Logo
Logo
×
   

Advertisement

নগর-মহানগর

সরকারি অনুদান-বৈষম্য

সংস্কৃতি অঙ্গনে বাড়ছে ক্ষোভ

Advertisement

মুহম্মদ আকবর

মুহম্মদ আকবর

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সংস্কৃতি অঙ্গনে বাড়ছে ক্ষোভ

Advertisement

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৯৪টি সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ২৭০ জনকে সরকারি অনুদান দিয়েছে। ১৯৪টি সংগঠনকে মোট এক কোটি ৪৬ লাখ ১৪ হাজার টাকা এবং ২৭০ জনকে ৪৫ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা অনুদান দিয়েছে।

অনুদানের তালিকা ঘেঁটে দেখা গেছে, পুরোনো ও সক্রিয় অনেক নাট্যদল কম আবার নিষ্ক্রিয় দলকে বেশি দেওয়া হয়েছে। আবার কোনো কোনো নাট্যদল, আবৃত্তি সংগঠন ও গানের দলকে অনুদানই দেওয়া হয়নি। জেলা পর্যায়ের সমৃদ্ধ অনেক সংগঠনকে অনুদান দেওয়া হয়নি। ব্যক্তির অনুদান নিয়ে এখনো প্রশ্ন না উঠলেও সাংস্কৃতিক দলগুলোর অনুদান দিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আড্ডায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রিত জাতীয় অনুদান কমিটি ও শিল্পকলা একাডেমি নিয়ন্ত্রিত যাছাই-বাছাই কমিটির কার্যক্রম ও তাদের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।

অবশ্য অনুদান কমিটিতে থাকা একাধিক সদস্যের ভাষ্য, পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংস্কৃতি অঙ্গনে দেওয়া সরকারি অনুদানের তালিকা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ১২ লাখ ৭৫ হাজার, বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা ১২ লাখ ৩৫ হাজার, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার ৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছে। এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ (আইটিআই) ১ লাখ ৫০ হাজার, নাট্য সংগঠন আরণ্যকসহ ৬২ সাংস্কৃতিক সংগঠন ৩৬ হাজার ৫০০, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসহ ১৫টি সংগঠন ৪০ হাজার, দেশ নাটক, স্বপ্নদল, বাংলাদেশ থিয়েটার, নাট্যতীর্থসহ ৯টি নাটকের দলকে ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা পদাতিকসহ ৯টিকে ৫৯ হাজার, থিয়েটার আর্ট ইউনিট, জাগো আর্ট সেন্টারসহ ৩৭টি সংগঠনকে ৬৯ হাজার, ঢাকা পদাতিকসহ ২টি দলকে ৯৯ হাজার, ৫টি দলকে ৯৪ হাজার, ৫টিকে ৮০ হাজার, ৭টিকে ৭৯ হাজার, ১০টিকে ৮৯ হাজার টাকা করে অনুদান দিয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। এছাড়াও নানা ক্যাটাগরিতে নাটক, গান, নাচ, আবৃত্তি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতীতের মতোই ছায়ানট সরকারি অনুদানের জন্য কোনো আবেদন করেনি। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, থিয়েটার, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় থেকে সরকারি অনুদানের জন্য এ বছর আবেদন করেনি। অন্যদিকে বাংলাদেশ গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, মিরপুর সাংস্কৃতিক একাডেমি, বর্ষা উৎসব উদযাপন পরিষদ, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, উজান, পঞ্চভাস্কর, মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়, উঠোন, ভোরের পাখি নৃত্যকলা কেন্দ্র, নৃত্যাঙ্গন, দৃশ্যকাব্য, ঝংকার ললিতকলা একাডেমি, আদি ঢাকা সাংস্কৃতিক জোট, রংধনু শিল্পী সংঘ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, স্বাত্বিক নাট্যসম্প্রদায় এবং কাব্য বর্ষণ আবেদন করেও অনুদান পায়নি।

মহাকাল নাট্যসম্প্রদায় থেকে জানানো হয়েছে, তারা আবেদন করেছেন সে তথ্যও আছে কিন্তু অনুদান দেওয়া হয়নি। সুবচন নাট্যসংসদ গত দুই বছর নাট্য প্রদর্শনী করতে পারেনি, সে কারণে তারা আবেদন করেনি। আবেদন করেও পায়নি সময় নাট্যদল।

