Logo
Logo
×
   

Advertisement

নগর-মহানগর

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত আজ

অচলাবস্থা কাটিয়ে চালু হচ্ছে থার্ড টার্মিনাল

Advertisement

সাইফ আহমাদ

সাইফ আহমাদ

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অচলাবস্থা কাটিয়ে চালু হচ্ছে থার্ড টার্মিনাল

Advertisement

দেশে সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম আন্তর্জাতিক হলেও এর টার্মিনাল সেই মানের নয়। টার্মিনালে নিরাপত্তা ও গাড়ির পাকিং সমস্যা, মশার উপদ্রব, ল্যাগেজ বেল্ট সমস্যা, যাত্রীর লাগেজ চুরির ঘটনা ঘটছে অহরহ। যাত্রীদের টয়লেট, বিশ্রমাগারও নেই পর্যাপ্ত। এরকম আরও নানারকম সমস্যা সমাধান ও যাত্রীসেবা বাড়াতে সরকার থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। বিশাল ব্যয়ে নির্মিত এই টার্মিনাল ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে তৎকালীন সরকার লোক দেখানো উদ্বোধন করে। তবে এটি ব্যবহার উপযোগী না করায় দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। ৫ আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারও টার্মিনালটি সচল করার বিষয়ে জোর চেষ্টা চালায়নি। ফলে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয় এটি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিমানযাত্রীদের সেবার মান বাড়াতে থার্ড টার্মিনাল চালুর নির্দেশ দেন। নির্দেশ পেয়ে কী কারণে এটি এভাবে পড়ে আছে তা খুঁজে সমাধান করে চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তৎপর হয়। এরই অংশ হিসাবে অচল অবস্থায় পড়ে থাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালুর বিষয়ে গত প্রায় এক মাস ধরে কাজ করেন সংশ্লিষ্টরা। জাপানি কনসোর্টিয়ামের সংশোধিত ও কম ব্যয়ের প্রস্তাব ঘিরে আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এ নিয়ে আজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হবে। সেখানেই চূড়ান্ত হবে কারা পাচ্ছে থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব। থার্ড টার্মিনাল চালুর বিষয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত হয়েছে। তারা ব্যয় কমিয়ে সংশোধিত প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের শর্তে এসেছে নমনীয়তা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থার্ড টার্মিনাল চালু হলে যাত্রীসেবা আরও সহজ ও গতিশীল হবে। একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক আকাশপথ যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন। পরিচালনার দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, আমি আশাবাদী শুক্রবার থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা চুক্তি বিষয়ে সমাধান করতে পারব। বৃহস্পতিবার দুপুরে বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা ও তিনি সচিবালয়ে জাপানি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আলোচনায় ফিন্যান্সিয়াল গ্যাপের বিষয়ে জাপানি রাষ্ট্রদূতকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তিনি কনসোর্টিয়াম ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এ চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মাফিদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, থার্ড টার্মিনাল চালু করা এখন শুধু অবকাঠামোগত প্রয়োজন নয়, এটি দেশের বিমান চলাচল খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বাস্তবতায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিদ্যমান টার্মিনালগুলোতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘদিন বহন করা সম্ভব নয়। যাত্রী সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সেই অনুপাতে অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা উন্নত হয়নি। ফলে ফ্লাইট স্লট সংকট, বিলম্ব এবং সার্বিক সেবার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। থার্ড টার্মিনাল চালু হলে শুধু পুরো বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক ও কার্যকর পরিবর্তন আসবে। এতে আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে এবং দেশের এভিয়েশন সেক্টরের ভাবমূর্তিও উন্নত হবে। কারা পরিচালনার দায়িত্ব পেল, সেটি বড় বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)-এর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আগের প্রস্তাবে থাকা সেবামূল্য, পরিচালন নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব ভাগাভাগি সংক্রান্ত আপত্তিগুলো নতুন প্রস্তাবে সমন্বয় করা হয়েছে। এতে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতার পথ তৈরি হয়েছে। যার ফলে এই ব্যাপারটি এখন সমাধানের পথে।

সূত্রমতে, গত সোম ও মঙ্গলবার বেবিচক সদর দপ্তরে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ধারাবাহিক কারিগরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সংশোধিত প্রস্তাবের খুঁটিনাটি পর্যালোচনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নীতিগত আলোচনা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বিষয়টি এখন ‘ডিল ক্লোজিং’ পর্যায়ে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায়, বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বুধবার সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা এবং প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে বৈঠকের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করেন।

আজ বিকাল ৩টায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ‘টার্নিং পয়েন্ট’। বৈঠক শেষে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পথ উন্মুক্ত হতে পারে। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উপস্থিত থাকবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। আর জাপানের পক্ষে থাকবেন জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ভাইস-মিনিস্টার, জাইকা ও জাপানি কনসোর্টিয়ামের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।

এদিকে প্রায় ৯৯ শতাংশ নির্মাণকাজ শেষ হলেও পরিচালনা কাঠামো নিয়ে জটিলতার কারণে বছরের পর বছর ধরে চালু করা যায়নি থার্ড টার্মিনাল। ফলে হাজার কোটি টাকার এই আধুনিক অবকাঠামো দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় সমালোচনা ক্রমেই বাড়ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এতে গতি আসে এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৩ মার্চ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জাপানি পক্ষকে সংশোধিত প্রস্তাব দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। বৈঠকে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিকভাবে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, সোজিৎস করপোরেশন এবং নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করপোরেশন নিয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম নতুন প্রস্তাব জমা দেয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সংশোধিত প্রস্তাবে আগের তুলনায় অধিক নমনীয়তা প্রতিফলিত হয়েছে, যা একটি ‘উইন-উইন’ চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এর ফলে দুপক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য অনেকটাই কমে এসেছে এবং সমঝোতার পথ এখন অনেকটাই সুগম হয়েছে।

প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পে অর্থায়নের বড় অংশ দিয়েছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। প্রায় ৫ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই টার্মিনাল চালু হলে বছরে অতিরিক্ত ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী এবং প্রায় ৯ লাখ টন কার্গো পরিবহণ সম্ভব হবে। টার্মিনালটি চালু করতে বিলম্ব হওয়ার কারণে দৃশ্যমান প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। এয়ারলাইনগুলোর জট, স্লট সংকট এবং পরিচালন অদক্ষতার মুখোমুখি হচ্ছে। আর যাত্রীরা টার্মিনালে ভিড়ের মধ্যে ভোগান্তি ও সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম