সমন্বিত ইউনিয়ন ভূমি অফিস নির্মাণ
হাজার কোটির প্রকল্পে লুটপাটের শঙ্কা
Advertisement
হামিদ-উজ-জামান
প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে সমন্বিত ইউনিয়ন ভূমি অফিস নির্মাণ প্রকল্পে লুটপাটের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কেননা প্রকল্প প্রস্তাবেই প্রায় ৩০ খাতে অতিরিক্ত অথবা অপ্রয়োজনীয় খরচ ধরা হয়েছে বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ‘সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ’ শীর্ষক এ প্রকল্পটি নিয়ে আজ রোববার অনুষ্ঠিত হবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। এতে সভাপতিত্ব করবেন কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান। সভায় এসব খাতের বাড়তি খরচের প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ যুগান্তরকে বলেন, প্রকল্প প্রস্তাবে দেখা যায় প্রতিটি উপজেলা ভূমি অফিস নির্মাণে প্রতি বর্গফুটের খরচ ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার টাকা করে। কিন্তু সাধারণত উপজেলা পর্যায়ে এত বেশি ব্যয় হওয়ার কথা নয়। আবার সব উপজেলায় একই রকম খরচ হওয়ারও কথা নয়। অথচ প্রকল্পে তাই প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বেশি ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং একই ধরনের জিনিসপত্রের জন্য ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় অর্থের সংস্থান রাখায় দুর্নীতি ও লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রক্রিয়াকরণ শেষে অনুমোদন পেলে আগামী বছর থেকে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬১ জেলার ১৫০টি উপজেলায় ভূমি অফিস নির্মাণ করা হবে। সমতল এলাকায় ৫ তলা ভিতের ওপর একটি ৪ তলা ভবন তৈরি করা হবে। প্রতিটি ফ্লোর হবে তিন হাজার ৬৫০ ফুট। এছাড়া সীমানা প্রাচীর, ভূমি উন্নয়ন, ড্রেইনেজ, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, ফার্নিচার এবং সাইকেল শেডসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। হাওর এলাকার জন্য ৬ তলা ভিত্তিবিশিষ্ট একটি ৫ তলা ভবন তৈরি করা হবে। এর প্রতিটি ভবন হবে তিন হাজার ৬৫০ বর্গফুট। পাশাপাশি অন্যান্য কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন হবে। পাশাপাশি রেকর্ডপত্র সংরক্ষণ এবং সেবা প্রার্থীদের জন্য উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং বাস্তবায়ন করবে এলজিইডি।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়ন তো অনেক পরে বরং প্রকল্প তৈরির সময়ই বাড়ানো হয়েছে ব্যয়। যেমন প্রথম দিকে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে যে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) দেওয়া হয়েছিল সেখানে প্রতিটি উপজেলা ভূমি অফিসের নির্মাণ ব্যয় ছিল ৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা। কিন্তু পরে পুনর্গঠিত ডিপিপিতে বর্তমানে একই ভবন নির্মাণে প্রতিটির জন্য ৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে ১৫০টির প্রতিটিতে ৪৩ লাখ করে মোট ৬৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বেশি ধরা হয়েছে। এই ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে পিইসি সভায়। এছাড়া পরামর্শক খাতে ধরা হয়েছে ৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এ খাতের ব্যয়ের বিষয়েও জানতে চাওয়া হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অংশে দুটি মোটরসাইকেল কেনার জন্য ধরা হয়েছে চার লাখ টাকা, তিনটি এয়ারকুলার কেনার জন্য ছয় লাখ টাকা এবং দুটি ল্যাপটপের জন্য চার লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এছাড়া ডেক্সটপ দুটির জন্য পাঁচ লাখ, পাঁচটি প্রিন্টার তিন লাখ এবং দুটি স্ক্যানার এক লাখ, একটি ফটোকপিয়ারের জন্য পাঁচ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, এসব খাতে অত্যধিক ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। আরও জানা গেছে, রাজস্ব খাতে প্রচার ও বিজ্ঞাপন খাতে তিন লাখ, অনুলিপির জন্য তিন লাখ, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা এলজিইডির অংশে রাজস্ব খাতের প্রচার ও বিজ্ঞাপনের জন্য পাঁচ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এছাড়া অনুলিপি ব্যয় ১০ লাখ, জেলা পর্যায়ে বিজ্ঞাপন ও প্রচারে এক কোটি ২০ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। কিন্তু এগুলোর আদৌ প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হবে পিইসি সভায়।
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান শনিবার যুগান্তরকে বলেন, যেসব খাতে বাড়তি বা অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে অবশ্যই সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। কোনোক্রমেই যাতে অপ্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করা না হয় সেদিকে আমরা খেয়াল রাখব। পিইসি সভায় প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন করা হবে এবং বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।
প্রকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এলজিইডি অংশে বাড়িভাড়া ভাতার জন্য ৭০ লাখ, অভ্যন্তরীর্ণ ভ্রমণে ৯০ লাখ, কুরিয়ারের জন্য ১০ লাখ, বিদ্যুৎ বিল ২১ লাখ এবং মুদ্রণ ও বাঁধাই ১৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এছাড়া সিল ও স্টাম্প খাতে ২৮ লাখ ও অন্যান্য মনিহারির জন্য ৩২ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এসব খাতের ব্যয়ও বেশি ধরা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে আনুপাতিক হারে কমানোর কথা বলা হবে সভায়। আরও দেখা যায়, এলজিইডি অংশে অনাবাসিক ভবন ভাড়ার জন্য ৪২ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। কিন্তু এর পরও মোটর যানবাহন-আসবাবপত্র এবং অনাবাসিক ভবন মেরামত-সংরক্ষণ ও পুনর্বাসনের জন্য ৫০ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, ভবন ভাড়া নেওয়ার পরও মেরামত খাতে অর্থ বরাদ্দ রাখার অযৌক্তিক। প্রকল্প প্রস্তাবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অংশে প্রকল্প পরিচালক ও উপপ্রকল্প পরিচালকের জন্য দুটি জিপ ভাড়া বাবদ দুই কোটি ৪৬ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্প পরিচালকের জন্য জিপের ব্যবস্থা হলে উপপ্রকল্প পরিচালকের জন্য জিপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে পিইসি সভায়। পাশাপাশি এলজিইডি অংশে নির্বাহী প্রকৌশলীর জন্য একটি জিপ এবং সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীর জন্য একটি মাইক্রোবাস ভাড়ার জন্য দুই কোটি ছয় লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে সিনিয়র সহকারী নীতিমালা অনুযায়ী মাইক্রো বাস পাবেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে।
আরও জানা যায়, ভূমি মন্ত্রণালয় ও এলজিইডির জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একই অঙ্গ ভিন্ন ভিন্ন অংশে উল্লেখ করে অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে। যেমন মুদ্রণ ও বাঁধাই, স্টেশনারি, সিল ও স্ট্যাম্প, অন্যান্য মনিহারি এবং অনুলিপি ব্যয় একই নামে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ধরা হয়েছে। বাস্তবতার নিরিখে এসব খাতে ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা ও আলাদাভাবে দেখানোর যৌক্তিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হবে।
