সুদ পরিশোধে বড় চাপ
রাজস্ব আদায় না হলে আর্থিক ব্যবস্থাপনা কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাজেট ঘাটতি, ঋণের বোঝা ও সুদ পরিশোধের বড় চাপে চ্যাপটা হতে পারে সরকার। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়লে আগামী অর্থবছরে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। সরকার এই ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে।
যদিও সরকার ঘাটতিকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করছে। তবে বাস্তবতা হলো-এক দশকে ঋণনির্ভর অর্থায়নের কারণে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাজেট বক্তৃতায় সরকার নিজেই স্বীকার করেছে যে, অতীতে ব্যাপক ঋণ গ্রহণের কারণে দেশের ঋণ পরিশোধ ও সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজেট ঘাটতির ওপর।
সরকারের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো ঋণ টেকসইতার ঝুঁকি। বাজেট নথিতে উল্লেখ করা হয়, অতীতে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অপরিকল্পিত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিপুল ঋণ গ্রহণ করায় বাংলাদেশ বর্তমানে ঋণঝুঁকির মুখে রয়েছে। সরকার এখন ঋণের ঝুঁকিকে ‘মধ্যম’ স্তর থেকে ‘নিম্ন’ স্তরে নামিয়ে আনতে চায়। এজন্য বাজেট ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা হতে পারে সুদ পরিশোধ। গত কয়েক বছরে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় সুদ ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ এখন উন্নয়ন ব্যয়ের পরিবর্তে ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ফলে নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাজেটেও স্বীকার করা হয়েছে, ঋণ ও সুদ পরিশোধ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বাজেটে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সরকার আগামী অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছে। এর ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ কিছুটা বাড়তে পারে এবং ব্যাংক খাতে সরকারের অতিনির্ভরতা কমবে। যদিও অতীত রেকর্ড তা বলে না। ভর্তুকির ক্ষেত্রেও সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় সরাসরি বড় ধরনের নতুন ভর্তুকি কর্মসূচির ঘোষণা না দিয়ে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সর্বজনীন ভর্তুকির পরিবর্তে প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তার দিকে ঝুঁকছে সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সংস্কার কর্মসূচির আওতায় জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপও সরকারের ওপর রয়েছে। সার্বিকভাবে অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন, রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পরিকল্পনাও সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে। আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে কর-জিডিপির অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।
কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ না বাড়িয়ে এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সুদ বাবদ বরাদ্দ তেমন বাড়ছে না। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে সরকার যে পরিমাণ ঋণ নিয়ে রেখেছে, এর বিপরীতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই সুদ দিতে হবে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা করা হয়। সংশোধিত বাজেটকে ভিত্তি ধরলে নতুন বাজেটে সুদ ব্যয়ের বরাদ্দ বাড়ছে ৫০০ কোটি টাকা।
গত ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট ঋণ স্থিতি ছিল ২৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ স্থিতি ১৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ স্থিতি ১০ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। ঋণের পরিমাণ এত বেশি বলেই সুদের জন্য বরাদ্দও রাখতে হচ্ছে বেশি। এবার পরিচালন ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশই ব্যয় হবে ঋণের সুদ দিতে।
