ক্ষমতায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
নার্সদের ৯০ শতাংশই পদোন্নতিবঞ্চিত
Advertisement
জাহিদ হাসান
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ক্ষমতায়ন না থাকা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সরকারি নার্সদের ৯০ শতাংশেরই পদোন্নতি হচ্ছে না। নিজেদের পেশার উন্নয়নে নীতিনীর্ধারণের ক্ষেত্রে নার্সদের না রাখায় কোনো অর্গানোগ্রাম এখনো তৈরি করা সম্ভব হয়নি। চাকরিবিধিতে পদোন্নতির জন্য গ্রেড ও পদ নির্ধারণ করা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। একজন নার্স যে পদে চাকরিতে ঢুকছেন, সেই পদে থেকেই অবসরে যাচ্ছেন। মাঝখানে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি করা হয়। কিন্তু পদ ও বেতন বাড়ে না। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে বেতন পান মূল পদ সিনিয়র স্টাফ নার্সের। সবাই একই গ্রেডের হওয়ায় থাকছে না চেইন অব কমান্ড। দেখা দিচ্ছে বিশৃঙ্খলা।
এমন প্রেক্ষাপটে আধুনিক নার্সিংয়ের জনক ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গেলের জন্মদিন উপলক্ষ্যে আজ মঙ্গলবার দেশে পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক নার্স দিবস-২০২৫।’ ‘ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব নার্সেস’ (আইসিএন) এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে- ‘আওয়ার নার্সেস, আওয়ার ফিউচার, ইমপাওয়ার্ড নার্সেস সেভস লাইভস।’
এ পেশায় নিয়োজিতরা অভিযোগ করছেন, নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউট চলছে সিনিয়র স্টাফ নার্স দিয়ে। অধ্যক্ষ ও অধ্যাপক থেকে প্রভাষক পর্যন্ত সংযুক্তি হিসাবে মূল বেতনে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন সিনিয়র স্টাফ নার্সরা। গত বছর প্রভাষক পদে কিছু নার্সকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এখন সিনিয়র স্টাফ নার্সের পাশাপাশি এসব কলেজ ও ইনস্টিটিউট চলছে ইনস্ট্রাক্টর দিয়ে। ৯০ শতাংশ নার্সের আবাসন ব্যবস্থা নেই। চালু হয়নি ঝুঁকি ভাতা। ২৫ বছর আগের ইউনিফর্ম ভাতা এখনো রয়ে গেছে। ধোলাই ভাতা হিসাবে মাসে পাচ্ছেন মাত্র ২১৯ টাকা।
এ ছাড়া নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে মহাপরিচালক ও পরিচালকসহ পদের ৯১ শতাংশেই নিয়োগ পাচ্ছেন প্রশাসন ক্যাডারসহ নার্সিং পেশার বাইরের জনবল। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান নার্সিং কাউন্সিলও দখলে প্রশাসন ক্যাডারের। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল, নার্সদের সংগঠন ও বিভিন্ন পর্যায়ের নার্সদের সঙ্গে কথা বলে দেশের নার্সিং খাতের এই চিত্র পাওয়া গেছে।
পদ আছে পদোন্নতি নেই : হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নার্সদের সাত ধরনের পদ। এর মধ্যে হাসপাতালে চারটি পদে পদোন্নতি আছে। এগুলো হলো-একজন করে নবম গ্রেডে ডেপুটি নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট ও নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট, সাত বিভাগে সাতজন বিভাগীয় সহকারী পরিচালক ও জেলায় একজন করে জেলা পাবলিক হেলথ নার্স। নার্সিং সুপারভাইজার পদে কাজ করছেন নিজ বেতনে সিনিয়র স্টাফ নার্স। বাকি দুটি পদ হলো-সিনিয়র স্টাফ নার্স ও মিডওয়াইফ। অর্থাৎ হাসপাতালে ১০ জন নার্স পদোন্নতি পাচ্ছেন। বাকি ৯০ শতাংশের কোনো পদোন্নতি নেই।
অধিদপ্তরের জনবলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হাসপাতালে পদোন্নতির জন্য ৫টি পদে এক হাজার ৪৫৩ জন জনবল অনুমোদন করা আছে। সেখানে এখন শূন্য রয়েছে ৩২৯ জন। অর্থাৎ ২৩ শতাংশ পদই ফাঁকা। অন্যদিকে, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের ২২টি পদের মধ্যে শুধু প্রভাষক (নার্সিং) পদে গত বছর নবম গ্রেডে পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। যাদের নেওয়া হয়েছে তাদের চাকরির সময়ও শেষপর্যায়ে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই প্রভাষকদের মধ্য থেকে কাউকে নার্সিং কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব দিয়ে সংযুক্তিতে পাঠানো হচ্ছে। তবে অধিকাংশ কলেজের অধ্যক্ষ সিনিয়র স্টাফ নার্স। সরকারি ৩৬টি নার্সিং কলেজের ৩৬ জন অধ্যক্ষই সিনিয়র স্টাফ নার্স। তারা নিজ পদের বেতনের বিপরীতে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে এই পদে কাজ করছেন। এই ৩৬ কলেজে উপ-অধ্যক্ষ পদে একজনও নেই। এসব কলেজে শিক্ষকতার কাজ করানো হচ্ছে সিনিয়র স্টাফ নার্সদের দিয়ে, নার্সিং ইন্সট্রাক্টর নাম দিয়ে।
সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি অ্যান্ড রাইটস (এসএনএসআর)-এর মহাসচিব সাব্বির মাহমুদ তিহান যুগান্তরকে বলেন, দেশে এক লাখ ৪০ হাজার চিকিৎসকের বিপরীতে নার্স প্রয়োজন চার লাখ ২০ হাজার। বর্তমানে মাত্র এক লাখ ২০ হাজার নিবন্ধিত নার্স রয়েছে। নার্স সংকটে রোগীরা পর্যাপ্ত সেবা পাচ্ছেন না। রোগীদের বিদেশমুখিতার অন্যতম কারণও এটি। অন্যদিকে নার্সদের বেতন কাঠামো নিম্নমানের। উন্নত বিশ্বের তুলনায় এ দেশের নার্সদের বেতন প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ কম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে নার্সদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ জান্নাতুন নেসা বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও মানবিক করতে নার্সদের ক্ষমতায়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পেশাগত মর্যাদা ও দক্ষতা উন্নয়নের বিকল্প নেই।
