৪৭ লাখ মামলা আদালতে
অপেক্ষার শেষ নেই বিচারপ্রার্থীদের
Advertisement
আলমগীর মিয়া
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলায় ২০১৭ সালে হাইকোর্টের রায়ে ১৫ আসামির মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল এবং ১১ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন আসামিরা। ৯ বছর ধরে সেই আবেদন আপিল বিভাগে ঝুলছে। এমন বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ও দুর্নীতির মামলার বিচার শেষ হয়েও হচ্ছে না। বছরের পর বছর পড়ে আছে। বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষার শেষ নেই।
সুপ্রিমকোর্টের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী ২০১৬ সালে দেশের আদালতগুলোতে (সুপ্রিমকোর্টসহ) মামলার সংখ্যা ছিল ৩২ লাখ। বর্তমানে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ লাখের কাছাকাছি। অর্থাৎ ১০ বছরে মামলা বেড়েছে ১৫ লাখ। দেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের জন্য বিচারকের সংখ্যা মাত্র ২ হাজার ৩০৭। এ হিসাবে প্রত্যেক বিচারকের কাঁধে গড়ে দুই হাজারের বেশি মামলা জমে আছে। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে মাত্র ৫ জন বিচারপতি ৪০ হাজার মামলার দায়িত্বে আছেন।
বিচার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত অসংখ্য মামলা ঝুলছে। প্রতিদিন যত মামলা ফাইল হচ্ছে, সেগুলো মাসে কিংবা বছরেও নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এর জন্য দায়ী আমাদের বিচারব্যবস্থা এবং জনসচেতনতার অভাব। তাছাড়া, এর আরেকটি বড় কারণ হলো বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর সম্পর্কে ধারণা না থাকা। বিভিন্ন আইনে বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির কথা বলা আছে, কিন্তু এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। তারা মনে করেন, মামলাজট নিরসনে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতি অনুসরণ করলে সুফল পাওয়া যাবে। উভয়পক্ষকে যদি বোঝানো যায়, মামলা করলে ১০ বছর ক্ষতি হয়ে যাবে, সেক্ষেত্রে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিতে এগিয়ে এলে দু’পক্ষই লাভবান হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেওয়ানি মামলার নিষ্পত্তি দুই পক্ষের সম্মতিতে সহজ; কিন্তু ফৌজদারি মামলা তত সহজ নয়। স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ দায়িত্বে তাদের কাজগুলো সারলে আদালতের ওপর চাপ কমবে, তেমনি জনগণও ওইসব প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখতে পারবে। সুপ্রিমকোর্ট সূত্র জানায়, হাইকোর্ট বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় থাকা মামলার বিচার নানা জটিলতার কারণে শেষ করা যাচ্ছে না। এতে বিচারপ্রার্থী ও আসামিপক্ষের হয়রানি বাড়ছে। মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণ হচ্ছে-উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ, দেরিতে তদন্ত রিপোর্ট দেওয়া ও সাক্ষী হাজির না হওয়া। এভাবে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা।
সুপ্রিমকোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মামলা নিষ্পত্তি বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।
সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পী যুগান্তরকে বলেন, ‘মামলাজট বর্তমান বিচারব্যবস্থায় একটি বড় সমস্যা। এ থেকে মুক্তি পেতে হলে বিচার-সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। এছাড়া বিচারব্যবস্থায় কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনতে আইনের সংস্কার হওয়া দরকার। দীর্ঘদিন যাবৎ একই বৃত্তের মধ্যে আমরা ঘুরছি।’
