Logo
Logo
×
   

নগর-মহানগর

বাবার কবরের পাশে বসে শিশুর আর্তনাদ

আমরা খাব কী, যাব কোথায়

মোহাম্মদ মোরশেদ আলম

মোহাম্মদ মোরশেদ আলম

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা খাব কী, যাব কোথায়

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে পোশাককর্মী সুজনের কবরের পাশে স্ত্রী সোনিয়া বেগম ও দুই শিশুসন্তান -যুগান্তর

স্বামীর কবরের পাশেই দুই সন্তানকে নিয়ে আশ্রয়ের খোঁজ করছেন সোনিয়া বেগম। মাথা গোঁজার একটি ঠাঁই আর একটু মানবিক সহায়তার আশায় দিন কাটছে তার। পাশে বসে আছে ৯ বছরের অবুঝ কন্যা ছোঁয়া, কোলে ১৮ মাসের দুগ্ধপোষ্য পুত্রসন্তান। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার উত্তর লস্করচালা গ্রামে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য স্থানীয় মানুষের মধ্যে গভীর সহানুভূতি ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। 

কোথাও ঠাঁই না পেয়ে শেষ পর্যন্ত স্বামীর কবরের পাশেই অবস্থান নেন সোনিয়া। বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ৯ বছরের শিশু ছোঁয়ার কান্না উপস্থিত অনেকের চোখে জল এনেছে। কেঁদে কেঁদে ছোয়া বলছে, ‘বাবা তুমি কোথায় গেলা, আসো। তোমার দেওয়া জায়গায় আমরা থাকতে পারছি না। দাদা-দাদি আমাদের খাইতে দিচ্ছে না। আমরা খাব কী? আমরা যাব কোথায়। বাবা, তুমি উঠে আসো।’ 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোনিয়া আক্তারের স্বামী ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত সুজন মাহমুদের (৩৮) অকাল মৃত্যুর পরই বিপাকে পড়েন তিনি। সোনিয়ার অভিযোগ, শ্বশুরবাড়িতে আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যথাযথ চিকিৎসার অভাবে তার স্বামী ধুঁকে ধুঁকে মারা যান। তার স্বামী গার্মেন্ট সেক্টরে চাকরি করতেন। চার বছর আগে ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২ এপ্রিল মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই তিনি জানতে পারেন, শ্বশুরবাড়িতে তার এবং সন্তানদের জন্য আর কোনো জায়গা নেই। সোনিয়ার দাবি, শ্বশুর কফিল উদ্দিন ও শাশুড়ি তাদের মেনে নিতে রাজি নন। এমনকি স্বামীর দাফনের সময়ও শ্বশুর সেখান থেকে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে, যা এলাকায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। 

স্বামী হারানোর শোকের মধ্যেই দুই সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন সোনিয়া। তার অসহায় অবস্থা দেখে স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলামের পরিবার মানবিক কারণে কিছুদিন আশ্রয় দেন। কিন্তু পরে আইনি জটিলতার আশঙ্কায় সেই আশ্রয়ও টেকেনি বলে জানা গেছে। 

কোথাও ঠাঁই না পেয়ে শেষ পর্যন্ত স্বামীর কবরের পাশেই অবস্থান নেন সোনিয়া। 

অশ্রুসিক্ত সোনিয়া বেগম বলেন, স্বামীর লাশ ফেলে শ্বশুর চলে গিয়েছিলেন। এখন আমি এই দুই সন্তান নিয়ে কোথায় যাব? আমার তো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। শ্বশুরবাড়িতে থাকার অধিকারটুকুও দেওয়া হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে স্বামীর কবরের পাশে বসে আছি, আল্লাহ যদি কোনো ব্যবস্থা করেন। 

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের বিয়ে সুজন মাহমুদের বাবা-মা মেনে নেননি। এজন্য তারা বাড়িতে পৃথকভাবে বাস করতেন। অন্যদিকে এখন শ্বশুর-শাশুড়ি বাড়িতে থাকতে দিতে চাইলেও সোনিয়া বেগম চাচ্ছেন তাদের জায়গাজমি শ্বশুর-শাশুড়ি লিখে দিক। এ নিয়েই বিরোধ। 

এলাকাবাসী মনে করেন, পারিবারিক বিরোধ ভুলে শিশুদের কথা ভেবে দাদা-দাদির উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো। সচেতন মহলের প্রশ্ন-দুটি শিশুসহ একটি পরিবার কী এভাবেই আশ্রয়হীন হয়ে থাকবে? স্থানীয় বাসিন্দা ও সমাজকর্মীরা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, সোনিয়া ও তার দুই শিশুর আইনি অধিকার নিশ্চিত করে নিরাপদ বসবাসের ব্যবস্থা করা হোক। 

নিহত সুজনের বাবা কফিল উদ্দিন ও মায়ের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলে দুর্ব্যবহার করেন। 

জানতে চাইলে কালিয়াকৈর থানার ওসি মো. শহিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দুপক্ষকে নিয়েই মীমাংসা করার চেষ্টা করছি। যদি মীমাংসা না হয় তাহলে আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .