শপথ নিলেন নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা মঙ্গলবার শপথ নিয়েছেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট, জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন জোট, স্বতন্ত্রসহ নির্বাচিত সব সদস্য সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ নিয়েছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন তাদের শপথবাক্য পাঠ করান। তবে জামায়াত-এনসিপি জোটের সংসদ-সদস্যরা এরপর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নিলেও বিএনপি জোট ও স্বতন্ত্র সদস্যরা এই শপথ নেননি।
এদিকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। দলের নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের বৈঠকে তাকে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করা হয়। বেলা সাড়ে ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের নবম তলায় অবস্থিত সরকারি দলের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সংসদীয় দলের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে বেলা পৌনে ১১টার দিকে বিএনপির সংসদ-সদস্যরা শপথ নেন। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা। পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রথমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি, এরপর ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াতসহ তাদের জোট ও স্বতন্ত্র এবং সবশেষে নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ-সদস্যরা শপথ নেন। শপথ শেষে সংসদ-সদস্যরা শপথপত্রে স্বাক্ষর করেন।
শপথের পর সংসদীয় দলের প্রথম সভা শেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, এটা একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত যে, ফ্যাসিস্ট সরকারের দীর্ঘ নির্যাতন-নিপীড়ন, গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেওয়া, সংসদকে অকার্যকর করার পর জনগণের অনেক রক্তের বিনিময়ে একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা একটি সংসদ পেয়েছি। এই সংসদের মধ্য দিয়ে আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে আমাদের তরুণ নেতা তারেক রহমানকে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করেছি। আমরা আশাবাদী, তার নেতৃত্বে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রীসহ নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এ শপথের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চতুর্থবার সরকার গঠন করে। তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় একজন ক্ষমতায় এলেন। তার বাবা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ছিলেন দেশের রাষ্ট্রপতি এবং মা খালেদা জিয়া ছিলেন তিনবারের ও দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
চারদলীয় জোটের প্রধান হিসাবে বিএনপি সর্বশেষ ২০০১ সালে সরকার গঠন করে। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ওই সরকারের মেয়াদ শেষ হয় ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর। এর আগে তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পরও স্বল্পসময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন খালেদা জিয়া। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সেনাবাহিনীর একদল সদস্যের হাতে নিহত হন।
এবারের নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের আনুষ্ঠানিক ফলে বিএনপি ২০৯টি আসন এবং তার মিত্ররা পেয়েছে ৩টি আসন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিজয়ী হয়েছে ৬৮টি আসনে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি এবং অন্য শরিকরা আরও ৩টি আসন পেয়েছে। এর বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ৭টি আসনে।
এর আগে সংসদ ভবনের নিচতলায় শপথ অনুষ্ঠানের শুরুতে দলীয় সদস্যদের সামনে কথা বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের কথা জানান। বিএনপি জোটের নতুন সংসদ-সদস্যদের মধ্যে সামনের সারিতে ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে তারেক রহমানের স্ত্রী জোবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
শপথগ্রহণের আগে দলীয় সংসদ-সদস্যদের বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাদা ও নীল রঙের দুটি ফরম হাতে নিয়ে বলেন, আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হইনি এবং সংবিধানে এখনো এটা ধারণ করা হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে। এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যকে কে শপথ পড়াবেন, সেটার বিধান করতে হবে। এমন ফরম সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে আসবে। সেগুলো সাংবিধানিকভাবে সংসদে গৃহীত হওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করা যাবে। আমরা সংবিধান মেনে এ পর্যন্ত চলেছি। আশা করি, সামনের দিনেও চলব। এরপর তিনি দলীয় সদস্যদের উদ্দেশে আরও বলেন, আমি মাননীয় চেয়ারম্যানের নির্দেশে ওনার উপস্থিতিতে আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত জানালাম।