সব আদালতে বিচারাধীন মামলা : সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সারা দেশের আদালতে বিচারাধীন রয়েছে ৪৬ লাখ ৯৯ হাজার ৭৯৬টি মামলা। এর মধ্যে তদন্তাধীন মামলা ২ লাখ ৪৫ হাজার ৮৮৮টি। অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ৪০ লাখ ২২ হাজার ৪৯৭ মামলা। সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ৬ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮২। আপিল বিভাগে ৩৯ হাজার ৪১৭। আপিল বিভাগে থাকা মামলার মধ্যে দেওয়ানি ২২ হাজার ৪৫১, ফৌজদারি ১৬ হাজার ৭১৮ এবং আদালত অবমাননা-সংক্রান্ত ২৪৮টি। হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলার মধ্যে দেওয়ানি ১ লাখ ৩২৬, ফৌজদারি ৩ লাখ ৯২ হাজার ৬৪ এবং রিট ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫২৯টি।
শুনানির অপেক্ষায় যেসব চাঞ্চল্যকর মামলা : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ৫ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে হাইকোর্ট ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ রায় ঘোষণা করেন। এরপর মামলাটি চূড়ান্ত বিচারের জন্য আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় আছে।
ফেনীর আলোচিত সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলাটি হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য রয়েছে। বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি ও আসামি মোহাইমিনুল ইসলাম ওরফে সিফাতের পৃথক আপিল হাইকোর্টে শুনানির জন্য রয়েছে। ১৭ বছর আগে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তরে নির্মম ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ ঘটনায় দুটি মামলা হয়। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় বিচারিক আদালত ও হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন। এখন মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় বিচারিক আদালতে এখনো সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।
বিচারিক আদালতে মামলার চিত্র : ঢাকা জেলার ৪০টি আদালতে দেওয়ানি মামলা ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৪৫টি, ফৌজদারি ৪ লাখ ২৪ হাজার ৬৭৯টি মামলা বিচারাধীন। ঢাকার দ্বিতীয় অর্থঋণ আদালতে ১২ হাজার ১৪৭টি মামলা ঝুলে আছে। তৃতীয় অর্থঋণ আদালতে ঝুলে আছে ১১ হাজার ৭০টি মামলা। চতুর্থ অর্থঋণ আদালতে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা ৬ হাজার ৪৬৩টি। প্রথম অর্থঋণ আদালতে রয়েছে ৪ হাজার ১৮২টি মামলা। ৪টি আদালতে ৫ থেকে ১০ বছরের পুরোনো মামলা ১ হাজারেরও বেশি। সূত্র জানায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সারা দেশে অসংখ্য মামলা হয় বিভিন্ন আদালতে। এছাড়া বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সারা দেশে অসংখ্য মামলা হয়। টিআইবির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ১৭টি মামলা হয়েছে।
‘বেঞ্চ ভেঙে যাওয়ায় ৬ বছর ঘুরেও শুনানি করতে পারিনি’ : ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মাসুদ রানা যুগান্তরকে বলেন, সুপ্রিমকোর্টে দিন দিন মামলা বাড়ছে। বর্তমানে হাইকোর্টে রুল-সংক্রান্ত মামলাগুলোর শুনানি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ডেথ রেফারেন্স, সিভিল, ক্রিমিনাল, রিট ও কোয়াশমেন্ট মামলা তেমন শুনানি হচ্ছে না। মামলাজট বাড়ার এটি অন্যতম কারণ। এছাড়া বেঞ্চ ভেঙে দেওয়া মামলা জটের আরেকটি কারণ। তিনি বলেন, একটি মামলা কার্যতালিকায় নিচ থেকে ওপরে আসতে কমপক্ষে ৬ মাস লেগে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক বছরও লাগে। শুনানির ঠিক আগ মুহূর্তে দেখা যায় বেঞ্চ ভেঙে যায়। এ ক্ষেত্রে মামলাটির শুনানি নিয়ে দেখা দেয় অনিশ্চয়তা। নিজেকে ভুক্তভোগী উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেঞ্চ ভেঙে যাওয়ায় আমার একটি মামলা ৬ বছর ঘুরেও শুনানি করতে পারিনি। পরে মক্কেল মামলা অন্যত্র নিয়ে যান।
