বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আজ
স্বাস্থ্য খাত বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য গবেষণায় পিছিয়ে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে বিভিন্ন সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের প্রার্দুভাব ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা আসন্ন রোগব্যাধির ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে আগাম সতর্কও করছেন। কিন্তু সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে বিষয়টিকে যথা সময়ে গুরুত্ব না দেওয়ায় রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়ছে। এতে বিভিন্ন সময় নানা রোগের প্রকোপ মোকাবিলা করা যাচ্ছে না। আক্রান্তরা চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট ও চিকিৎসা না পাওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঘটছে। করোনা মহামারি ও ডেঙ্গুর পর সম্প্রতি হাম রোগের প্রার্দুভাব ছড়িয়ে পড়ায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের চিত্র কতটা নাজুক তা স্পষ্ট হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস-২০২৬।
প্রতি বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, মাতৃত্বকালীন যত্ন, সংক্রামক-অসংক্রামক রোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মোকাবিলার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একটি নির্দিষ্ট থিম ঘোষণা করে। সংস্থার মতে, চলতি ২০২৬ সালে, বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যব্যবস্থা একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে থাকবে, যার মধ্যে রয়েছে উদীয়মান রোগ, জলবায়ু সম্পর্কিত অসুস্থতা, মানসিক স্বাস্থ্য উদ্বেগ ও স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ঘাটতি। চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় ডব্লিউএইচও নির্ধারিত বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘টুগেদার ফর হেলথ, স্ট্যান্ড ইউথ সায়েন্স অর্থাৎ স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সব প্রাণ।’ প্রতিপাদ্যে সব ধরনের সংক্রামক-অসংক্রমক রোগ সচেতনতা থেকে শুরু করে সমন্বিত, গবেষণা-সমর্থিত চিকিৎসা নিশ্চিতের কথা বলছে। পাশাপাশি ‘ওয়ান হেলথ’ তথা মানব স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও প্রাণীকুলের সামগ্রিক নিরাময়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। বর্তমান সরকার ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও প্রত্যেক নাগরিকের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেছেন, মানুষ, পশুপাখি ও পরিবেশ-এই তিন উপাদান পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। এদের নিরাপত্তা ও সুস্থতা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। এজন্য সব প্রাণের সুরক্ষা সময়ের দাবি। এটাই ওয়ান হেলথ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ ধারণা, যা মানুষের সুস্থতা নিশ্চিতের পাশাপাশি তার চারপাশের প্রাণীকুল ও পরিবেশের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় সমান তাগিদ দেয়। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান ও পরিবেশবিজ্ঞানকে সমন্বিত করে গবেষণা এবং টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত এক দশকে হৃদরোগ, স্নায়ুবিক রোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, কিডনি জটিলতা, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, উচ্চরক্তচাপ, আর্থ্রাইটিস ও মানসিক অসুস্থতার মতো সমস্যা বাড়ছে। আক্রান্তরা ৩০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে মারা যাচ্ছেন। এসব রোগের চিকিৎসায় শতাধিক মেডিকেল কলেজ, একটি সুপারস্পেশালাইজড হাসপাতাল, ২০টি বিশেষায়িত হাসপাতালসহ নামি-দামি প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। কিন্তু সঠিক রোগ নির্ণয় না হওয়া ও সেবা অব্যবস্থাপনা প্রচুর। রোগীদের পর্যাপ্ত সময়দানে চিকিৎসকদের আন্তরিকতা ও সদ্ব্যবহারের ঘাটতি আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, দেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ এমনিতেই কম। প্রস্তাবিত বাজেট পর্যালোচনার সময় তা আরও কমিয়ে দেওয়া হয়। প্রতি বছর গবেষণার জন্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও এ তহবিল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা অনেক ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে যথাযথভাবে ব্যয় করা সম্ভব হয় না। তিনি আরও বলেন, ফান্ড বণ্টন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে করা হলেও প্রায়ই অডিট আপত্তি তোলা হয়। এসব আপত্তি থেকে মুক্তি পেতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়। ফলে অনেক কর্মকর্তা নিজের চাকরি রক্ষার স্বার্থে এসব প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে অনিচ্ছুক থাকেন। স্বাস্থ্য খাতে গবেষণার জন্য বরাদ্দ এখনো সীমিত। এ অবস্থায় দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক সায়েবা আক্তার। তিনি যুগান্তরকে বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণালব্ধ তথ্য বা প্রমাণ (এভিডেন্স) ছাড়া ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, দল বা গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গবেষকদের কাজ দিতে হবে এবং ঢাকার বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। গবেষণার ফল সংরক্ষণ ও বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিতে জোর দিতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে কার্যকর পরিবর্তন আনতে হলে গবেষণাভিত্তিক নীতি, সুশাসন ও সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা ছাড়া বিকল্প নেই। অন্যথায় ভবিষ্যতে দেশ আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে।
দিবসের কর্মসূচি : বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উদযাপনে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বেশকিছু কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন সপ্তাহব্যাপী (৭ থেকে ১৩ এপ্রিল) সেবা সপ্তাহ পালন করছে। আজ সকাল ৯টায় মিরপুর হাসপাতাল মিলনায়তনে ‘খেলাধুলা বাড়ায় প্রাণ, হৃদয় থেকে শক্তিমান’ শীর্ষক একটি গণমুখী সেমিনারের আয়োজন করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের আজ সকাল ৬টায় ওয়ান হেলথ ফর রান, সকাল ৮টায় ক্লিন ফর হেলথ ক্যাম্পেইন, সকাল ১০টায় র্যালি ও দিনব্যাপী হেলথ ক্যাম্পের মাধ্যমে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হবে।
