Logo
Logo
×
   

Advertisement

নগর-মহানগর

বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুলের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু

বাবার ‘ভুয়া’ মুক্তিযোদ্ধা সনদে ২৫ বছর ধরে চাকরি

সনদে সই দেখানো হয় শেখ হাসিনার * গেজেটভুক্ত ৬৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নেই নাম * বেবিচকের নথিতে উল্লেখ রয়েছে, ‘গোপালগঞ্জের মো. শরিফুল ইসলাম আওয়ামী মতাদর্শী’ * তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা -সদস্য, বেবিচক

Advertisement

Icon

সাইফ আহমাদ

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাবার ‘ভুয়া’ মুক্তিযোদ্ধা সনদে ২৫ বছর ধরে চাকরি

মো. শরিফুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় চাকরি। এরপর দীর্ঘ ২৫ বছরের চাকরি জীবনে একের পর এক পদোন্নতি। চাকরির ভিত্তি হিসাবে ব্যবহৃত মুক্তিযোদ্ধা সনদটিই ‘ভুয়া’। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) মো. শরিফুল ইসলাম বাবাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে বিক্রি করে জাল ও ভুয়া সনদ সংগ্রহ করে ২০০১ সালে বেবিচকে সহকারী প্রকৌশলী পদে চাকরিতে যোগ দেন। তিনি বাবার নামে মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়ে কোটায় চাকরি পান সেই সনদে আবার সই ছিল শেখ হাসিনার। যা নজিরবিহীন। সম্প্রতি বিষয়টি জানাজানি হলে বেবিচক, বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নড়েচড়ে বসে।

শুধু মুক্তিযুদ্ধের সনদ জালিয়াতিই নয়, মো. শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। এতকিছুর পরও ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর তিনি বাগিয়েছেন পদোন্নতিও।

বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) অতিরিক্ত সচিব এস এম লাবলুর রহমান বলেন, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান চলছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, শরিফুল ইসলাম ২০০১ সালের ২৪ জানুয়ারি বেবিচকে যোগদান করেন। চাকরির সময় তিনি তার বাবা মো. মোশাররফ হোসেনের নামে ইস্যুকৃত একটি মুক্তিযোদ্ধা সনদ জমা দেন। চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটার পূর্ণ সুবিধা নেন। যুগান্তরের হাতে আসা শরিফুল ইসলামের চাকরির নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তার জমা দেওয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদটি ১৯৯৯ সালের ২৬ অক্টোবর ইস্যু দেখানো হয়। সেখানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষর রয়েছে। অথচ মুক্তিযোদ্ধা সনদে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর থাকার নজির নেই বলছেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা।

এছাড়া শরিফুলের দেওয়া সনদ অনুযায়ী গোপালগঞ্জ জেলার গেজেটভুক্ত ৬৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা পর্যালোচনা করে সেখানেও তার বাবা মোশাররফ হোসেনের নাম পাওয়া যায়নি। এ তথ্য সামনে আসার পর সনদের বৈধতা যাচাইয়ের দাবিতে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে বেবিচক চেয়ারম্যানের কার্যালয়, বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং দুদকে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, মুক্তিযোদ্ধা সনদ ইস্যুর প্রচলিত কাঠামোতে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর থাকার বিষয়টি অস্বাভাবিক। তদন্তকারীরাও এখন যাচাই করছেন ওই সময়ে এমন কোনো সনদ সরকারিভাবে ইস্যু করা হয়েছিল কি না।

বেবিচক সূত্র বলছে, শুধু জাল সনদে চাকরিই নয়, কর্মজীবনেও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেসবের জন্য তিনি বিভাগীয় শাস্তিরও সম্মুখীন হয়েছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৭ সালে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়ের প্রধান ফটক ও বিশ্রামাগার নির্মাণে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। ওই মামলায় সরকারি অর্থ অপচয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাকে সতর্ক করা হয়। ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সিভিল এভিয়েশনের বিভিন্ন প্রকল্প, মেইনটেনেন্স ও কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ দুদকের অনুসন্ধান টিম ২০২০ সালে তাকে তলব করে। ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজধানীর কাওলায় বেবিচক কোয়ার্টারের দুটি ভবন রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে আড়াই কোটি টাকায় নয়ছয় করার অভিযোগ ওঠে এ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। সর্বশেষ কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়ন কাজে দুর্নীতির অভিযোগে দুদক তার বিরুদ্ধে মামলাও করে। বেবিচকের এক নথিতে উল্লেখ রয়েছে, মো. শরিফুল ইসলাম আওয়ামী মতাদর্শী।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘চাকরির সময় জমা দেওয়া সনদ, সংশ্লিষ্ট রেকর্ড এবং মুক্তিযোদ্ধা তালিকা মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। কিছু অসঙ্গতির বিষয় নজরে এসেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া মন্তব্য করা যাচ্ছে না।’

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ঢাকা বিভাগের মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই শাখার সহকারী পরিচালক বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হামজা যুগান্তরকে বলেন, ‘সরকারি গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকলে কাউকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। মুক্তিযোদ্ধার সরকারি তালিকা ও গেজেটই এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ভিত্তি। কোনো ব্যক্তির নাম যদি গেজেটে না থাকে, তাহলে তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা নন।’

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান শরিফুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, এই পদোন্নতির পেছনেও প্রভাব খাটানো এবং আর্থিক লেনদেনের ভূমিকা ছিল।

বেবিচকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, একদিকে দুদকের মামলার আসামি, অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে প্রশ্ন এবং প্রকল্পে অনিয়মে শাস্তি পাওয়া ব্যক্তি কীভাবে পদোন্নতি পেল এ নিয়ে ভেতরে-বাইরে আলোচনা রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এছাড়া হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে তার বক্তব্য চাওয়া হলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম