কারিগরি শিক্ষা
দক্ষতার সঙ্গে স্বপ্নের সেতুবন্ধ
সালমা আকতার লিপি
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একসময় ক্যারিয়ার বলতে অনেকের চোখে ভেসে উঠত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, সরকারি চাকরি কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের ডেস্কে বসে কাজ করার ছবি। কিন্তু বদলে যাচ্ছে সেই চেনা ধারণা। কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তিত চাহিদা, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং দক্ষ কর্মীর প্রয়োজনীয়তা তরুণদের সামনে খুলে দিচ্ছে নতুন এক সম্ভাবনার দরজা-কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা। আজকের চাকরির বাজারে শুধু কী পড়েছেন, সেটিই সব নয়; বরং আপনি কী করতে পারেন, কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান কতটা দক্ষতার সঙ্গে করতে পারেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি উদ্যোগের নানা কর্মসূচি সেই বাস্তব দক্ষতা তৈরির পথকে আরও সহজ করার চেষ্টা করছে।
হাতে-কলমে শিক্ষা
কারিগরি শিক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ব্যবহারিক চরিত্র। বইয়ের জ্ঞানকে বাস্তব কাজের সঙ্গে যুক্ত করাই এর মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশে এ ধারার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ IsDB-BISEW-এর Vocational Training Programme। ২০১২ সালে শুরু হওয়া এ কর্মসূচি মূলত আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা তরুণদের কর্মোপযোগী দক্ষতা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এখানে ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিকস, মেশিনিস্ট, রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার-কন্ডিশনিং এবং ওয়েল্ডিং অ্যান্ড ফ্যাব্রিকেশনের মতো ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ প্রশিক্ষণের বিশেষত্ব শুধু ট্রেড শেখানো নয়; ছয় মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ, বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া, মাসিক ভাতা এবং সফলভাবে প্রশিক্ষণ শেষ করার পর চাকরির সংযোগ-সব মিলিয়ে এটি একজন তরুণকে দক্ষ কর্মীতে পরিণত করার একটি সমন্বিত মডেল।
এর ফলও একেবারে পরিমাপযোগ্য। IsDB-BISEW-এর তথ্য অনুযায়ী, ভোকেশনাল কর্মসূচিতে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৪৯ জন উপকারভোগী হয়েছেন, ২ হাজার ৬১২ জন ট্রেড কোর্স সম্পন্ন করেছেন এবং ২ হাজার ২১৪ জনের চাকরিতে নিয়োগের তথ্য রয়েছে। তাদের গ্র্যাজুয়েটদের নিয়োগ দিয়েছে ৩৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান।
ঝরে পড়া নয়, নতুন পথে যাত্রা
কারিগরি শিক্ষা অনেক তরুণের জন্য দ্বিতীয় সুযোগও তৈরি করতে পারে। অর্থনৈতিক কারণে যারা সাধারণ শিক্ষার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে না, তাদের জন্য দক্ষতা অর্জন হয়ে উঠতে পারে আত্মনির্ভরতার পথ। UCEP Bangladesh দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি Technical and Vocational Education and Training বা TVET-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। UCEP-এর যাত্রায় Technical School, Training InstituteGes Institute of Science and Technology-এর মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে; ২০১৫ সালে তাদের UCEP Institute of Science and Technology ডিপ্লোমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা চালু করে। অর্থাৎ কারিগরি শিক্ষা শুধু স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। এখান থেকে কেউ দ্রুত কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারে, আবার কেউ ধাপে ধাপে উচ্চতর কারিগরি শিক্ষার দিকেও এগিয়ে যেতে পারে।
শিল্পের প্রয়োজনে শিক্ষা
তবে দক্ষতা অর্জনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো-যে দক্ষতা শেখানো হচ্ছে, কর্মক্ষেত্রে কি তার চাহিদা আছে? এ জায়গায়ই বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়নব্যবস্থায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। Swisscontact-এর Skills Development Project-এর মতো উদ্যোগগুলো TVET প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সংযোগ বাড়ানো, প্রশিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের মান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা ILO-ও বাংলাদেশের skills development systemশক্তিশালী করার ক্ষেত্রে skills matching, প্রশিক্ষণের মান, সবার জন্য দক্ষতা অর্জনের সুযোগ এবং বিদেশগামী কর্মীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
দেশের বাইরেও সম্ভাবনার দরজা
কারিগরি দক্ষতার গুরুত্ব শুধু দেশের চাকরির বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে কাজ করতে যায়। সেখানে ভাষাজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কারিগরি দক্ষতা একজন কর্মীর আয় ও কর্মপরিবেশে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। এ কারণে কারিগরি প্রশিক্ষণকে শুধু ‘চাকরি পাওয়ার কোর্স’ হিসাবে না দেখে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুতির মাধ্যম হিসাবেও দেখা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ যদি আন্তর্জাতিক মান, আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে একজন তরুণ দেশের পাশাপাশি বৈশ্বিক কর্মবাজারেও প্রতিযোগিতা করতে পারে।
