রাজশাহীতে সিন্ডিকেটের থাবা
বালুর দাম দ্বিগুণ, থমকে গেছে উন্নয়ন কাজ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহী অঞ্চলে বালু ব্যবসায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বালুর দাম দ্বিগুণ করা হয়েছে। এর ফলে নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। স্থবির হয়ে পড়েছে সরকারি উন্নয়ন কাজ ও আবাসন শিল্প। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ ও দাম নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীরা।
নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাত্র একটি মহাল থেকে বালু সরবরাহ করা হয়। এই সুযোগে সিন্ডিকেটটি ইচ্ছেমতো দাম বাড়ানোর পাশাপাশি ২০ লাখ সেফটি বালু মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। বালুর দাম বৃদ্ধির ফলে নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশ। প্রশাসন দাম নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে উন্নয়নকাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাগঞ্জে বালু সরবরাহ করে হক এন্টারপ্রাইজ। সম্প্রতি জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলির বালু মহালটি ইজারা পায় প্রতিষ্ঠানটি। এর স্বত্বাধিকারী কাটাখালী পৌরসভার শ্যামপুর মৌলভীপাড়ার বাসিন্দা রাজু আহমেদ মামুন।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নবনির্বাচিত পরিচালক ব্যবসায়ী রেজাউল করিম বলেন, ছয় মাস আগেও ৭৫০ সেফটি ১০ চাকার এক ট্রাক বালুর দাম ছিল ছয় হাজার টাকা। এপ্রিলের মাঝামাঝি হক এন্টারপ্রাইজ প্রেমতলির বালুমহালটি ইজারা পাওয়ার পর বালুর দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে। সবশেষ ৪ জুন ৭৫০ সেফটি এক ট্রাক বালুর দাম ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। বর্তমানে রাজশাহী সিটি করপোরেশন, গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ এবং এলজিইডিতে আমাদের কাজ চলছে। নির্মাণ শিল্পের প্রধান উপকরণ বালু। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে আমরা পথে বসব।
রাজশাহী চেম্বারের আরেক পরিচালক মানহা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাহ মাইনুল হোসেন চৌধুরী শান্ত বলেন, সিটি করপোরেশন ও এলজিইডির সড়কের ১৬ কোটি টাকার আমার দুটি কাজ চলছে। রাস্তার কাজে সবচেয়ে বেশি বালুর প্রয়োজন হয়। দাম বাড়ায় চার দিন আগে কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার গাজী কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী সালাউদ্দিন গাজী বলেন, নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কারণে এবার মহানগরীর উপকণ্ঠে শ্যামপুর বালুমহালটি ইজারা দেয়নি জেলা প্রশাসন। গত বছর এ বালুমহালটিরও ইজারাদার ছিল হক এন্টারপ্রাইজের মালিক মামুন। তিনি ও তার সহযোগীরা ২০ লাখ সেফটি বালু আগে থেকেই মজুত করেন। আর এ বছর তারা প্রেমতলি বালুমহালটিও ইজারা পান। ফলে তাদের হাতে এখন একচেটিয়া বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ। মজুত করা ও বর্তমানে পদ্মা থেকে উত্তোলন করা বালুর মাধ্যমে তারা তিন মাসে অন্তত অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
আরেক ঠিকাদার মাইসা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ইয়াহিয়া খান মিলু বলেন, শতাধিক ঠিকাদার রাজশাহী মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বহুতল ভবন ও রাস্তাসহ নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত। ইতোমধ্যে অনেকেই কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, প্রশাসন বালুর দাম নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে কাজ বন্ধ করে দেব।
বালুর অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি বরাবর আবেদন করেছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন রাজশাহীর (রেডা) সাধারণ সম্পাদক আ.স.ম মিজানুর রহমান কাজী। তিনি যুগান্তরকে বলেন, বালুর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্মাণকাজ থমকে গেছে। আমরা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ লোকসানের আশঙ্কা করছি।
রাজশাহী চেম্বারের একটি প্রতিনিধিদল রোববার দুপুরে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। চেম্বারের সিনিয়র সহসভাপতি শামসুর রহমান শান্তন বলেন, আমরা পুলিশ কমিশনারকে বালুর অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির বিষয়টি অবহিত করেছি। তিনি বিভাগীয় কমিশনার, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, আরডিএর চেয়ারম্যান এবং জেলা প্রশাসককে লিখিতভাবে জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন। সোমবার (আজ) আবেদন জানাব।
এ বিষয়ে জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি, রাজশাহীর সদস্য সচিব আরডিসি অভিজিত সরকার বলেন, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০২৫ অনুযায়ী ইজারামূল্য নির্ধারণের বিষয়ে উল্লেখ থাকলেও বালুর দাম নির্ধারণের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। তবে ইজারাদার যদি অতিরিক্ত মূল্য আরোপ করেন এবং এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে ইজারাদার মামুনকে বেশ কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। তবে তার ব্যবসায়িক পার্টনার রমজান আলী যুগান্তরকে বলেন, আমাদের ড্রেজিং খরচ সেফটি প্রতি পাঁচ টাকা। আনুষঙ্গিক খরচও বেড়েছে। নদীতে পানি উঠে গেছে। চাহিদা অনুযায়ী বালু উত্তোলন সম্ভব হচ্ছে না। আর ভালোমানের বালু হওয়ায় দাম একটু বেশি। তিনি বলেন, শ্যামপুরে বালুর মজুত শেষ। সিন্ডিকেট কিংবা একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দাম বৃদ্ধির অভিযোগটি ভিত্তিহীন।

