সন্তানদের জীবন গুছিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে হান্নান
চার সন্তানের তিনজনই সরকারি চাকরি করেন * ২০ বছর ধরে কোনো ছেলেই খোঁজ নেননি * ভিটেমাটি ভাতিজাদের দখলে
আব্দুল হান্নান। ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিকাল নামলেই আশ্রয়কেন্দ্রের বারান্দায় এসে বসেন আব্দুল হান্নান। আশপাশে আরও অনেক প্রবীণ মানুষ। কেউ গল্প করেন, কেউ নীরবে বসে থাকেন, কেউবা দূরে তাকিয়ে নিজের ভেতরেই ডুবে থাকেন। হান্নানও চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন দূরের দিকে। দৃষ্টির সামনে আশ্রমের সবুজ অভয়ারণ্য থাকলেও হান্নানের স্মৃতিতে সৈনিক জীবনের সেই দিনগুলো আর সন্তান ও নাতি-নাতনিদের কাছে না পাওয়ার বেদনা।
১৯৫০ সালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার বাঁশবাড়িয়া গ্রামে আব্দুল হান্নানের জন্ম। কর্মজীবনে ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে। পরে ১৯৮৬ সালে অবসর নেন। বর্তমানে তিনি গাজীপুর সদরের ভাওয়াল মির্জাপুর ইউনিয়নের বিশিয়া কুড়িবাড়ী, মনিপুর এলাকায় একটি বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে গত দুই বছর ধরে থাকছেন। এখানে তার মতো আরও অনেক প্রবীণ নারী-পুরুষের আশ্রয় হয়েছে। চারপাশে মানুষ থাকলেও হান্নানের নিজের মানুষগুলো নেই। আর এই না থাকার শূন্যতাই যেন তার কাছে সবচেয়ে বড় কষ্টের।
বুধবার ওই বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে আব্দুল হান্নান বলেন, তার জীবনে সংসার এসেছে দুবার। প্রথম স্ত্রী ১৯৭৪ সালে তাকে ছেড়ে চলে যান। তখন তাদের একটি সন্তান ছিল। বাবার মতো তিনিও সেনাবাহিনীতে চাকরি করেন। পরে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন হান্নান। সেই সংসারে জন্ম নেয় আরও তিন সন্তান। ছেলে আইনুল ইসলাম আনসার। বড় মেয়ে রুনা খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ছোট মেয়ে রুমারও বিয়ে হয়েছে। সন্তানদের সবাই শিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত। সন্তানদের জীবন গোছানো হলেও তাদের বাবার জীবনে যেন ক্রমেই বেড়ে চলেছে একাকিত্ব।
হান্নান বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে তার চার ছেলের কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই। এত দীর্ঘ সময় কেটে গেছে, অথচ সন্তানের সঙ্গে বাবার সেই স্বাভাবিক কথোপকথনটুকুও হয় না। সময়ের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে, আর সেই দূরত্ব এখন যেন এক অদৃশ্য দেওয়াল। তবুও সন্তানদের ভুলে যাননি। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কথাই যেন আরও বেশি মনে পড়ে। সন্তানদের এবং নাতিদের কথা খুব মনে পড়ে। কিন্তু কোথাও ঠাঁই নেই বলে থেমে যান হান্নান।
শুধু সন্তানদের কাছ থেকে দূরত্ব নয়, নিজের ভিটেমাটিও হারিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন হান্নান। গোপালগঞ্জের বাড়িতে তার নামে জমিজমা ছিল। কিন্তু ভাইয়ের ছেলেরা সেসব দখল করে নিয়েছে। নিজের নামে কাগজপত্র থাকার পরও জমি বুঝে পাননি তিনি। তিনি বলেন, সব হারিয়ে এখন স্মৃতিই তার সবচেয়ে বড় সঙ্গী।
বৃদ্ধ হান্নানের আফসোস, তার এক নাতির বিয়েও হয়েছে। কিন্তু সেই বিয়েতে তাকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। একজন দাদার কাছে নাতির বিয়ে সবচেয়ে বড় আনন্দের। কিন্তু হান্নান সেই আনন্দের ভাগটুকুও পাননি।
মনিপুর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটির ইনচার্জ মো. বাদল মিয়া বলেন, বর্তমানে এখানে ৭০ জন নারী ও ৬৫ জন পুরুষ রয়েছেন। কারও সন্তান নেই, কারও সন্তান থেকেও নেই, কেউ পারিবারিক নানা জটিলতায়, আবার কেউ জীবনের প্রতিকূলতায় এসে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। প্রত্যেকের জীবনের গল্প আলাদা।

