Logo
Logo
×
   

নগর-মহানগর

লোকলজ্জার ভয়

‘স্ত্রীর নির্যাতনের শিকার’ পুরুষ চুপ থাকছেন

এক বছরে এইড ফর মেন ফাউন্ডেশনে ১২ শতাধিক ভুক্তভোগী * উত্তরায় তুচ্ছ ঘটনায় স্বামীকে ৫ তলা থেকে ফেলে হত্যার চেষ্টা * স্ত্রীর পরকীয়ার কোনো আইনি প্রতিকার বা শাস্তির বিধান নেই

আসাদুল্লা লায়ন

আসাদুল্লা লায়ন

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

‘স্ত্রীর নির্যাতনের শিকার’ পুরুষ চুপ থাকছেন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের পরীক্ষাগারের সহকারী (ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট) সজীব প্রামাণিক (২৫) তিন বছর আগে শাহজাদী আক্তারকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকে শাহজাদী তুচ্ছ বিষয়েই সজীবের সঙ্গে ঝগড়া ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। কখনো কখনো গায়ে আঘাতের চেষ্টাও করতেন। সব মেনে নিয়ে সজীব স্ত্রীকে সংশোধনের চেষ্টায় ছিলেন। কিন্তু ১৯ জুন উত্তরায় শ্বশুরবাড়িতে তুচ্ছ বিষয়ে ঝগড়া শুরু করেন শাহজাদী। দুই ভাইকে নিয়ে তিনি সজীবকে শারীরিক নির্যাতন করেন। একপর্যায়ে তাকে ৫ তলা থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়। এতে তার দুই হাত-পা, বুক ও কোমরের হাড় ভেঙে যায়। গুরুতর আহত সজীব এখন জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) কাতরাচ্ছেন। শনিবার সজীব যুগান্তরকে বলেন, আমার শ্বশুর-শাশুড়ি ৫ জুন হজ করে ফিরেছেন। তখন শাহজাদীকে নিয়ে আমি ছুটিতে গ্রামের বাড়ি ছিলাম। ছুটি শেষে ৮ জুন ঢাকায় ফিরে তাকে তার বাবার বাড়িতে নিয়ে যাই। কিন্তু ৫ তারিখেই কেন নিয়ে আসিনি এ নিয়ে সে তর্ক শুরু করে। একপর্যায়ে তার ভাইদের উসকে দিয়ে আমাকে ব্যাপক মারধর করে। পেটাতে পেটাতে তারা আমাকে পঞ্চম তলার বারান্দায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে হত্যার উদ্দেশ্যে নিচে ফেলে দেয়। এ ঘটনায় আমরা উত্তরা পূর্ব থানায় মামলা করেছি। এরপর থেকে তারা পলাতক।

শুধু সজীব প্রামাণিক নয়, প্রতিনিয়ত এমন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন অসংখ্য পুরুষ। সঙ্গিনীর মাধ্যমে সামাজিক, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন ছাড়াও আত্মহত্যা এমনকি হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। তবে বিষয়টি প্রকাশ করা সমাজে আপত্তিকর, অনুচ্চার্য বা ট্যাবু হয়ে আছে। ফলে অধিকাংশ ঘটনা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। যারা ট্যাবু ভেঙে প্রকাশ্যে আসছেন বা অভিযোগ করছেন তারাও আইনি কাঠামোয় আটকে যাচ্ছেন। অন্যদিকে নারীদের অধিকার রক্ষার আইন বা পদক্ষেপগুলোও উদ্দেশ্যমূলকভাবে পুরুষকে হয়রানির জন্য ব্যবহার হচ্ছে। পুরুষদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এইড ফর মেন ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ১ হাজার ২৮০ জন নির্যাতিত পুরুষ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে প্রায় সবাই পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করেন। যাদের কাউন্সেলিং ও আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতার কারণে নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র তুলে আনা যায়নি।

তবে অভিযোগগুলোর আলোকে তুলে ধরা পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অভিযোগকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারি কর্মকর্তা। বিদ্যমান সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা বা গ্রেফতার হলে সাময়িক বরখাস্ত বা চাকরিচ্যুতির কঠোর বিধান রয়েছে। এই প্রশাসনিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া ও সাজানো মামলা দিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা ও অনৈতিক সুবিধা দাবি করা হচ্ছে।

এইড ফর মেন বলছে, শত শত পুরুষ স্ত্রীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের তথ্য-প্রমাণ নিয়ে আসেন। কিন্তু প্রচলিত দণ্ডবিধিতে স্ত্রীর পরকীয়ার বিরুদ্ধে স্বামীর কোনো কার্যকর আইনি প্রতিকার বা শাস্তির বিধান নেই। এমন পরিস্থিতিতে বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিলে যৌতুক বা নারী নির্যাতনের মামলার সম্মুখীন হতে হয়।

সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ বলছে, ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০’-এর সংজ্ঞাগত সীমাবদ্ধতার কারণে পুরুষরা ভিকটিম হওয়া সত্ত্বেও এ আইনের অধীনে মামলা করতে পারছেন না। সাম্প্রতিক সময়ে পুরুষদের ওপর চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অপরাধের গভীরতা মারাত্মক হওয়া সত্ত্বেও নারীদের ক্ষেত্রে লঘু দণ্ড বা আইনি শিথিলতার কারণে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে না।

এইড ফর মেন বলছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটি সাধারণ অভিযোগের ভিত্তিতেই যাচাই ছাড়াই পুরুষকে গ্রেফতার করা হয়। ফলে তিনি চাকরি, ব্যবসা ও সামাজিক সম্মান হারান। এসব বিবেচনায় এইড ফর মেন ফাউন্ডেশন দেশের সব প্রচলিত আইনে ‘পুরুষ’ ও ‘নারী’কেই সমান সুরক্ষার আওতায় এনে আইনগুলো লিঙ্গ-নিরপেক্ষ করার দাবিসহ সরকারি উদ্যোগে নির্যাতিত পুরুষদের আইনি, সামাজিক, মানসিক সহায়তার জন্য জাতীয় পর্যয়ে একটি বিশেষ সেল এবং সার্বক্ষণিক হেল্পলাইন চালুর দাবি জানিয়েছে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, আদালতে আসা বেশির ভাগ নারী নির্যাতনের মামলার ঘটনা মিথ্যা থাকে। আইনের অপব্যবহার করে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনসহ যে কারও বিরুদ্ধে অনেকেই মামলা করে দেন।

আইনমন্ত্রীর বরাত দিয়ে ‘এইড ফর মেন’ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম নাদিম বলেন, আমাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নারী নির্যাতন আইনের প্রায় ৯৫% মামলাই মূলত হয়রানি করার উদ্দেশ্যে বা স্বামী ডিভোর্স দিলে তার প্রতিশোধ হিসাবে করা হয়। তিনি বলেন, ডিভোর্সের হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় ৭০% ডিভোর্স নারীদের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে। নারীরা ডিভোর্স দিলেই কাবিনের টাকা পাচ্ছেন, অন্যদিকে পুরুষরা ডিভোর্স দিতে গেলে নানা হয়রানিমূলক মামলার ভয়ে থাকছেন। এমনকি পরকীয়া আইনের (৪৯৭ ধারা) ক্ষেত্রেও নারীর শাস্তির বিধান নেই, যা এক ধরনের বড় আইনি অসমতা।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .