কঠোর অবস্থানে আইএমএফও
বিশ্বব্যাংকের শর্তের ছাপ থাকবে বাজেটে
ব্যাংক খাত সংস্কারের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকবে * ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখা হবে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের জন্য দেওয়া মৌলিক শর্তগুলো বাস্তবায়নের ছাপ রয়েছে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে। এর মধ্যে বাজেটে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারকে স্থিতিশীল রাখা, ব্যাংক খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সংস্কার কর্মসূচিগুলো এগিয়ে নেওয়া, দুর্বল ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, সরকারের ঋণ গ্রহণে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ঋণের শর্ত হিসাবে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সরকারকে বেশকিছু শর্ত দিয়েছে। এসবের কিছু শর্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার থেকেও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর আলোকে সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম দুই দফায় সমন্বয় করেছে। বিদ্যুৎ ও এলপিজির দামও বাড়িয়েছে। আর্থিক খাতে সংস্কারের বিষয়ে কিছু খাতে পিছপা দিয়েছিল সরকার। সেগুলো ফের এগিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে।
আইএমএফ থেকে সরকারকে ইতোমধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা আগামী বাজেট নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। বাজেটে সরকার ঋণের শর্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় সেগুলো দেখবে। এর ওপর ভিত্তি করেই জুলাইয়ে বাংলাদেশে আইএমএফের মিশন আসবে।
বিশ্বব্যাংক থেকেও সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর্থিক খাত সংস্কারের জন্য বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে সরকারকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে। এ খাতে তারা আরও ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সংস্কার বাস্তবায়ন না করলে তা আটকে যেতে পারে। যে কারণে সরকার ফের সংস্কার নিয়ে এগোচ্ছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, এ খাতের নীতিগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, ব্যাংক খাত সবল করা ও দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূত করার প্রক্রিয়া চলমান রাখতে হবে। পরে সরকার থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হবে। যদিও ইসলামী ব্যাংকে রাজনৈতিক কারণে চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দুর্বল ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে একীভূত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হবে। ইতোমধ্যে একীভূত পাঁচ ব্যাংকে নতুন করে চেয়ারম্যান ও এমডি নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এর আগে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাঁচ ব্যাংক একীভূত থাকবে কিনা সেটি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। এসব বিষয়ে বাজেটে সরকারের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিল প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ও জবাবহিদি জোরদারের কথা বলা হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে মূলধনের জোগান দেওয়ার কথাও বাজেটে বলা হয়েছে। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও পরিবারতন্ত্র থেকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বাজেটে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনার মান স্থিতিশীল ও রিজার্ভ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় সাধনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বাজারে অর্থ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ যাতে ব্যাহত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা হবে। রাজস্ব ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজিয়ে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো হবে। এর অংশ হিসাবে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করা হবে। রাজস্ব আয় বাড়িয়ে কর জিডিপি অনুপাত বাড়ানো হবে।
বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান বাড়াতে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ কম নিয়ে বিকল্প ঋণের বাজার সৃষ্টির কথা বাজেটে বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন বন্ড ছাড়ার পাশাপাশি মুদ্রাবাজারকে বহুমুখী করার পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার।
এদিকে আইএমএফ বলেছে, বিদ্যমান নীতিতে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে ঘাটতি মিটবে না। ঘাটতি চলমান থাকবে। দীর্ঘমেয়াদে ঘাটতি থাকলে তা অর্থনীতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। কারণ বিগত ২০২২ সালে বৈশ্বিক মন্দার সময় ডলার সংকটের অন্যতম কারণ চলতি হিসাবে দীর্ঘ সময়ের ঘাটতি। এ কারণে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার নীতিতে বড় পরিবর্তন আনার কথা বলেছে সংস্থাটি।
এ প্রসঙ্গে বাজেটে রেমিট্যান্স আহরণ বাড়াতে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা অব্যাহত রাখা ও ঋণনির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর নীতি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে বাজেটে। এতে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়বে। ফলে চলতি হিসাবে ঘাটতি কমবে।
সূত্র জানায়, জুনের শেষদিকে বাজেট পাশ হবে। বাজেটের সংস্কারের বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের আন্তর্জাতিকতার ছায়া দেখেই জুলাইয়ে ঢাকায় আসবে আইএমএফ মিশন। তারা ঋণের শর্তগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আরও সুনির্দিষ্ট ও নির্ধারিত মেয়াদ বেঁধে দেবে। এতে সরকার সম্মত হলেই ঋণের অর্থছাড়ের বিষয়ে আইএমএফ মিশন তাদের নির্বাহী পর্ষদে প্রস্তাব উপস্থাপন করবে।
