উজাড় হচ্ছে কৃষিজমি
রাজশাহীতে অর্ধযুগেই কমেছে ৫ হাজার একর
Advertisement
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহী জেলার আয়তন দুই হাজার চারশ বর্গ কিলোমিটার। এখানে বসবাস করেন প্রায় ২৯ লাখ মানুষ। শস্য ভান্ডার খ্যাত রাজশাহীর রয়েছে দেশব্যাপী সুখ্যাতি। খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ এ জেলা নিজের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন কৃষিপণ্য দীর্ঘ সময় থেকেই দেশব্যাপী সরবরাহ করা হয়।
তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং বসতবাড়ি নির্মাণ ও ফসলি জমিতে অপরিকল্পিত পুকুর খননের কারণে চাষযোগ্য জমির ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে প্রতিবছরই কৃষিজমি উজাড় হচ্ছে। মাত্র অর্ধ যুগেই কমেছে পাঁচ হাজার একর কৃষি জমি। ফলে আগামীতে মারাত্মকভাবে খাদ্য উৎপাদন কমার আশঙ্কা রয়েছে।
জেলা পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য মতে, গত ছয় বছরে কৃষিজমির পরিমাণ কমেছে সবচেয়ে বেশি। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে রাজশাহীতে কৃষিজমি কমেছে প্রায় পাঁচ হাজার ২৮৯ একর। কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলে জমি কমে যাওয়াকে কৃষিবিদরা ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক হিসাবে বিবেচনা করছেন। তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে রাজশাহীতে মোট কৃষিজমির পরিমাণ ছিল চার লাখ ৩৯ হাজার ৭০৫ একর। পরের বছর ২০২১-এ তা কমে দাঁড়ায় চার লাখ ৩৮ হাজার ৯১০ একর। ২০২২ সালে এই পরিমাণ আরও কমে হয় চার লাখ ৩৬ হাজার ৭৬১ একর। ২০২৩ সালে নেমে আসে চার লাখ ৩৫ হাজার ২৯৮ একর। ২০২৪ সালে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৩৫ হাজার ১৯১ একর। চলতি বছর ২০২৫ সালে কৃষিজমির পরিমাণ আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪১৬ একরে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এভাবে কৃষিজমি কমতে থাকলে হুমকির মুখে পড়তে পারে রাজশাহীর কৃষি ও অর্থনীতি। বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘গত কয়েক বছরে রাজশাহীর তিন ফসলি জমিতে প্রচুর পরিমাণে পুকুর খনন করা হয়েছে। কৃষি জমি রক্ষায় ধর্তব্য আইন বলে একটি আইন আছে, যেটিতে পুলিশ কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই খননকারীদের গ্রেফতার করতে পারে। কিন্তু পুলিশ সেটি করে না, তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অপেক্ষায় থাকে।’ তিনি বলেন, ‘বাসস্থান তৈরির জন্য প্রতিনিয়ত আমাদের কৃষিজমি কমছে। সবাইকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে একটি বাড়িতেই বহুতল ভবন নির্মাণ করার। এছাড়াও ইটভাটায় বিলের জমি (টপ সয়েল) নষ্ট না করে আমাদের পাশ্বর্বর্তী নদী থেকে বালু উত্তোলন করে তা দিয়ে ইট বানানো যেতে পারে। এভাবে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণেই কৃষিজমি রক্ষা পাবে বলে মনে করি।’
রাজশাহীর কৃষকরা বলছেন, আবাসিক প্রকল্প, রাস্তা নির্মাণ এবং কাঠামোগত উন্নয়নের কারণে ফসলি জমি ধীরে ধীরে কমছে। জমি কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, পাশাপাশি ফসল ফলানোর উপযোগী জমিও সংকুচিত হচ্ছে। প্রান্তিক পর্যায়ের পরিস্থিতি ভয়াবহ। এক শ্রেণির অসাধু মানুষ প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে পুকুর খনন করছে। গত এক যুগে পুকুর খননের কারণে রাজশাহীর কৃষি জমি মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
জেলার পবা উপজেলার বসন্তপুর এলাকার কৃষক আব্দুল হাদি বলেন, ‘মাত্র দুই দশক আগেও দিগন্ত জোড়া কৃষিজমি চোখে পড়ত। এখন সে অবস্থা নেই। রাস্তাঘাট, আবাসন, বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে প্রতিনিয়ত। এছাড়াও পবাতে কৃষিজমি নষ্ট করে যে পরিমাণ পুকুর খনন করা হয়েছে, তাতেও প্রচুর পরিমাণ আবাদি জমি নষ্ট হয়েছে।’
দুর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, ‘আগে সড়কের দুদিকে শুধু কৃষিজমি দেখা যেত। জমি অধিগ্রহণ করে রাস্তা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এছাড়া সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ছোট ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি। এর মধ্যে তিন ফসলি জমিও রয়েছে।’ কৃষিজমি রক্ষায় আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই জানিয়ে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আবাসন-নির্মাণ, পুকুর খনন ও ইটভাটা স্থাপনের কারণে রাজশাহীতে আবাদি জমি কমছে। এছাড়াও অপরিকল্পিত নগরায়ণও অন্যতম কারণ। আইনের সঠিক প্রয়োগ ও প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এই প্রবণতা থামানো কঠিন হবে। কৃষিজমি কমতে থাকলে ভবিষ্যতে বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’
