পাঁচ বছরের তথ্য পর্যালোচনা
রেলপথে ৮৫ শতাংশ অপরাধ বেড়েছে
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নরসিংদী থেকে ট্রেনে রাজধানীর এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসছিলেন শিক্ষার্থী মাহিদুল ইসলাম (১৬)। গত ৮ জুন দুপুরে ট্রেনটি বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে থামলে বগির সব যাত্রী নেমে যান। এরপর সেখান থেকে দুই ছিনতাইকারী ওই ফাঁকা বগিতে উঠে মাহিদুলকে ঘিরে ফেলে। তাকে মারধরের একপর্যায়ে শরীরে ব্লেড দিয়ে আঘাত করে। এরপর মাহিদুলের মুঠোফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয় তারা। বনানী এলাকায় পৌঁছালে মাহিদুলকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয় ছিনতাইকারীরা। এতে তার ৪-৫টি দাঁত পড়ে যায়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পান তিনি। গুরুতর আহত মাহিদুলকে রেললাইনের পাশ থেকে পথচারীরা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেন।
সাম্প্রতিক সময়ে এভাবে রাজধানীসহ সারা দেশের রেলপথজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে ছিনতাইসহ নানা অপরাধ। যদিও অধিকাংশ ভুক্তভোগী মামলা দূরের কথা পুলিশকেও জানান না। মাহিদুলের বাবা কাজী মোমেন মিয়া বলেন, আমার ছেলেকে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করেছে তারা। ঢাকা রেলওয়ে থানার (ওসি) জয়নাল আবেদীন বলেন, ভুক্তভোগীর পরিবার কোনো অভিযোগ না করায় কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে পারিনি।
গত ৮ মে রাজধানীর বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে গাজীপুর যাচ্ছিলেন ব্যবসায়ী ওমর ফারুক (২৬)। তিনি ট্রেনের ছাদে ওঠামাত্রই চার ছিনতাইকারী তাকে ঘিরে ফেলে। পরে বগির ভেতর তারা ফারুকের পেটে ও মাথায় ছুরিকাঘাত করে। সঙ্গে থাকা ৩ হাজার টাকা ও মুঠোফোন নিয়ে যায়। গুরুতর আহত হলেও পুলিশে অভিযোগ দেননি তিনি।
রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. তোফায়েল আহমেদ মিয়া বলেন, পুলিশের এই ইউনিটে কর্মরত জনবলের সংখ্য ২ হাজার ৪৫১ জন। সদর দপ্তরসহ ছয়টি রেলওয়ে জেলায় ২৪ থানা ও ৩৩টি ফাঁড়ি রয়েছে। জনবল বাড়ানো জরুরি।
সব অপরাধের সূচক ঊর্ধ্বমুখী : ২০২১ থেকে ২৫ সাল পর্যন্ত রেলওয়ে পুলিশের ৩ হাজার ৩৮৮টি মামলার তথ্য পর্যালোচনা করেছে যুগান্তর। ২৪টি থানায় করা এসব মামলা অনুযায়ী প্রায় সব অপরাধের সূচক ঊর্ধ্বমুখী। পাঁচ বছরের হিসাবে অপরাধ ৮৫ দশমিক ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২১ সালে ৪৫৯টি মামলা হয়। এছাড়া ২০২২ সালে ৭৮৬, ২০২৩ সালে ৬৪৭, ২০২৪ সালে ৬৪৫ এবং গত বছর সবচেয়ে বেশি ৮৫১টি মামলা হয়।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডাকাতির ঘটনা। পাঁচ বছর আগে মাত্র সাতটি ঘটনা রেকর্ড থাকলেও গত বছর তা বেড়ে সাতগুণের বেশি বা ৫৩টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। তবে চুরির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে যাত্রীদের।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পাঁচ বছরে ৬৫ দশমিক ২১ শতাংশ হারে বেড়েছে চুরি। ২০২১ সালে চুরির ৯২টি মামলার তথ্য মিললেও পরের বছর ছিল ১৩৮টি মামলা। এরপর প্রতিবছর যথাক্রমে ১৯২, ১৪৪ এবং ১৫২টি মামলা হয়।
অন্যদিকে রেলপথে মাদকসংক্রান্ত ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৪৬৬টি মামলা হয়েছে, যা অপরাধের ১৬টি ক্যাটাগরির মোট মামলার ৪৩ দশমিক ২৬ শতাংশ। এছাড়া পাঁচ বছরে চোরাচালানের মামলা হয়েছে ৯১টি, খুন ৭০, অস্ত্র আইন ৩৮, নারী নির্যাতন ৩৭, শিশু নির্যাতন ১৪ ও অন্যান্য মামলা ৭৮২টি।
এদিকে কমে এসেছে রেলে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা। ২০২৩ সালে ১৭৩টি ও ২০২৪ সালে ১৭২টি ঘটনা ছিল। গত বছর মাত্র ৬২ ঘটনার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। এসব ঘটনায় ২০২৪ সালে মামলা ছিল ৪৬টি। গত বছর তা বেড়ে ৭১টিতে দাঁড়ায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সব ঘটনায় নজরদারি করে ব্যবস্থা নেওয়া রেলওয়ে পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয় বলেই সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। এজন্য পুরো রেলব্যবস্থাকে প্রযুক্তিগতভাবে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

