ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ
শিক্ষার শক্তিতে আগামীর পথ
মোস্তফা মাহাথির
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গল্প শুধু ভবন, শ্রেণিকক্ষ কিংবা পরীক্ষার ফলাফলের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, শিক্ষক-অভিভাবকের প্রত্যাশা এবং একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলার দীর্ঘ প্রয়াস। ২০১০ সালে মাত্র ২৬১ শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হওয়া ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের পথচলাও তেমনই। দেড় দশকের বেশি সময়ে প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক কার্যক্রম, অবকাঠামো ও শিক্ষার্থীসংখ্যা বেড়েছে। ফলাফলের পাশাপাশি প্রযুক্তি, ব্যবহারিক শিক্ষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী-মাতুয়াইল এলাকার কলেজটি এগিয়ে চলেছে।
যে স্বপ্ন থেকে যাত্রা
ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লার উদ্যোগে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কলেজটি। প্রতিষ্ঠাতার নামেই এর নামকরণ-ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ (ডিএমআরসি)। শুরুতে শিক্ষার্থী ছিল ২৬১ জন। লক্ষ্য ছিল-এমন একটি শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একাডেমিক সাফল্যের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস বিকাশের সুযোগ থাকবে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এখানে চার শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। আর শিক্ষার্থীসংখ্যা বর্তমানে অনেক বেড়েছে বলে জানান অধ্যক্ষ মো. ওবায়দুল্লাহ নয়ন। তার ভাষ্য, ‘এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ায় বর্তমানে একটি ব্যাচের ক্লাস চলছে; প্রথম বর্ষের ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হলে শিক্ষার্থীসংখ্যা প্রায় ৯ হাজারে পৌঁছাতে পারে।’
একাডেমিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা
নিয়মিত ক্লাস, পাঠ পরিকল্পনা, ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও একাডেমিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। সেমিস্টারভিত্তিক শিক্ষা-পদ্ধতি ও মেধাভিত্তিক সেকশনও এর অংশ। পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ও বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। অধ্যক্ষ মো. ওবায়দুল্লাহ নয়ন বলেন, ‘ঢাকায়, এমনকি সারা দেশেও সেরা দশটি প্রতিষ্ঠানের নাম বললে এখন ডিএমআরসির নাম আসে। আমরা চেষ্টা করেছি চেয়ারম্যান মহোদয়ের (ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা) দিকনির্দেশনা, শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা, শিক্ষার্থীদের কঠোর অধ্যবসায় ও অভিভাবকদের ঐকান্তিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে এবং আমরা সক্ষম হয়েছি কলেজটিকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসতে।’
ফলাফলে দৃশ্যমান সাফল্য
একটি কলেজের একাডেমিক কার্যক্রমের অন্যতম দৃশ্যমান সূচক পরীক্ষার ফলাফল। ডিএমআরসিরও রয়েছে এ ক্ষেত্রে কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন। ২০১৪ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলে অষ্টম স্থান অর্জনের কথা জানায় কলেজ কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক ফলও ভালো করা ধারাবাহিকতারই ইঙ্গিত দেয়। ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় কলেজটির ৩ হাজার ১৮৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩ হাজার ১৭২ জন উত্তীর্ণ হয়। পাশের হার ৯৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পায় ৯২০ জন। একই সঙ্গে মেধাবৃত্তির পাশাপাশি নির্দিষ্টসংখ্যক অসচ্ছল শিক্ষার্থীকে প্রতিবছর বৃত্তি দেওয়ার কথাও জানান অধ্যক্ষ।
প্রযুক্তি ও ব্যবহারিক শিক্ষায় গুরুত্ব
শিক্ষাদানে প্রযুক্তির ব্যবহার ডিএমআরসির আরেকটি দিক। মাল্টিমিডিয়া ক্লাস ও বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পাঠদান ও শিক্ষাসংক্রান্ত যোগাযোগকে সহজ করার উদ্যোগ রয়েছে। নিজস্ব অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপের মাধ্যমেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরিতে রয়েছে বিজ্ঞান ল্যাব, কম্পিউটার ল্যাব ও লাইব্রেরি। এসব সুবিধা শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচির বিষয়গুলো হাতে-কলমে শেখার এবং স্বশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
যুক্তি ও সৃজনশীলতার চর্চা
শিক্ষার্থীদের একাডেমিক প্রস্তুতির বাইরে যুক্তিবোধ, অনুসন্ধিৎসা ও নেতৃত্বের দক্ষতা বিকাশেও বিভিন্ন কার্যক্রম রয়েছে। ডিবেটিং ক্লাবের মাধ্যমে যুক্তি দিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন ও ভিন্নমত বোঝার চর্চা হয়। বিজ্ঞান ক্লাব শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্কতা ও অনুসন্ধিৎসা বাড়াতে কাজ করছে। বিজ্ঞান ও গণিতভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। কবিতা, আবৃত্তি, গান, নাটক, মাইম ও চিত্রাঙ্কনের মতো কার্যক্রমে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহ ও সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ পায়। কলেজের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক শিপন চন্দ্র মিত্র বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান একজন স্বপ্নচারী মানুষ। তিনি কলেজটিকে শুধু ফলাফলে নয়, সামগ্রিক বিবেচনায় সেরা কলেজ হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। এজন্য শিক্ষার্থীদের মেধা-মননের পাশাপাশি সৃজনশীলতায় উৎসাহিত করার জন্য রয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। আমাদের প্রতিটি শিক্ষক-কর্মচারী কলেজের প্রতি আন্তরিক, শিক্ষার্থীরাও শ্রেণিকক্ষে মনোযোগী আর অভিভাবকরাও দায়িত্বশীল।’
সামনে আরও বিস্তৃত হওয়ার লক্ষ্য
ডিএমআরসির বর্তমান অগ্রযাত্রার পেছনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ। একাডেমিক কাউন্সেলিং, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ সহায়তার পাশাপাশি প্রযুক্তি ও সহশিক্ষা কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা রয়েছে। দেড় দশকের বেশি সময়ের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটির সামনে এখন চ্যালেঞ্জ একাডেমিক ফলের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য আরও কার্যকরভাবে প্রস্তুত করা। সেই লক্ষ্যেই শিক্ষা, প্রযুক্তি, ব্যবহারিক জ্ঞান ও সৃজনশীলতার সমন্বয়ে নিজেদের পরবর্তী অধ্যায় লিখতে চায় ডিএমআরসি।
