তৈরি হচ্ছে না উত্তরসূরি
হারিয়ে যাচ্ছে কবিগান
ম্লান আলোয় লোকমঞ্চ: শেষ পর্ব
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গুরু-শিষ্যের পরম্পরায় উত্তরসূরি তৈরি না হওয়া, আধুনিক বিনোদনের অবাধ বিস্তার, হামলা ও হুমকিসহ নানা জটিলতায় হারিয়ে যাচ্ছে লোকসংস্কৃতির জনপ্রিয় ও বুদ্ধিদীপ্ত ধারা কবিগান। এক সময় গ্রামবাংলার হাট-বাজার, মেলা, উৎসব ও বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে কবিয়ালদের হাজির করা হতো। তর্ক, যুক্তি, কাব্য ও সংগীতের মিশেলে রাতভর চলত কবিয়ালদের লড়াই বা কবিগান। এতে হাজার হাজার মানুষ ডুবে থাকতেন। কালের বিবর্তনে লোক সংস্কৃতির এই ধারাটি হারিয়ে যাচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, দেশজ সংস্কৃতি বিকাশে এই ধারাটি বাঁচিয়ে রাখা দরকার। এ বিষয়ে সরকারি উদ্যোগও রয়েছে বলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা জানাচ্ছেন।
সর্বশেষ ডিসি সম্মেলনে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সারা দেশের ডিসিদের বাউল, কবিয়ালসহ সব লোকশিল্পীদের অনুষ্ঠানে সহযোগিতা ও নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ দেন। যদিও এই নির্দেশনার আগে-পরে এইসব আয়োজনে বাধা দেওয়া হচ্ছে। হামলা ও মামলার ঘটনাও ঘটেছে।
বাংলাদেশ বাউল সমিতি ও লোক সংস্কৃতি গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সর্বশেষ ৩০ মে নেত্রকোনার মদনে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় ‘আলেম-ওলামারা’ বাউল গান বন্ধ করে দেন। ২৪ মার্চ সিলেটের বিশ্বনাথে বাউল গানের আসরে হামলা হয়। ৭ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি বাউল চর্চা কেন্দ্রে বাউলগানের আসর বন্ধ এবং সংগীতের বিভিন্ন সরঞ্জামও জব্দ করা হয়। এছাড়া ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর যশোরের মনিরামপুরে ফকির লালন শাহর স্মরণে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী বাউল গানের আসরে হামলা হয়। আয়োজকদের ভাষ্য, টানা ১২ বছর ধরে নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। আয়োজনের ১৩তম আসর হামলার কারণে বন্ধ হয়ে যায়। ৬ মাস কারাভোগের পর ১৮ জুন জামিন পান বাউল আবুল সরকার।
সাংস্কৃতিককর্মী ও শিল্পীদের উদ্বেগ হচ্ছে বছরের পর বছর শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া বাউলগান, লালনচর্চা, কাওয়ালি ও লোকজ সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলো হঠাৎ করে বাধা দেওয়া মানে দেশজ সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করা। তাদের মতে, অপরাধ বা সামাজিক অবক্ষয়ের জন্য লোকসংস্কৃতিকে দায়ী না করে প্রকৃত সমস্যার সমাধানে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
এসব হামলা ও মামলার বিষয়ে উদ্বেগ আছে বাংলাদেশ বাউল সমিতিরও। সমিতির সভাপতি আব্দুল হালিম সাগরচাঁন বলেন, আমাদেরও সতর্ক হতে হবে। অযাচিত আচরণ বা কথা পরিহার করা দরকার। সত্যিকার কবিয়ালদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারণ করা দরকার। তিনি জানান, এখন সে অর্থে কবিয়াল নেই। গুরু-শিষ্যের পরম্পরা খুব একটা নেই। পারিবারিক পরম্পরা নেই। তবে এখনো কবিগান বা পালাগান হয় তবে সেটা অতীতের মতো জৌলুস নিয়ে নয়। এই ঐতিহ্য ফেরাতে সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার।
লোকসংস্কৃতি গবেষকদের ভাষ্য, কবিগান কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার মৌখিক সাহিত্য ও লোকজ জ্ঞানভান্ডারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কবিগানের মাধ্যমে সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের নানা বিষয় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। ফলে এই শিল্পের বিলুপ্তি মানে একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষয়। কবিগানের গুরুত্ব সম্পর্কে অধ্যাপক যতীন সরকার কবিগান সম্পর্কে বলেছেন, ‘কবিগান শুধু গান আর কবিতাই নয়, বিতর্কও’। লোক সংস্কৃতি গবেষক আলী আহাম্মদ খান আইয়োব বলেন, ‘কবিয়ালরা ছিলেন তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী।’
কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কবিগানের পৃষ্ঠপোষক সংগ্রাহক ছিলেন। তার সম্পাদনা সংবাদ পূর্বাকর পত্রিকায় কবিতা কবিয়ালদের জীবনীও ছাপা হতো। কবিগানের প্রথম সংগ্রাহক তিনি। এছাড়া পল্লীকবি জসীমউদ্দীনও কবিগান শুনতেন এবং গাইতেনও। তিনি তার স্মৃতিকথায় কবিগানের জনপ্রিয়তা ও নিজের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করেছেন-কবিগানের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। সুযোগ পেলেই তিনি কবির লড়াইয়ে অংশ নিতেন।
কবিগানের উদ্ভব ও বিকাশ : কবিগান সর্বপ্রথম ঐতিহাসিক তাৎপর্য অর্জন করে উনিশ শতকের গোড়ার দিকে বা আঠারো শতক শেষে। বাংলাদেশের একাধিক লোকসংগীতের সমন্বয়ে এ গানের সৃষ্টি হয়েছে। নবউত্থিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে কবিগান তখন বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
আলী আহাম্মদ খান আইয়োব জানিয়েছেন-মৈমনসিংহ গীতিকার সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে তার লোক সংস্কৃতি বিষয়ক এক প্রবন্ধে বলেছেন, ‘বোধ হয় অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে, পশ্চিমবঙ্গ থেকেই এ ভাবের বন্যা সর্বপ্রথম ময়মনসিংহের উপকূলে এসে সাড়া দেয়। ঠিক সেই সময় কয়েকজন কবিয়াল, এতদঞ্চলে আবির্ভূত হন। এদের মধ্যে দুজন ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। ময়মনসিংহের বিভিন্ন স্থানে আরও দু-একজন থাকতে পারেন, কিন্তু যতদূর জানি, পূর্ব ময়মনসিংহে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না।’
জানা গেছে, গোঁজলা গুঁইকে বলা হয় কবিগানের আদি কবিয়াল। তার আবির্ভাবকাল আঠারো শতকের প্রথমার্ধ। উনিশ শতকের কলকাতায় যে কয়জন কবিয়াল বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন, তাদের মধ্যে হরু ঠাকুর, নিতাই বৈরাগী, রাম বসু, ভোলা ময়রা, এন্টনি ফিরিঙ্গি প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। উনিশ ও বিশ শতকের সন্ধিলগ্নে কলকাতায় কবিগান গুরুত্ব হারাতে শুরু করে। তবে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এ গানের জনপ্রিয়তা অব্যাহত থাকে। এ পর্বের কবিগানে বাংলাদেশের লোকসাধারণের কবিপ্রতিভা, সৃজনশীলতা এবং সংগীতসাধনার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। এক্ষেত্রে প্রথম প্রতিভাধর কবিয়াল ছিলেন বিজয় সরকার তারকচন্দ্র সরকার। বিশ শতকে সর্বাধিক জনপ্রিয় কয়েকজন কবিয়াল হরিচরণ আচার্য, রমেশ শীল, রাজেন্দ্রনাথ সরকার, মানিকগঞ্জের রাধাবল্লভ সরকার, উপেন্দ্র সরকার, ভাসান সরকার, কুমুদ সরকার, অভয়চরণ সরকার, বিজয়কৃষ্ণ অধিকারী, গুমানী দেওয়ান প্রমুখ।
বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ফোকলোরবিদ ও কবি ড. আমিনুর রহমান সুলতানের ‘ঢাকা জেলার লোকসংস্কৃতি’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়-‘কবিগান মূলত বাউল গানেরই একটি ধারা। কালক্রমে এর রূপের পরিবর্তন হয়েছে। নেত্রকোনা ও সুমানগঞ্জ অঞ্চলে কবিগানকে বলা হয় মালজোড়া গান। ময়মনসিংহ, নড়াইলসহ দিনাজপুর অঞ্চলে বলা হয় কবিগান। ঢাকায় পালাগান বলা হয়। এইসব কবিগানের বিষয়গুলো হচ্ছে-শরিয়ত-মারফত, হাশর-কেয়ামত, সৃষ্টিতত্ত্ব-প্রেমতত্ত্ব, নারী-পুরুষ, দেহতত্ত্ব-নবীতত্ত্ব, বড়পীর-খাজাবাবা, জীব-পরম, হিন্দু-মুসলিম প্রভৃতি। নেত্রকোনা বাউল সমিতির সভাপতি ওস্তাদ আবদুল হাকিম বলেন, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জে এখন কবিয়াল নেই বললেই চলে। তবে এ প্রজন্মের বাউল শিল্পীরা নিজেদের মতো করে মঞ্চে কিচ্ছা পরিবেশন করেন থাকেন। সেই জায়গাটাও নানা কারণে সীমিত হয়ে আসতেছে।
কবিগানের আঙ্গিক বা ধরন : কবিগান প্রতিযোগিতামূলক গান। দুটি দলে এ প্রতিযোগিতা হয়। দলের দলপতিকে বলে কবিয়াল বা সরকার। কবিয়ালের সঙ্গীদের নাম দোহার। যন্ত্রসংগীতকারীদের মধ্যে ঢুলি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। দল দুটি পর্যায়ক্রমে আসরে এসে গান পরিবেশন করে। বাংলা পিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়-এ গানের বেশ কয়েকটি অঙ্গ আছে, যেগুলো বিশেষ অনুক্রমে বিন্যস্ত, যেমন-ডাক, মালসি, সখীসংবাদ, কবি, কবির টপ্পা, পাঁচালি ও ধুয়া এবং জোটের পাল্লা। এগুলোর মধ্যে মালসি, সখীসংবাদ ও কবি নামক গানগুলির গঠনশৈলী অভিন্ন। এসব গানের পদক্রম এরূপ : ধরন, পাড়ন, ফুকার, মিশ, মুখ, প্যাঁচ, খোচ, অন্তরা, পরচিতান ও ছুট্টি। ডাক গান বন্দনামূলক এবং এগুলো লঘুসংগীতের মতো।
লোক গবেষক ও সংগ্রাহক সুমনকুমার দাশ যুগান্তরকে বলেন, ‘একটা সময়ে গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারার একটি ছিল পালাগান। আগের সে ঐতিহ্য এখন আর নেই। তবে যা-ও অবশিষ্ট আছে, সেটাও নানা বাধাবিপত্তি ও সংকট এবং পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ক্রমাগত তলানিতে ঠেকছে।’ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা ক্রমাগতভাবে লোকসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করছি। দেশের গুণীদের নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করছি। বাউল, কবিয়াল তথা লোকসংস্কৃতি নিয়ে আমাদের বড় পরিকল্পনা আছে।

