চৌগাছা হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু
বুকে ব্যথা নিয়ে ভর্তি, পেট ব্যথার ওষুধ ও দ্রুত ছাড়
অভিযুক্ত চিকিৎসককে ‘দায়মুক্তি’
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যশোরের চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকের দায়িত্ব অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় সালেহা বেগম নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। বুকের ব্যাথা নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীকে গ্যাস্টিকের ও পেট ব্যাথার চিকিৎসা দেওয়া, রোগীকে সশরীরে না দেখেই ছাড়পত্র দেন মেডিকেল অফিসার মো. আখিরুজ্জামান। পরে ইসিজি রিপোর্টে সালেহা বেগম হৃদরোগে আক্রান্ত নিশ্চিত হলেও ছাড়পত্র বহাল রাখা হয়। ভুল চিকিৎসার বিষয়টি ধামাচাপা দিতেই রোগীকে ছাড়পত্র দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। দায়িত্ব অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনায় ওই নারীর ছেলে মাসুম পারভেজ লিখিত অভিযোগ দেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। সতর্কতার চিঠি দিয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসককে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ন্যায় বিচারের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন মাসুম পারভেজ। লিখিত অভিযোগে জানা যায়, চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি রাত ৯টার দিকে বুকে ব্যাথা নিয়ে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন সালেহা বেগম। পরের দিন (১৩ জানুয়ারি) সকাল ৬টায় রোগীকে ছাড়পত্র দেন দায়িত্বরত মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আখিরুজ্জামান। তিনি ভর্তি থেকে ছাড়পত্র দেওয়া পর্যন্ত রোগীকে দেখেননি। স্বজনরা বারবার রোগীকে দেখে চিকিৎসা ও ছাড়পত্র প্রদানের অনুরোধ করলেও চিকিৎসক যাননি। রোগীকে ভোর ৬টায় ছাড়পত্র দেওয়া হলেও সন্তান ও স্বজনরা অপেক্ষা করেন পরবর্তী রাউন্ডের চিকিৎসকের জন্য। রাউন্ডে আসেন আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সুরাইয়া পারভীন। চিকিৎসক আসার পর রোগীর সার্বিক বিষয় জানান স্বজনরা। স্বজনদের কথা শুনে চিকিৎসক রোগীর ইসিজি, আলট্রাসনো ও ব্লাড টেস্ট দেন। মেডিকেল রিপোর্ট পাওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার ডা. ফারিয়া ইয়াসমিনকে দেখানো হয়। তিনি টেস্ট রিপোর্ট দেখে লিখিত ও মৌখিক পরামর্শ দিয়ে রোগীকে সকালে ডা. আখিরুজ্জামানের ইস্যু করা ছাড়পত্র বহাল রাখেন। ছাড়পত্রের সময় রোগীর স্বজনদের বলা হয়, পরের দিন হার্টের চিকিৎসক আসবেন। তাই কাল এসে চিকিৎসক দেখাবেন। একটু সমস্যা আছে, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এমনকি ৪ থেকে ৫ দিন পরে দেখালেও হবে। পরের দিন (১৪ জানুয়ারি) আবারও চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। এদিন জুনিয়র কনসালটেন্ট (কার্ডিওলজি) ডা. আবদুল কাদের রোগীর ইসিজি রিপোর্ট দেখেন। রোগীকে রেফার না করে ছাড়পত্র প্রদান করায় বিস্ময় প্রকাশ করেন ওই চিকিৎসক। এরপর তিনি রোগীকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে রেফার করেন। সেখানে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রদান করে রোগীর শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক উল্লেখ করে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে রেফার করা হয়। ঢাকায় নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় রোগীকে প্রথমে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ১৭ জানুয়ারি রোগীকে খুলনা বিশেষায়িত (শেখ আবু নাসের) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৮ জানুয়ারি রোগী মারা যান।
চিকিৎসকের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় সালেহা বেগমের মৃত্যুর বিষয়ে গত ফেব্রুয়ারি চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন সালেহা বেগমের ছেলে মাসুম পারভেজ। তার অভিযোগের ভিত্তিতে ১৮ ফেব্রুয়ারি চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ আহসানুল মিজান রুমী। তদন্ত কমিটির সভাপতি চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালটেন্ট (কার্ডিওলজি) ডা. আবদুল কাদের, সদস্য সচিব আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সুরাইয়া পারভীন, সদস্য জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. বিকাশ চন্দ্র পাল ও মেডিকেল অফিসার ডা. শাহিদুর রহমান। কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ৫ মার্চ মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আখিরুজ্জামানকে সতর্ক করা হয়েছে।
চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানুল মিজান রুমী স্বাক্ষরিত ওই সতর্কতার চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রোগী আনুমানিক রাত ৯টা ৫০ মিনিটে পেটের উপরিভাগে ব্যাথা, অস্থিরতা ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা নিয়ে জরুরি বিভাগে আসেন। তদন্ত কমিটি মনে করে, রোগীর ছাড়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে পরামর্শ করা ছাড়াও সশরীরে রোগীকে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। তাছাড়া তদন্ত কমিটি মনে করে ওই রোগীকে একটি ইসিজি করে রেফার/ছুটি প্রদান করা উচিত ছিল। অতএব নিুে স্বাক্ষরকারী উক্ত বিষয়ের ওপর দৃষ্টি রেখে ভবিষতে চিকিৎসা প্রদান করার ব্যাপারে আরও সতর্ক করছেন।’ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডা. আখিরুজ্জামান কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার হিসাবে কর্মরত। চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট থাকায় ঘটনার সময় তিনি সাময়িক প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
মৃত সালেহা বেগমের ছেলে মাসুম পারভেজ বলেন, ডা. আখিরুজ্জামানের দায়িত্ব অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় আমার মায়ের মৃত্যু হয়েছে। এটা প্রমাণিত সত্য। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও রোগীর কাছে না গিয়ে চিকিৎসা ও ইসিজি রিপোর্ট না করিয়ে ছাড়পত্র দেওয়া ঠিক হয়নি বলা হয়েছে। অথচ ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধু তাকে সতর্কতার চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওই চিকিৎসককে রক্ষায় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা তৎপর রয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘পরের দিন মায়ের ইসিজি রিপোর্ট দেখে হার্টের সমস্যার কথা জেনেও ছাড়পত্র দেওয়া হয়। ভুল চিকিৎসা প্রমাণিত হওয়ার ভয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করেই এ ছাড়পত্র দেওয়া হয়। আর কেউ যেন আমার মায়ের মতো মারা না যান। সেজন্য শাস্তির দাবিতে অভিযোগ করেছি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যায় বিচার পাইনি। আমি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আপিল করব।’ চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানুল মিজান রুমী বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওই চিকিৎসক যতটুকু অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন। আমার এখতিয়ারের মধ্যে তাকে (আখিরুজ্জামান) ততটুকু শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সতর্কতা বা তিরস্কার করাও শাস্তি। এ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সিভিল সার্জনের কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি চাইলে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারেন।

