বিশ্ব উচ্চরক্তচাপ দিবস আজ
অসংক্রামক রোগের শীর্ষে উচ্চরক্তচাপ
Advertisement
জাহিদ হাসান
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে উচ্চরক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক (হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, কিডনি রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ডায়াবেটিস) রোগ বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫’ অনুযায়ী শীর্ষ ১০টি রোগের তালিকায় প্রথমে রয়েছে উচ্চরক্তচাপ বা হাইপারটেনশন। এ রোগের (উচ্চরক্তচাপ) প্রকোপ মোকাবিলায় সরকার বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করছে। কিন্তু টেকসই অর্থায়নের অভাবে সবার জন্য বিনামূল্যে ওষুধ প্রদানের সরকারি সিদ্ধান্ত পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। এতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ জরুরি বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
এমন পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বের মতো আজ দেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব উচ্চরক্তচাপ দিবস-২০২৬। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘কন্ট্রোলিং হাইপারটেনশন টুগেদার’। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা যুগান্তরকে বলছেন, স্বাভাবিক অবস্থায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের রক্তচাপের পরিমাণ ১২০/৮০ মিমি. পারদচাপ ধরা হয়ে থাকে। রক্তচাপের এই মাত্রা দুইটি ভিন্ন দিনে ১৪০/৯০ মিমি. পারদচাপ বা এর বেশি হলে বুঝতে হবে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে। তবে বয়স বিবেচনায় রক্তচাপ কিছুটা কম বা বেশি হতে পারে। ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে ১৩০/৮০ মিমি. পারদচাপের অধিক হলে তা উচ্চরক্তচাপের পর্যায়ে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, অধিকাংশ সময় উচ্চরক্তচাপের নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ ও উপসর্গ থাকে না, অর্থাৎ রোগী বুঝতেই পারে না যে তার উচ্চরক্তচাপ রয়েছে। এজন্য উচ্চ রক্তচাপকে নীরব ঘাতক বলা হয়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সকালের দিকে মাথাব্যথা, নাক দিয়ে রক্ত পড়া, হৃৎপিণ্ডের অনিয়মিত ছন্দ, দৃষ্টিতে পরিবর্তন ও কানে গুঞ্জন অনুভূতি প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অত্যধিক উচ্চরক্তচাপ ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, বমি, বিভ্রান্তি, উদ্বেগ, বুকে ব্যথা ও পেশি কম্পনের কারণ হতে পারে। উচ্চরক্তচাপ শনাক্ত করার সঠিক উপায় চিকিৎসক বা পেশাদার স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করা। উচ্চরক্তচাপের চিকিৎসা করা না হলে হৃদরোগ যেমন: বুকে ব্যথা বা অ্যানজাইনা, হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইল ও হার্ট বিট অনিয়মিত হতে পারে। এছাড়াও উচ্চরক্তচাপের কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ অর্থাৎ স্ট্রোক ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত এমনকি বিকল হতে পারে।
উচ্চরক্তচাপ কেন হয় : বর্তমানে দেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশই ঘটে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে, যার অন্যতম কারণ উচ্চরক্তচাপ। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস যেমন: খাদ্যের সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ (সোডিয়াম) গ্রহণ, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাবার, তামাক-অ্যালকোহল সেবন ও বায়ুদূষণ উচ্চরক্তচাপের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে থাকে। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন উচ্চরক্তচাপের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে যেমন: শারীরিকভাবে কর্মঠ না থাকা, অতিরিক্ত ওজন, মানসিক চাপ ও পর্যাপ্ত পরিমাণে ফলমূল এবং শাকসবজি খাওয়া। এছাড়াও পারিবারিকভাবে উচ্চরক্তচাপের ইতিহাস থাকলে বয়স বাড়ার সঙ্গে (৬৫ বছরের পরে) এবং ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগের সঙ্গে উচ্চরক্তচাপের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।
রোগীর চিত্র : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০২৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চরক্তচাপে আক্রান্তদের (৩০-৭৯ বছর বয়সি) অর্ধেকই (৫৩ শতাংশ পুরুষ, ৪৫ শতাংশ নারী) জানে না যে তাদের উচ্চরক্তচাপ রয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসা সেবা গ্রহণের হার খুবই কম, মাত্র ৩৯ শতাংশ (৩৫ শতাংশ পুরুষ, ৪২ শতাংশ নারী)। নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে মাত্র ১৬ শতাংশ (১৫ শতাংশ পুরুষ, ১৬ শতাংশ নারী) অর্থাৎ প্রতি ৭ জনে ১ জন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষ হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় মারা গেছে, যার ৫২ শতাংশের (৪৮ শতাংশ পুরুষ, ৫৬ শতাংশ নারী) জন্য দায়ী উচ্চরক্তচাপ।
সরকার কী করছে : উচ্চরক্তচাপসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ মোকাবিলায় সরকারিভাবে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের ওষুধ তালিকায় উচ্চরক্তচাপ ও ডায়বেটিসের ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের (সিসিএইচএসটি) কমিউনিটি ক্লিনিকে ব্যবহৃত ওষুধের তালিকা হালনাগাদকরণ কমিটি ২০২৩ সালের ১৪ মে অনুষ্ঠিত সভায় কমিউনিটি ক্লিনিকের ওষুধ তালিকায় উচ্চরক্তচাপের জন্য এমলোডিপিন ৫ মি. গ্রা. এবং ডায়াবেটিসের জন্য মেটফরমিন ৫০০ মি. গ্রা. সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত হয়। এটি বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট (সিসিএইচএসটি) ও এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)-সহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা কাজ করছে।
উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বাধা : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চরক্তচাপসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে টেকসই অর্থায়ন ও সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতাসহ বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যেমন: স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে উচ্চরক্তচাপের ওষুধ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে টেকসই অর্থায়নের অভাব। অপর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের কারণে কমিউনিটি ক্লিনিক ও এনসিডি কর্নারগুলোয় উচ্চরক্তচাপের ওষুধ নিয়মিত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. মো. এনামুল হক বলেন, ‘উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি বরাদ্দ বাজেটের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।’
কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. খোরশেদ আলম বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উচ্চরক্তচাপের ওষুধ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করতে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এই কার্যক্রম ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল বলেন, উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে টেকসই অর্থায়নকে একটি কার্যকর বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচনা করতে হবে।
