Logo
Logo
×
   

Advertisement

নগর-মহানগর

দুধের রাজধানীতে সক্রিয় অসাধুরা

ভেজাল দুধ, ছানা ও ঘির রমরমা ব্যবসা

পাম অয়েল, পশুর চর্বি ও কৃত্রিম ফ্লেভার দিয়ে তৈরি হচ্ছে ঘি * দীর্ঘসময় সতেজ রাখতে ফর্মালিনে চুবানো হচ্ছে ছানা * নামকরা সব কোম্পানির মোড়কে খাঁটি ঘি বলে বাজারজাত

Advertisement

Icon

আখতারুজ্জামান আখতার, পাবনা

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ভেজাল দুধ, ছানা ও ঘির রমরমা ব্যবসা

পাবনার সুজানগরে জব্দ করা নকল ঘি -যুগান্তর

Advertisement

ঈদ ঘিরে পাবনার প্রধান দুধ উৎপাদনের এলাকাগুলোতে ভেজালকারীরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ঈদের মতোই উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে তাদের ভেজাল দুধ, ছানা ও ঘিয়ের রমরমা ব্যবসা। জেলার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর এবং ভাঙ্গুড়াকে বলা হয় দুধের রাজধানী। সাম্প্রতিকালে চাটমোহর ও সুজানগরেও অনেক দুগ্ধ খামার গড়ে ওঠায় সেখানেও জমে উঠেছে ভেজাল ঘি, ছানার ব্যবসা। তবে ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও ফরিদপুর উপজেলায় ভেজালের কারবার চলে সবচেয়ে বেশি। নামিদামি প্রতিষ্ঠানের মোড়কে খাঁটি গাওয়া ঘি বলে সারা দেশে বাজারজাত হচ্ছে। আবার নামিদামি বিভিন্ন দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী কোম্পানির সিলিং সেন্টারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মীদের যোগসাজশে ভেজাল দুধের ব্যবসা চলছে মহাসমারোহে। এই ভেজালের ব্যবসা এতই লাভজনক যে, এসব এলাকায় সামান্য কিছুদিন আগের ছানা ঘির কারখানার শ্রমিকও এখন কোটিপতি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, স্বাধীনতার পর ৩ যুগে বৃহত্তর পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া এবং পার্শ্ববর্তী শাহজাদপুরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং বাণিজ্যিকভাবে ওঠে ডেইরি ফার্ম বা দুগ্ধ উৎপাদন খামার। এখন এসব এলাকা দেশের অন্যতম প্রধান দুগ্ধ উৎপাদনকারী এলাকা হিসাবে পরিচিত। জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, পাবনা জেলায় সাড়ে ৯ হাজারের বেশি খামারিসহ ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেকে গাভি লালনপালন করে থাকেন। জেলায় বছরে ৩ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন দুধ উৎপাদিত হয়। উৎপাদিত দুধ জেলার বার্ষিক চাহিদা মিটিয়ে ৭৪ হাজার মেট্রিক টন উদ্বৃত্ত থাকে। সূত্র জানায়, উৎপাদিত দুধের ৭০ থেকে ৮৫ ভাগ লিটার দুধ প্রাণ, মিল্কভিটা, আফতাব, আকিজ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান তাদের চিলিং সেন্টারের মাধ্যমে কিনে নেয়। এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয় ঘোষরা প্রতিদিন এক থেকে ২ লাখ লিটার দুধ কিনে থাকে। বাদবাকি দুধ খুচরা বেচাকেনা হয়।

