ইতালি যাওয়ার স্বপ্নভঙ্গ
লিবিয়ায় দালালদের জিম্মায় বরিশালের ৭০ যুবক
Advertisement
মো. আসাদুজ্জামান রিপন, গৌরনদী
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বরিশালের গৌরনদী ও আগৈলঝাড়ার বিভিন্ন গ্রামের ২ শতাধিক যুবক দালালদের মাধ্যমে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগরের পথে ভালোভাবে ইতালি পাড়ি দিয়েছেন। কিন্তু এবার ইতালি যাওয়ার পথে লিবিয়ার কোস্ট গার্ডের হাতে ধরা পড়েন ৩টি স্পিডবোটে থাকা গৌরনদীর ৬০, আগৈলঝাড়ার ১০ যুবকসহ ১০৮ বাংলাদেশি। এ মাসে কারাগার থেকে তারা মুক্তি পেলেও ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় এখন লিবিয়ায় বন্দি হয়ে পড়েছেন।
সরেজমিন স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গৌরনদী ও আগৈলঝাড়ার যুবকদের কাছে মানব পাচার চক্রের সদস্য খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ডুমুরিয়ার ইতালি প্রবাসী জাকির মোল্লার নাম বেশ পরিচিত। ইতালি পৌঁছানো অনেকের গল্পই অন্যদের এ দুঃসাহসিক যাত্রায় প্ররোচিত করে। এ স্বপ্নের টানে নতুন প্রজন্মও পা দিয়েছে সেই ভয়ংকর পথে। দালালচক্র প্রথমে যুবকদের ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরবে পাঠায়। সেখান থেকে ২/৩ দিন পর ট্যুরিস্ট ভিসায় মিসরে পাঠানো হয়। ২৫ বছরের নিচে যাদের বয়স, তাদের ট্যুরিস্ট ভিসায় শ্রীলংকা হয়ে মিসরে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ট্যুরিস্ট ভিসায় সরাসরি লিবিয়া। বিমানবন্দর থেকে প্রথমে তাদের রিসিভ করে, পরে গেম ঘরে নিয়ে নিরাপদে রাখা হয়। প্রত্যেককে অগ্রিম ৫ লাখ টাকা করে দিয়ে লিবিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করতে হয়। বাকি ১০ থেকে ১৩ লাখ টাকা দিতে হয় ‘ইতালির উদ্দেশ্যে বোট ছাড়ার (গেম দেওয়ার) ২/৩ দিন আগে।
লিবিয়ায় পৌঁছালে শুরু হয় একধরনের প্রস্তুতি, যা স্থানীয়ভাবে ‘গেম’ নামে পরিচিত। এ গেম মানেই ভূমধ্যসাগরে জীবন-মরণের খেলা। এর অংশ হিসাবে শারীরিক অনুশীলন, নৌচালনা, দিকনির্দেশক যন্ত্র ও ওয়াকিটকি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একেকটি স্পিডবোটে চালকসহ ৩২ থেকে ৩৮ জন করে যাত্রী থাকে। প্রতিটি বোটে ২/৩ জন অভিজ্ঞ চালকের কাছ থেকে ৭/৮ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। প্রায় ৭০ ঘণ্টার এই ভয়ংকর যাত্রায় খাবার বলতে খেজুর ও শুকনো বনরুটি আর অল্প পানি দেওয়া হয়। যাত্রীদের গায়ে থাকে টি-শার্ট বা গেঞ্জি এবং পরনে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। আর সবার গায়ে থাকে লাইফ জ্যাকেট, কোমরে প্যাম্পার্স। বোটের পানি সেচের জন্য ১০/১২টি গামলা দেওয়া হয়।
লিবিয়ায় বন্দি যুবকদের কয়েকজন অভিভাবক জানান, ঋণ, ধারদেনা ও জমি বিক্রি করে মানব পাচারকারী দালালচক্রের সদস্য গৌরনদীর ইতালি প্রবাসী জাকির মোল্লা, বগুড়ার ইতালি প্রবাসী সাজুর কাছে গৌরনদীর ৬০ যুবক এবং কুষ্টিয়ার লিটনের কাছে গৌরনদী ও আগৈলঝাড়ার ১০ যুবক ও অন্য ৩ দালালের কাছে আরও কয়েক জেলার ৩৮ যুবক বডি কন্ট্রাক্টে ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা করে দিয়ে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালির পথে পা বাড়িয়েছিলেন।
দালাল জাকির লিবিয়ায় ২/৩ সহযোগীর মাধ্যমে বেনগাজি থেকে ৮ সেপ্টেম্বর রাতে প্রথম বোটে গৌরনদীর ৩৮ যুবক এবং ২য় বোটে গৌরনদী ও আগৈলঝাড়ার ২২ যুবকসহ ৩২ বাংলাদেশিকে ভূমধ্যসাগর পথে ইতালির উদ্দেশে পাঠায়। ৩/৪ ঘণ্টা চলানোর পর ওই ২টি বোটের ৭০ বাংলাদেশিকে আটক করে লিবিয়ার কোস্ট গার্ড। অনেক খোঁজাখুঁজির পর ১৫ সেপ্টেম্বর জাকির মোল্লা স্বজনদের জানায়, ওই ২ বোটের ৭০ যুবকের সন্ধান গাম্বুদা কারাগারে মিলেছে।
অন্যদিকে ২২ সেপ্টেম্বর রাতে একই স্থান থেকে জাকিরসহ ৪ দালাল তৃতীয় বোটে গৌরনদী ও আগৈলঝাড়ার ১০ যুবকসহ ৩৮ বাংলাদেশিকে ভূমধ্যসাগর পথে ইতালির উদ্দেশে পাঠায়। ওই বোটও ১৭/১৮ ঘণ্টা চলার পর ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় লিবিয়া কোস্ট গার্ড আটক করে।
মা আমাদের বাঁচাও : ১০ অক্টোবর বন্দি লাদেন প্যাদা ও আকাশ একটি গোডাউনের কেয়ারটেকারের মাধ্যমে স্বজনদের কাছে একটি চিরকুট পাঠান। তাতে লেখা ছিল, ‘৩টি স্পিডবোট থেকে আমরা গৌরনদীর ৭০ জনসহ ১০৮ বাংলাদেশি আটক হয়েছি। আমরা বাংকিনা কারাগারের পাশে একটি গোডাউনে বন্দি আছি। এখানে দিনে একবার ৭০ গ্রাম খাবার দেওয়া হয়, পানির তীব্র সংকট। অর্ধহার ও অনাহারে আমাদের দিন কাটছে।’ তখন ইতালি প্রবাসী নোমান মাঝি তার শ্যালক খাঞ্জাপুর গ্রামের মেহেদী হাসানসহ ঘনিষ্ঠ ৩ আত্মীয়কে প্রায় ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত করতে সক্ষম হন।
মেহেদী মুক্ত হয়ে তার মা-বাবার সঙ্গে ইমুতে কথা বলার ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এ খবর পেয়ে ১৬ অক্টোবর গৌরনদীতে দালাল জাকির মোল্লার বাড়িতে জড়ো হন নিখোঁজ যুবকদের স্বজনরা। জাকিরের মা ও বোনকে গৃহবন্দি করে তারা দরজার সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। যুবকরা নিখোঁজের পর থেকেই জাকিরের বাবা, মামা ও স্ত্রী আত্মগোপনে ছিলেন।
জাকিরের মা নুরজাহান বেগম জানান, ইতঃপূর্বে আমার ছেলের পাঠানো ৭টি গেম ভালোভাবে ইতালি পৌঁছেছে। ৩ গেমের আটক ১০৮ জনের মধ্যে থেকে আমার ছেলে টাকা দিয়ে ৫৬ জনকে ছাড়িয়ে এনেছে। মুক্তি পেয়ে তারা পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে।
কিন্তু তার এই বক্তব্য ঘিরেই শুরু হয় সন্দেহ। কারণ, মুক্তিপণের নামে আগেই টাকা নেওয়া হয়েছিল। স্থানীয়দের ভাষায়, এই মুক্তিও একধরনের ব্যবসা। মৌখিক চুক্তি অনুযায়ী ইতালির শরণার্থী ক্যাম্প পর্যন্ত জাকির সবাইকে পৌঁছে দেবেন। কিন্তু মুক্তিপণের নামে তাদের কাছ থেকে ২ লাখ টাকাসহ ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা করে নিয়েছেন।
জাকির মোল্লা ফোনে বলেন, ৩টি স্পিডবোটে আটক গৌরনদীর ও আগৈলঝাড়ার ৭০ যুবকসহ ১০৮ বাংলাদেশিকে বাংকিনা কারাগার থেকে ছাড়ানো হয়েছে। আমার ৫৬ জনের মধ্যে যদি কেউ বাংলাদেশে অথবা ইতালি যেতে চায়, তাকে সেখানেই পাঠানো হবে। যতবার আটক হবে, ততবারই নিজের টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনব। এরপর গেম দিয়ে ইতালি পাঠাব। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকরা পত্রিকায় লিখে কাউকে কি বাংলাদেশে নিতে পারবেন বা ইতালি পাঠাতে পারবেন? এটা আমার ব্যবসা নয়। এলাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ পথে ইতালি যেতে চায় বলেই আমি তাদের পাঠাই।
বার্থী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আ. রাজ্জাক হাওলাদার বলেন, লিবিয়ায় অনেক যুবক আটক থাকার খবর আমরা পেয়েছি। কিন্তু পরিবারগুলো মামলা করতে ভয় পাচ্ছে। কারণ, মামলা করলে লিবিয়ায় দালালের তত্ত্বাবধানে থাকা আত্মীয়রা বিপদে পড়তে পারে। এ ভয়কেই কাজে লাগিয়ে বছরের পর বছর নিরাপদে চলছে মানব পাচারের এই ঘৃণ্য ব্যবসা।
গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইব্রাহিম বলেন, এ বিষয়টি আমার জানা নেই। কেউ অভিযোগও করেনি। খোঁজখবর নিয়ে মানব পাচারচক্রের দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
