নিম্নমানের ছাপা ও মুদ্রণত্রুটি
প্রাথমিকের বই ছাপায় ১৯ প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম
শোকজ সাত মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে * এবার কোনো অনিয়মে ছাড় নেই -এনসিটিবির সচিব
Advertisement
হুমায়ুন কবির
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার কাজ ইতোমধ্যে ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছে। কিন্তু বিনামূল্যে বিতরণের এসব বই মুদ্রণে ব্যাপক অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে অন্তত ১৯ প্রতিষ্ঠান। নিম্নমানের ছাপা ও মুদ্রণত্রুটির কারণে সম্প্রতি এসব প্রতিষ্ঠানের অর্ধলাখ বই এবং চার লাখ বইয়ের ফর্মা বিনষ্ট করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। সাত মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে শোকজও করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কঠোর শাস্তি না হওয়ায় প্রতিবছরই এমন অনিয়ম হচ্ছে।
জানা গেছে, অস্পষ্ট ছাপা ও মুদ্রণের মারাত্মক ত্রুটির কারণে চার প্রতিষ্ঠানের বই নষ্ট করা হয়। এর মধ্যে সোনালী ওয়েব প্রিন্টার্সের ১ম ও ৩য় শ্রেণির ৮ হাজার ৮০০ বই, অক্সফোর্ড প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন দুই শ্রেণির ৩৭ হাজার ৪০০, রেদওয়ানিয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনের দুই শ্রেণির ৩ হাজার ৪৭৮ ও অনিন্দ্য প্রিন্টিং প্রেসের তৃতীয় শ্রেণির ১৫০ বই নষ্ট করা হয়েছে। এছাড়া মুদ্রণমান খারাপ হওয়ায় আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বই ও ফর্মা বিনষ্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে বর্ণমালা প্রেসের ২য় শ্রেণির ২২ হাজার ৭০০ ফর্মা, ন্যাশনাল প্রিন্টার্সের ১০ হাজার ১০০ ফর্মা, মেরাজ প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনের চতুর্থ শ্রেণির ৫০০ ফর্মা, রিফাত প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনের চতুর্থ শ্রেণির ৩৫ হাজার ফর্মা, ফাইভ স্টার প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনের দুই শ্রেণির ১৯ হাজার বই ও ফর্মা, সীমান্ত প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনের তৃতীয় শ্রেণির ১৪ হাজার বই ও ফর্মা, নূরুল ইসলাম প্রিন্টিং প্রেসের তৃতীয় শ্রেণির ৫ হাজার ফর্মা, সরকার প্রেসের ১ম শ্রেণির ৪৯ হাজার ফর্মা ও দ্বিতীয় শ্রেণির ৫৮৪টি বইয়ের ইনারের ১ম পৃষ্ঠা, শাফিন প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনের ২ হাজার ফর্মা ও বর্ণালি অফসেট প্রিন্টার্সের ৩২ হাজার ৩৯৫ হাজার পৃষ্ঠা বিনষ্ট করা হয়। সমতা প্রিন্টিং প্রেসের একটি ফর্মায় রেজিস্ট্রেশনসংক্রান্ত সমস্যা পাওয়া গেছে। একইভাবে মাস্টার সিমেক্স পেপার লি. ও প্রমা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সসহ বেশ কিছু প্রেসের বিরুদ্ধে এবারও নিম্নমানের বই দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে নিম্নমানের বই ছাপানোয় যে ৭ প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে সেগুলো হলো-অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস, সরকার প্রেস (দুইবার), নাহার প্রেস, মহানগর প্রেস, দশদিশা, রেজা প্রিন্টার্স (দুইবার) ও টাঙ্গাইল অফসেট প্রেস।
অভিযুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠান বিগত সময়েও শিক্ষার্থীদের নিম্নমানের বই দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রমা প্রিন্টার্সের মালিক এসএম মহসিন যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সত্য নয়।
এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক ড. রিয়াদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, প্রাথমিক স্তরের মোট বইয়ের প্রায় ৫০ শতাংশের বই প্রিন্ট হয়েছে। আর ৪০ শতাংশ বই বিতরণের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। আমরা বইয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কাজ করছি। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হয়েছে।
এদিকে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা উপকরণ পিডিআই কার্যক্রম পরিচালনার কাজ পেয়েছে ‘ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন (বিডি)’ এজেন্ট। গত ১৩ অক্টোবর অ্যারিস্টোক্রেট্স সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের নিম্নমানের ১৩ মেট্রিক টন কাগজ রিজেক্ট করে এই এজেন্ট। এ কারণে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম নজরুল ইসলাম ফোন করে এজেন্টকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। তিনি প্রতিকার চেয়ে এনসিটিবির কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে এনসিটিবির সচিব অধ্যাপক মো. সাহতাব উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, আমরা প্রতিদিন প্রেসে গিয়ে পরিদর্শন করছি। কোনো অসংগতি পেলে ব্যবস্থা নিচ্ছি। এবার কোনো অনিয়মের ছাড় নেই।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৮ কোটি ৪৯ লাখ ২৫ হাজার এবং মাধ্যমিক স্তরে ২১ কোটি ৪০ লাখ বই বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের বিতরণ করা হবে।
এদিকে গত ২১ সেপ্টেম্বর আগামী শিক্ষাবর্ষের নবম ও দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের বিষয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হলেও দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের কারণে অনুমোদন দেয়নি সরকার। পরে তা আরও যাচাই-বাছাই করার নির্দেশনা দেয় ক্রয় কমিটি। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে গত মঙ্গলবার মাধ্যমিক (বাংলা ও ইংরেজি ভার্সন) নবম শ্রেণি, দাখিল নবম শ্রেণি, এসএসসি ও দাখিল (ভোকেশনাল) নবম শ্রেণি এবং কারিগরি ট্রেড নবম ও দশম শ্রেণির বিনামূল্যের ৫ কোটি ৫৪ লাখ ৯০ হাজার ৮৬৯টি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের অনুমোদন দেয় সরকার। যদিও সেদিন সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে বইয়ের আলোচ্য বিষয়টি নথিভুক্ত করেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একটা বিশেষ মহলকে সুবিধা দিতে এই ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