অনুদানে বিতর্ক ও যুক্তি : ৪৬টি নাট্যদলকে অনুদান দেওয়া হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের আওতাভুক্ত নাটকের দলের সংখ্যা ৩ শতাধিক। এর বাইরেও অনেক নাটকের দল রয়েছে। যদিও অনুদানবিষয়ক জাতীয় কমিটি থেকে জানানো হয়েছে-অনুদান পাওয়ার শর্ত অনুযায়ী সংগঠনগুলোকে ব্যাংক হিসাব ও নিরীক্ষাসংক্রান্ত (অডিট) পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। কিন্তু অনেক সংগঠন তা যথাযথভাবে দেয় না। নিয়ম না মানলে আবেদন বাতিল হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার রাজনৈতিক দলের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন অনুদান পাওয়ার যোগ্য নয়। বিএনপির জাসাস ও জামায়াতের সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর নাম দেওয়া হয়েছিল, যা পরে বাদ পড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা অঞ্চলের সাংস্কৃতিক সংগঠন যাছাই-বাছাই করার জন্য শিল্পকলা একাডেমি থেকে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়। সেই কমিটিতে ছিলেন সঙ্গীতশিল্পী খুরশিদ আলম, নৃত্যশিল্পী আব্দুর রশিদ স্বপন, কবি ও কথাসাহিত্যিক শাহাবুদ্দিন নাগরী, চিত্রশিল্পী অধ্যাপক এ এ এম কাওসার হাসান, ফটোগ্রাফার খন্দকার তানভির মুরাদ, চলচ্চিত্র ও টিভি অভিনয়শিল্পী এ বি এম সোহেল রশীদ, চলচ্চিত্রকার বদিউল আলম খোকন ও নিউ মিডিয়ার জিহান কবির। 

থিয়েটারের পক্ষ থেকে খন্দকার শাহ আলম শিল্পকলা একাডেমির বাছাই কমিটিতে ছিলেন। জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, দলীয় বা অন্য কোনো বিবেচনায় যেন কেউ বাদ না পড়ে আমরা সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছি। বর্তমান সরকারও এ জায়গাটিতে রাজনীতিকরণ করতে চায় না, আমরাও চাই না। তবে এখানে অসঙ্গতি হলো অনুদানবিষয়ক যাছাই-বাছাই কমিটি বা জাতীয় অনুদান কমিটি। জাতীয় অনুদান কমিটিতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ডিজি, শিল্পকলা একাডেমির ডিজি, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ বেতার, এফডিসির এমডি, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইনান্সকে রাখা হয়। তারা সংস্কৃতি অঙ্গনের কজনকে চেনেন? এসব কমিটি পুনর্গঠনের প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সূত্র জানায়, এই কমিটি থেকে অনেকের নাম বাদ দেওয়া হয়। বাদ পড়ে যাওয়া অনেকের নাম জাতীয় কমিটিতে যুক্ত করা হয়। যদিও জাতীয় কমিটিতে সংস্কৃতি অঙ্গনের তুলনায় সরকারি কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন হয় বলে জানা গেছে।

জাতীয় অনুদান কমিটির সদস্য কামাল বায়েজিদ জানান, এমন অনেকের দল অনুদান পায়নি যাতে তিনি নিজেও বিব্রত। কিন্তু তার করার কিছু ছিল না। আরণ্যকের অনুদান কম দিয়ে ছোট দলগুলোকে বেশি দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আগে থেকেই একটা প্রথা আছে (মৌখিক) প্রথমবার যারা আবেদন করবে তারা ন্যূনতম অনুদান পাবে। কেউ যদি একবার আবেদন না করে পরেরবার তারা প্রথমবারের ক্যাটাগরিতে পড়বে। সেই বিবেচনায় আরণ্যক কম পেয়েছে। যথারীতি আগামীবার বেশি পাবে।

নাট্যসংগঠন বটতলার আলী হায়দার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, এমন অনেকে অনুদান পেয়েছেন যাদের দলে গত ১ বছরে কাজ ছিল না। এমন বৈষম্যে তিনি হতাশা ব্যক্ত করেন।

অনুদান পায়নি নাট্যকার ও নাট্যনির্দেশক অলোক বসুর দল থিয়েটার ফ্যাক্টরি। অলোক বসু তার ফেসবুকে লিখেছেন এমন বৈষম্যের অবসান চান। অনুদান বরাদ্দ কমিটির কাছে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কথা বলেন। তার ভাষ্য, ভুল হতে পারে কিন্তু ভুল আঁকড়ে থাকা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করাটা কখনোই মঙ্গল বয়ে আনে না।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম