদী বন্দরে চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ অবৈধ। মুক্তার হোসেন এমন প্রতারণা করে থাকলে তার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
