পেশা বদলাচ্ছেন শিল্পীরা
অস্তিত্ব সংকটে যাত্রাশিল্প
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে যাত্রাশিল্পকে ধরে রাখার উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে
যাত্রাপালায় অভিনয় করছেন শিল্পীরা। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার অন্যতম প্রধান এই লোকঐতিহ্য -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গ্রামবাংলার অন্যতম প্রধান লোকঐতিহ্য যাত্রাপালা। এক সময় শীতে, বর্ষায় কিংবা অবসর সময়ে, মেলার মাঠ কিংবা খোলা প্রাঙ্গণে হাজারো দর্শকের ভিড়ে মুখর থাকত যাত্রার আসর। পৌরাণিক কাহিনি, ঐতিহাসিক ঘটনা, সামাজিক সংকট ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প নিয়ে মঞ্চস্থ হতো যাত্রা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্পমাধ্যম এখন অস্তিত্ব সংকটে। শিল্পী, গবেষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠকদের মতে, আয়োজকদের চাহিদা অনুযায়ী যাত্রাপালায় অশ্লীলতার আগমন, আয়োজন প্রাঙ্গণে জুয়া ও লটারি, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, আধুনিক বিনোদনের প্রসারসহ নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে যাত্রাশিল্পের যাত্রাপথ। জীবিকার তাগিদে অনেকে শিল্পী পেশা পরিবর্তন করছেন। যদিও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তথা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যাত্রাশিল্পকে ধরে রাখার উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী নিবন্ধন, প্রশিক্ষণে ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যাত্রাশিল্পীরা বলছেন, এ উদ্যোগ যেন লোক দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।
যাত্রার উৎপত্তি প্রাচীন ধর্মীয় উৎসব ও শোভাযাত্রা থেকে; পরে কৃষ্ণযাত্রা, পৌরাণিক কাহিনি, রোমান্টিক উপাখ্যান এবং সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয় এতে যুক্ত হয়। অষ্টাদশ ও উনিশ শতকে যাত্রার ব্যাপক বিকাশ ঘটে। বিশ শতকে মুকুন্দ দাস দেশাত্মবোধ ও সমাজ সংস্কারের বার্তা যাত্রার মাধ্যমে তুলে ধরেন। আধুনিক যাত্রা এখন সংলাপ, অভিনয় ও সমসাময়িক বিষয়নির্ভর শিল্পমাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
যাত্রাশিল্পীদের ভাষ্য-যাত্রা শুধু বিনোদনের খোরাক যোগায়নি। যাত্রাপালার মাধ্যমে মাধ্যমে ব্রিটিশবিরোধী মুকুন্দ দাস গণজাগরণ সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। এরপর থেকে ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধেও ভূমিকা রেখেছে। ’৬৯ সালে চট্টগ্রামের বাবুল অপেরা সারা দেশে ‘একটি পয়সা’ যাত্রাপালা মঞ্চায়ন করে গণজোয়ার তুলেছিলেন। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ময়মনসিংহের গফরগাঁও, নেত্রকোনার পূর্বধলা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাত্রাপালা করে মানুষকে উৎসাহিত করেছিল। তারা জানান, যাত্রাশিল্পীদের মধ্যে মানিকগঞ্জের সুলতান সেলিম লুকমান হোসেন, মাগুরার নাজমুল হুসাইন ইকু, কুষ্টিয়ার মেহবুব ইসলাম, যাত্রাশিল্পী আমির সিরাজীসহ অনেকে মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নেন বলে জানা গেছে।
শুধু তাই নয়, মানুষকে ইতিহাস ও সাহিত্য সচেতন করার কাজটিও যাত্রাশিল্পীরা করেছেন। এর অন্যতম উদাহরণ অমলেন্দু বিশ্বাস যাত্রাপালায় কবি মাইকেল মধুসূদনের জীবন ও কর্ম নিয়ে আসেন। এরও আগে পরে ইতিহাস ও সাহিত্যনির্ভর যাত্রাপাল হয়েছে। অবশ্য এর পুরস্কার ও তীরস্কার দুটোই যাত্রাশিল্পীদের ভাগ্যে জুটেছে। অমলেন্দু বিশ্বাস, তুষার দাশগুপ্ত, মঞ্জুশ্রী মুখার্জিসহ বেশ কয়েকজনকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননাও দেওয়া হয়েছে। শিল্পকলা একাডেমি থেকেও গৌরাঙ্গ আদিত্য, মিলনকান্তি দে’সহ বেশ কয়েকজনকে পদক দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যাত্রাশিল্পী ও শিল্পের ঐতিহ্য, সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে চলচ্চিত্র ও নাটকও নির্মাণ হয়েছে। সম্প্রতি ‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ নামের সিনেমাটি ৪৮তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয়েছে।
সাড়ে চারশ বছরেরও প্রাচীন শিল্পটি নিয়ে ড. অজিত ঘোষ তার ‘নাট্য সাহিত্যের ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বাংলার প্রাচীন সংস্কৃতির একটি বিশেষ ধারা যাত্রার আবেদন কোনোকালেই নিঃশেষ হওয়ার নয়।’ কবি শামসুর রাহমান ১৯৭৯ সালের জাতীয় যাত্রা উৎসবের স্মরণিকায় বলেছেন, ‘যাত্রা আমাদের হৃদয় থেকে উঠে এসেছে। যাত্রাই আমাদের আধুনিক নাটকের উৎস।’