কারা তৈরি করেন এসব ভেজাল সামগ্রী : অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেড়া উপজেলার সালিখা, করমজা, পৌর সদর, নাকালিয়া, সাঁথিয়ার সেলন্দা, বোয়ারমারী, গাগরাখালী, সোনাতলা, ধুলাউড়ি, নাকডেমরা, তেথুলিয়া, ভাঙ্গুড়ার ভবানীপুর, বেতুয়ান, দিলপাশার, খানমরিচ, অষ্টমনিষা, ফরিদপুরের ডেমরা, ফরিদপুর সদর, বিএলবাড়ী, পুঙ্গলী, গোপালনগর, সুজানগর উপজেলার আহম্মদপুর, চিনাখড়া, পৌর সদর এলাকায় বেশি পরিমাণ দুগ্ধ উৎপাদন হয়ে থাকে। এসব এলাকার একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী আসলের পাশাপাশি ভেজাল দুধ, ছানা ও ঘির ব্যবসায় শুরু করে। ভাঙ্গুড়ার সারুটিয়া অপদা বাঁধ, উত্তর মেলন্দা, কৈডাঙ্গা, ভবানীপুর, উপজেলা রেললাইন, কলকতি এলাকায় অবাধে ভেজাল দুধ উৎপাদন হচ্ছে। চাটমোহর উপজেলার ছাইকোলা ইউনিয়নের লাঙ্গলমোড়া গ্রামসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এই ভেজাল কারবার চলছে। ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া, বেড়া, চাটমোহরসহ এসব দুগ্ধ উৎপাদনসমৃদ্ধ এলাকার প্রভাবশালী ভেজাল দুধ সিন্ডিকেটের কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে।

তাদের মধ্যে রয়েছে সোহাগ, হাফিজ, নয়ন ও ফারুক, সাখাওয়াত, সঞ্জয় ঘোষ, লাল ঘোষ, রবি ঘোষ, পরি ঘোষ, কালা ঘোষ, কুদ্দুস, সুমন, বৈদ্য নাথ, বাবু রাম, মাসুদ, সিদ্দিক, শামিমসহ অনেক ঘোষ ভেজাল দুধ, ছানা ও ঘি তৈরির সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। এদের সঙ্গে স্থানীয় দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের চিলিং সেন্টারের (সংগ্রহকেন্দ্র) কর্মকর্তা বা কর্মীদের যোগসাজশ রয়েছে। সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালত চাটমোহর উপজেলার ছাইকোলা ইউনিয়নের লাঙ্গলমোড়া গ্রামে ও ছাইকোলা চৌরাস্তায় প্রাণের হাব সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ভেজালে জড়িত থাকায় প্রাণের গুরুদাসপুর অঞ্চলের এরিয়া ম্যানেজার শামসুল আলম (৩৬), জহির রায়হান (২৭) ও নাজমুল হোসাইনকে (৩৫) ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন।

কী দিয়ে তৈরি হয় ভেজাল ছানা ও ঘি : সরেজমিন পরিদর্শন ও তথ্য সংগ্রহ করে জানা গেছে, ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা-বাঘাবাড়ীর ডেমরাতে ছানাপল্লী গড়ে উঠেছে। নতুন ও পুরোনো মিলে সেখানে প্রায় ৫০টি কারখানা রয়েছে। কোনো কারখানায়ই স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নেই। ডোবা বা নদীর নোংরা পানি দিয়েই সব কাজ সম্পন্ন করা হয়। ঘি তৈরির গাদ থেকে আবার ঘি তৈরি, ভেজাল দুধ তৈরিসহ বিভিন্ন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ছানা তৈরি করায় বিভিন্ন সময়ে বেশ কটি কারখানা ফরিদপুর উপজেলা প্রশাসন বন্ধ করে দেয়। ছানা তৈরিতে ময়দা, গোল আলু আর তা দীর্ঘ সময় ধরে সতেজ রাখতে ছানার বস্তাগুলো ফরমালিনের দ্রবণে চুবানো হয় আর ঘি তৈরিতে সয়াবিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিকের ব্যবহার চলে।

প্রতারণার কাজ ছেড়ে দেওয়া ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাঁথিয়ার এক কারিগর (কথিত কেমিস্ট) জানান, ভেজাল ঘি তৈরিতে ২৫ শতাংশ খাঁটি ঘিয়ের সঙ্গে সয়াবিন, পাম অয়েল, ডালডা, পশুর চর্বি, ভেজিটেবল ফ্যাট, আলুর পেস্ট, রাসায়নিক দ্রব্য, রং ও ফ্লেভার ব্লেন্ড করে ব্যবহার করা হয়। রমজান ও দুই ঈদকে সামনে রেখে এ ভেজাল ব্যবসা জমজমাট হয়ে ওঠে বলেও তিনি জানান।

স্থানীয় গণমাধ্যম সূত্র জানায়, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুরে ছোট ছোট ঘরে গড়ে তোলা গোপন এসব কারখানায় তৈরি হচ্ছে ভেজাল দুধ। ননী বা ফ্যাট তুলে নেওয়া পাতলা দুধ ও পানির সঙ্গে সয়াবিন তেল, গ্লুকোজ, স্যাকারিন, ইউরিয়া, ডিটারজেন্ট পাউডার, কস্টিক সোডা ও রাসায়নিক জেলি মিশিয়ে তৈরি করা হয় ‘পাবনার’ দুধ নামের তরল পদার্থ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কারবারি জানান, ফ্যাটহীন ৪০ লিটার দুধে মাত্র ৪৫০ টাকার রাসায়নিক মিশিয়ে ‘উচ্চ ফ্যাটযুক্ত’ ভেজাল দুধ তৈরি করা হয়। যা বিক্রি করে বাড়তি আয় হয়। এই দুধ বিভিন্ন নামিদামি কোম্পানির চিলিং সেন্টারে সরবরাহ করা হয়। শুধু ভাঙ্গুড়াতেই ২৭টি নামিদামি কোম্পানির চিলিং সেন্টারসহ অর্ধশতাধিক দুগ্ধ কেন্দ্র রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কারবারি আরও জানান, প্রতি ৪০ লিটার নকল দুধ চিলিং সেন্টারে নেওয়ার জন্য কর্তব্যরত কর্মকর্তাকে ৫০০ টাকা ঘুস দিতে হয়। ঘুস দিলেই মান নিয়ন্ত্রণের কোনো সমস্যা হয় না। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. ইফতেখার মাহমুদ বলেন, এসবের কোনো পুষ্টিগুণ নেই। এছাড়া এ ধরনের ভেজাল ঘি এবং ভেজাল ছানা বা ভেজাল ছানা দিয়ে তৈরি মিষ্টি ও খাবার খেলে দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া, লিভার, কিডনির জটিল রোগ এমনকি দীর্ঘদিন খেলে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে।

ভেজালকারীরা কোটিপতি : স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভেজাল ছানা ও ঘি তৈরি বা ব্যবসা করে একসময়ের দিনমজুর বা ফড়িয়ারা ৫-৬ বছর ভেজাল ব্যবসা করে এখন কোটিপতি। এদের অনেকেই নিজস্ব পিকআপ ভ্যানে বিভিন্ন জেলায় ছানা ও ঘি পাঠায়। অন্যরা প্রতিরাতে কোচে করে ছানা-ঘি পাঠায়। উৎপাদিত এসব ছানা ও ঘি পাবনার বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হয়। এসব এলাকার ছানা পল্লি থেকে ভেজাল খাঁটি মিলিয়ে প্রতিদিন ২ হাজার থেকে ৩ হাজার কেজি ঘি ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে যায়। স্থানীয়রা জানান, সাঁথিয়ার সেলন্দা বাজার এলাকার একজন দুধ ব্যবসায়ী অবৈধভাবে ভেজাল দুধ, ঘি তৈরি ও ব্যবসা করে শূন্য থেকে এখন তিনি কোটিপতি।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. জহুরুল ইসলাম ভেজালের কথা স্বীকার করে বলেন, খামারিরা এই ভেজাল প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত নয়। মধ্যস্বত্বভোগীরা এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। আমাদের জনবল সীমিত। তারপরও প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের ভেজালবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক অভিযানে অনেককে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। কিন্তু ভেজালকারীরা অভিযানের পরই আবার আগের ব্যবসায় ফিরে যাচ্ছেন। এ নিয়ে আমরাও মুশকিলে আছি।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম