জুলাই সনদ স্বাক্ষরের দিন সংঘর্ষ
সংসদ এলাকায় সহিংসতায় নেপথ্যে কারা
নাশকতাকারীদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে
Advertisement
ইমন রহমান
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সংসদ ভবন এলাকায় শুক্রবার জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান ঘিরে ব্যাপক নাশকতার আগাম তথ্য ছিল না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। জুলাই যোদ্ধাদের সমীহ করার সুযোগ নিয়ে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর, কন্ট্রোল রুমের তাঁবুতে আগুনসহ ব্যাপক সহিংসতা চালানো হয়। আন্দোলনে হাজারখানেক লোক অংশ নিলেও সহিংসতা চালায় মুষ্টিমেয় লোক। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন মুহূর্তেই কেন জ্বালাও পোড়াওয়ে রূপ নিল, কারা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ল তা বের করতে তদন্তে নেমেছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে নাশকতাকারীদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। সন্দেহভাজন দুজনকে আটক করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। মামলার আসামির তালিকা ধরে রিমন বর্মণ নামের এক যুবককে গ্রেফতার করেছে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। ‘জুলাই যোদ্ধা’ ব্যানারে সংঘর্ষের ঘটনায় এখন পর্যন্ত পুলিশ বাদী হয়ে পাঁচটি মামলা করেছে। রাজধানীর ধানমন্ডি ও শেরেবাংলা নগর থানায় দায়ের করা এসব মামলায় অজ্ঞাত পরিচয়ের ৯৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সনদবিরোধী আন্দোলন সহিংস করে তুলতে ব্যাপক ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালানোর ঘটনায় তৃতীয় কোনো পক্ষের ইন্ধন থাকতে পারে। তা নিশ্চিত হতে গোপন তদন্ত শুরু হয়েছে। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া জুলাই যোদ্ধা সংসদের নেতারাও বলছেন, শুক্রবার জুলাই যোদ্ধাদের কাছে কোনো লাঠি বা ইটপাটকেল ছিল না। বহিরাগত একটি গোষ্ঠী ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে বলে তারাও মনে করছেন। তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের খুঁজে বের করার দাবি জানান তারা। ডিএমপির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, শুক্রবার সংসদ ভবন এলাকায় সংঘটিত নাশকতার আগাম কোনো তথ্য তাদের কাছে ছিল না। ঘটনার পারিপার্শ্বিকতার ভিত্তিতে তাদের ধারণা, জুলাই যোদ্ধাদের আন্দোলনে তৃতীয় কোনো পক্ষ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করেছে। তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। ওইসব দুষ্কৃতকারীকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে প্রকৃত তথ্য জানা যাবে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার কাজ চলমান আছে। কারও কোনো ইন্ধন ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক লোক আন্দোলনে অংশ নিলেও মুষ্টিমেয় কয়েকজন লাঠি নিয়ে সহিংসতায় অংশ নেয়। তারা আসলেই জুলাই যোদ্ধা নাকি নাশকতাকারী তার তদন্ত চলছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে জুলাই সনদ স্বাক্ষরের দিন শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ করেই জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ জুলাই যোদ্ধাদের অনেকে নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে গ্রিলের প্রাচীরের ওপর দিয়ে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ঢুকে পড়েন। এ সময় কয়েকশ আন্দোলনকারী মূল মঞ্চ এবং অতিথিদের জন্য নির্ধারিত স্থানে বসে পড়েন। দুপুর ১টার কিছু সময় আগে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মঞ্চে উপস্থিত হন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা। অনুষ্ঠানে জুলাইয়ে গণহত্যার বিচার, জুলাই যোদ্ধাদের যথোপযুক্ত সম্মান, আর্থিক সহায়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে আশ্বস্ত করেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তবে তার বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে না পেরে জুলাই যোদ্ধাদের কয়েকজন অনুষ্ঠানস্থল না ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়েন। এ সময় তাদের লাঠিচার্জ শুরু করে পুলিশ। এতে আহত হন বেশ কয়েকজন। একপর্যায়ে তাদের জাতীয় সংসদের দক্ষিণ ফটক দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। বন্ধ করা হয় ফটক। তখন বাইরে থেকে ইট ছুড়তে থাকেন জুলাই যোদ্ধাদের মিছিলে থাকা কেউ কেউ। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের গাড়ি। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় পুলিশের তাঁবুসহ কিছু অস্থায়ী স্থাপনায়। দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত ২৭ জন পুলিশ ও জুলাই যোদ্ধা আহত হয়ে চিকিৎসা নেন। জুলাই যোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক মাসুদ রানা যুগান্তরকে বলেন, ঘটনার সময় বহিরাগত একটি গোষ্ঠী সেখানে মিলিত হয়। তারা ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে। আমাদের উৎসুক কিছু জুলাই যোদ্ধা তাদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছে। তবে মূল নাশকতা করেছে তৃতীয় কোনো পক্ষ। তিনি বলেন, আমি দয়িত্ব নিয়ে বলছি, আমাদের সেন্ট্রাল কিমিটির একজন মেম্বার দেখেছেন-এক বহিরাগত যুবকের কোমরে পিস্তল ছিল। সে ছবি তুললে বহিরাগতরা তার মোবাইল চেক করে ছবিটি ডিলিট করে দেয়। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার বিষয়ে মাসুদ রানা বলেন, আমরা মামলা প্রত্যাহার করতে বলছি না। কারণ তদন্তের মাধ্যমে বহিরাগত যারা ছিল তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হোক।
পাঁচ মামলা : পুলিশের সঙ্গে জুলাই যোদ্ধাদের সংঘর্ষের ঘটনায় ডিএমপির শেরেবাংলা নগর থানায় চারটি ও ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলাগুলোতে মোট অজ্ঞাত আসামির সংখ্যা প্রায় ৯৮০ জন। শুক্রবার দিবাগত রাতে থানা পুলিশ বাদী হয়ে মামলাগুলো দায়ের করে। থানা সূত্র বলছে, একটি মামলা করা হয়েছে সংরক্ষিত এলাকায় জোরপূর্বক প্রবেশের অভিযোগে। বাকি মামলা তিনটি হয়েছে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও কন্ট্রোল রুম পোড়ানোর অভিযোগে। ধানমন্ডি থানা পুলিশ বাদী হয়ে করা মামলায় অজ্ঞাত ৭০ থেকে ৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ক্যশৈনু মারমা যুগান্তরকে বলেন, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট, সরকারি কাজে বাধা দান, সরকারি কর্মচারীকে আঘাত-এসব বিষয়ে একটি মামলা রুজু হয়েছে ধানমন্ডি থানায়। সেখানে অজ্ঞাত ৭০ থেকে ৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে। কোনো গ্রেফতার নেই। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান যুগান্তরকে বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের ছদ্মবেশে দুষ্কৃতকারীরা এই সহিংসতা ঘটিয়েছে কিনা তা তদন্ত করা হচ্ছে। সংসদ ভবন এলাকায় ঝামেলা হতে পারে এমন আগাম বার্তা পুলিশের কাছে ছিল না বলেও তিনি জানান।