বাধা ও নিষেধাজ্ঞা : নানা সময়ে নানা অজুহাত দেখিয়ে যাত্রাপালা মঞ্চায়ন নিষেধও করা হয়েছে বলে মিলন কান্তি দে’র যাত্রাশিল্পের সেকাল-একাল বই পাঠে জানা গেছে। বইটির যাত্রাশিল্পের জাতীয় জাগরণ বইতে উল্লেখ করা হয়, ব্রিটিশ জমানায় একাধিকবার। পাকিস্তান আমলে নানা চ্যালেঞ্জ ও নিষেধের মধ্যেও যাত্রা মঞ্চায়ন হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এক বছরের মধ্যে পঞ্চাশেরও অধিক যাত্রাদল তৈরি হয়ে যায়। ধারণা ছিল আর বাধা আসবে না। কিন্তু ১৯৭১ সাল থেকে আজ অবধি অন্তত ৫ বার যাত্রাপালা নিষেধ করে দেওয়া হয়। সেই নীতিমালার আলোকেই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে যাত্রাদলের নিবন্ধন করাচ্ছে। বর্তমানে নিবন্ধিত যাত্রাদলের সংখ্যা ২০৫টি। এর মধ্যে ১৯টি দলের মালিক মারা গেছেন। কিছু দলের নিবন্ধনের মেয়াদ উত্তীর্ণ কিংবা স্থগিত। শিগগিরই নিবন্ধনের নবায়ন, বাতিল ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নতুন নিবন্ধন দেওয়া হবে বলে শিল্পকলা একাডেমি থেকে জানানো হয়। যদিও নিবন্ধিত যাত্রা দলকেও যাত্রা পরিবেশনে বেগ পোহাতে হচ্ছে।
পেশাবদল করছেন শিল্পীরা : সারা দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাজ না পেয়ে বিকল্প আয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য অনেকে পেশা বদল করেছেন। বর্তমানের যাত্রার হালহকিকত দেখে যাত্রার জনপ্রিয় যাত্রানট-নির্দেশক শম্ভুগঞ্জের হাবিব সারোয়ার, যশোরের দেবু, খুলনার মৃণাল ভট্টাচার্য, সাতক্ষীরার তাপসপালসহ বেশকিছু দর্শকপ্রিয় যাত্রাগুণিরা অবসরে গেছেন। বেঁচে থাকার তাগিদে পেশা ছেড়ে দোকানদারি করছেন খুলনার প্রশান্ত মন্ডল, সাতক্ষীরা কয়রার বিজন কুমার সরদার, খুলনার যাত্রাশিল্পী ও মালিক আব্দুল জলিল বাবু, শিল্পী ও দল মালিক শেফালী দাস, মাগুরার কুতুবউদ্দিন, গোপালগঞ্জের মীরা রাণী, মনিষা অধিকারী প্রমুখরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে যাত্রাশিল্পীদের অনেকেই অন্য পেশায় ঠাঁই করে নেবেন।
পালা ও পালকারের সংকট : সংকটের এখানেই শেষ নয়। যাত্রাপালার বৈচিত্র্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘুরে ফিরে পুরোনো যাত্রাপালাই মানুষকে দেখতে হচ্ছে। যুগোপযোগী গল্পও মানুষ শুনতে বা দেখতে চায়। বর্তমানে সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৫টি পালার মধ্যেই অধিকাংশ দলের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। এর মধ্যে ‘নিহত গোলাপ’, ‘অনুসন্ধান’, ‘জীবন নদীর তীরে’, ‘মানবী দেবী’, ‘ডাইনি বধূ’, দস্যু রাণী ফুলনদেবী’, ‘মিলনমালা’ ও ‘নিচুতলার মানুষ’ উল্লেখযোগ্য। যাত্রায় নতুন পালাকারের সংখ্যাও সীমিত। খুলনার এম এ মজিদ, ডাক্তার নিখিল দত্ত, গোলাম মোস্তফা, সাতক্ষীরার কাজী জাহাঙ্গীর, নেত্রকোনার রাখাল বিশ্বাস, প্রিন্সেস বিউটির পালা বিভিন্ন দলে চলছে।
ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের সম্ভাবনার পথে অন্তরায়গুলো উত্তরণে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে। বুধবার ‘যাত্রাশিল্পের মানোন্নয়ন’ বিষয়ে দিন্যব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
যাত্রাশিল্পী ও গবেষকরা মনে করেন, তবে প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধনই শেষ কথা নয়, যাত্রার আয়োজন ও অনুমোদনের জটিলতা কমানো দরকার। যাত্রা গবেষক, পালাকার, যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সহসভাপতি এম এম মজিদ যুগান্তরকে বলেন, যাত্রাশিল্প বিকাশে শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে যাত্রা বিষয় নানামুখী কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বড় সমস্যা হচ্ছে অনুমতি জটিলতা। যাত্রাগানের জন্য অনুমতি নিতে আবেদন করতে হয় জেলা প্রশাসক বরাবর। কিন্তু সেখানে সময়ক্ষেপণ আর দেন-দরবার করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হয়। শেষমেশ আয়োজকরা এক প্রকার হতাশ হয়ে পড়েন। কোথায় অনুমতি পাওয়া যায়, আবার কোথাও অনুমতি হয় না।
নেত্রকোনার স্বরবাণী যাত্রাদলের কর্ণধার রাখাল বিশ্বাস যুগান্তরকে জানান, ১ বছর ধরে তার দল সেভাবে যাত্রা করতে পারেনি। অনুমোদন জটিলতাসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে আয়োজক কমে গেছে।
এ বিষয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, যাত্রা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ লোকসংস্কৃতির অংশ। আমরা একটিকে স্বকীয় বা সুস্থ ধারায় ফেরাতে বদ্ধপরিকর। এরজন্য যা যা করণীয় আমরা করব। কবি ও লোকসংস্কৃতি গবেষক ড. আমিনুর রহমান সুলতান যুগান্তরকে বলেন, এই শিল্পের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে এখনো সম্ভব হারানো গৌরবকে নিয়ে আসা।