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের প্রস্তাব করা হয়নি, আমরাও শপথ নিইনি-সালাহউদ্দিন : শপথ শেষে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণে প্রস্তাব করা হয়নি বিধায় বিএনপির সংসদ-সদস্যরা এ বিষয়ে শপথ গ্রহণ করেননি বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জনগণের যে ইচ্ছা এবং গণভোটের যে রায়, সেটার প্রতিফলন ঘটাতে গেলে আগে সংসদে যেতে হবে এবং সংসদে প্রয়োজনীয় আইন ও সংবিধান সংশোধন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের ২(ক)তে যা বলা আছে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার যদি শপথ পাঠ করাতে না পারেন বা অপারগতা প্রকাশ করেন অথবা পাওয়া না যায়, তাদের মনোনীত প্রতিনিধি যদি তা না করেন, তাহলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংসদ-সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন। সেই বিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে আমাদের শপথ পাঠ করিয়েছেন। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে (শপথ গ্রহণের) কোনো বিধান সংবিধানে নেই এবং (সিইসি) ওনারও শপথ পাঠ করানোর এখতিয়ার নাই। সেই বিবেচনায় শপথ পাঠ করানোর জন্য তিনি আমাদের প্রস্তাবও দেননি। আমরাও শপথ গ্রহণ করিনি। তিনি সাংবিধানিকভাবে সবকিছু পরিচালিত হওয়া দরকার উল্লেখ করে বলেন, আমরা যে এই পর্যন্ত এসেছি, সাংবিধানিক পদ্ধতি মেনেই এসেছি। আগামী দিনেও এই রাষ্ট্রকে আমরা সাংবিধানিকভাবে পরিচালনা করতে চাই।
বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমাদের দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করেছি এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি পাঠিয়েছি, যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসাবে তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সরকার গঠন করার সুযোগ দেন। তিনি জানান, যারা শপথ গ্রহণ করেছেন, সবাই উপস্থিত ছিলেন এবং সবাই দস্তখত করেছেন। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমাদের নেতা তারেক রহমান আমাদের উদ্দেশে দুটি অনুশাসন দিয়েছেন। কোনো সংসদ-সদস্য ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি নেবেন না। দ্বিতীয়ত, সরকারি কোনো প্লট সংসদ-সদস্য হিসাবে গ্রহণ করবেন না। এর মধ্য দিয়ে পরিবর্তন শুরু হলো।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসাবে যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে একটি ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে, আমরা তা অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
দুটি শপথই নেন জামায়াতের সংসদ-সদস্যরা : জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ও স্বতন্ত্র সংসদ-সদস্যরা দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে জাতীয় সংসদ ভবনে শপথ নেন। সংসদ সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়ার পরপরই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে দ্বিতীয় ধাপে শপথ নেন দলটির সদস্যরা। তবে দ্বিতীয় শপথের আগে স্বতন্ত্র সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ও বিএনপির ইশরাক হোসেন সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। এর আগে বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে তারা শপথ নেননি। এ কারণে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শপথ নিয়েও অনিশ্চয়তা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়। দুপুর ১২টায় শপথ নেওয়ার কথা থাকলেও জোটের শীর্ষ নেতারা বৈঠকে বসায় কিছুটা বিলম্ব হয়। জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান, নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরসহ ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে তারা শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
শপথ নেন এনসিপির ছয় সদস্য : নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছয়জন নির্বাচিত সদস্য শপথ নেন। দুপুর ১টা ২০ মিনিটের দিকে সংসদ ভবনে তাদের শপথ পাঠ করান সিইসি। সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবেও শপথ নেন এনসিপির নবনির্বাচিতরা।
দেরিতে আসায় ১১ দলীয় জোট ও স্বতন্ত্র সংসদ-সদস্যদের সঙ্গে শপথ নেন ইশরাক : জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ও স্বতন্ত্র সংসদ-সদস্যদের সঙ্গে শপথ নেন ঢাকা-৬ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ-সদস্য ইশরাক হোসেন। যথাসময়ে সংসদ ভবনে উপস্থিত না হতে পারায় তিনি তাদের সঙ্গে শপথ নেন। তবে ইশরাক হোসেন সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথে অংশ নেননি।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি রুমিন ফারহানা : জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে শপথ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় ধাপে শপথ গ্রহণ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়ার সময় তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে যান।
সেই ‘১০ নম্বর জার্সি’ পরেই শপথ নিলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোয় হাসনাত আব্দুল্লাহর পরনের ‘১০ নম্বর জার্সি’ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এবার সেই একই জার্সি পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসাবে শপথ নিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের এই মুখ্য সংগঠক। এবারের নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ আসনে জয়ী হন হাসনাত আব্দুল্লাহ। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের সমর্থনে এনসিপির দলীয় প্রতীক শাপলা কলি নিয়ে নির্বাচন করেন তিনি। তার বটল-গ্রিন রঙের আলোচিত জার্সিটির সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো রয়েছে। ইংরেজিতে লেখা আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিভাগের নাম ‘ইংলিশ’। জার্সির পেছনে ইংরেজিতে তার নাম (হাসনাত) লেখা। জার্সি নম্বর ১০।
