Logo
Logo
×
   

Advertisement

নগর-মহানগর

তামাক নিয়ন্ত্রণে দ্বিমুখী নীতি

বাজেটে নিকোটিন পাউচের সম্পূরক শুল্ক কমানো হয়েছে

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

সরকারের দ্বিমুখী নীতির কারণে তামাক নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আদায়-দুটোই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে একদিকে প্রতিবছর বাজেটে বিড়ি-সিগারেট, জর্দা-গুলের সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে নিকোটিন পাউচ, ই-সিগারেটের শুল্ক কমানো হচ্ছে, যা তরুণ-কিশোরদের কাছে আরও সহজলভ্য করে তুলবে। পাশাপাশি মোটা অঙ্কের রাজস্ব হারাবে সরকার। বিশ্বের অন্তত ৪৭টি দেশ বহুমাত্রিক ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে ইতোমধ্যেই নিকোটিন পাউচ, ই-সিগারেট, ভেপ নিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করছে।

টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। একই সঙ্গে প্রায় ৪ লাখ মানুষ তামাকজনিত অসুস্থতায় স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বা কর্মক্ষমতা হারান। পরোক্ষ ধূমপানের কারণেও প্রতিবছর প্রায় ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু এবং প্রায় ৬১ হাজার শিশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাজেটে প্রতি ১০ গ্রাম নিকোটিন পাউচের মূল্য ধরা হয়েছে ৫০০ টাকা, যা বর্তমান বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক কম। তাছাড়া পাউচের প্রস্তাবিত সম্পূরক শুল্কের হার ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে চূড়ান্ত বাজেটে ৩৫ শতাংশ করা হয়েছে। একইভাবে প্রতি ১০ শলাকা হিটেড টোব্যাকোর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ২১০ টাকা। অথচ বাজারে প্রতিটি হিটেড টোব্যাকো/ই-সিগারেট/ভেপের মূল্য ৫০০ টাকা বা তার চেয়ে বেশি। পক্ষান্তরে সব স্তরের সিগারেটের সম্পূরক শুল্ক ৬৭ শতাংশ, জর্দা-গুলের শুল্ক ৫৫ শতাংশ, হাতে তৈরি বিড়ির ৩০ শতাংশ এবং মেশিনে তৈরি বিড়ির ৪০ শতাংশ ধরা হয়েছে।

অন্যদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেট ফিল্টার এবং ফিল্টার তৈরির উপকরণ অ্যাসিটেট টু/সেলুলোজ অ্যাসিটেট আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক ৩০০ শতাংশ করা হয়েছিল। কিন্তু সংশোধিত অর্থবিলে সেটা ১০ ভাগের এক ভাগ, অর্থাৎ ৩০ শতাংশ করা হয়েছে! অন্যদিকে নিকোটিন পাউচ তৈরির কাঁচামাল নিকোটিন গ্রানিউলস আমদানিতে ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রস্তাব করা হলেও সেটা কমিয়ে ৬০ শতাংশ করা হয়েছে, যা প্রস্তাবিত মূল্যের ছয় ভাগের এক ভাগ মাত্র।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার নারায়ণগঞ্জে ফিলিপ মরিচ নামের বহুজাতিক একটি কোম্পানি নিকোটিন পাউচ উৎপাদন করতে কারখানা স্থাপনের অনুমোদন দেয়, যা নিয়ে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো তীব্র আপত্তি তোলে। কারখানা স্থাপনে ৫৮ লাখ ২০ হাজার ডলার প্রাথমিক বিনিয়োগের কথা রয়েছে। এ কারখানা থেকে বছরে ৫৩ কোটি ৬০ লাখের বেশি নিকোটিন পাউচ উৎপাদন হবে। যার বাজার হবে বাংলাদেশ।

প্রসঙ্গত, নিকোটিন পাউচ ও নিকোটিন গ্র্যানুলস হলো মুখে ব্যবহারের জন্য তৈরি ছোট টি-ব্যাগের মতো দেখতে এক ধরনের পণ্য, যার ভেতরে রাসায়নিক মিশ্রিত নিকোটিন, সুগন্ধি ও অন্যান্য উপকরণ থাকে। সাধারণত এগুলো মাড়ি ও ঠোঁটের মাঝখানে রাখা হয়।

তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো বলছে, বিশ্বে অনেক দেশ নিকোটিন পাউচ, ই-সিগারেট, ভেপ নিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করছে। বহুমাত্রিক ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে ইতোমধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইরান, ইরাক, ওমান, কাতারসহ বিশ্বের মোট ৪৭টি দেশে এসব পণ্য বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যও ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করেছে এবং অন্য অনেক দেশ নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিচ্ছে। অথচ উলটো পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। বাজেটে নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকোর মূল্য নির্ধারণ এবং কর আরোপের মাধ্যমে পণ্যগুলোকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে, যা তরুণ প্রজন্মকে নতুন নেশার ফাঁদে ফেলবে।

সোমবার এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) বলছে, সরকার তামাক কোম্পানির পাতা ফাঁদে পা দিয়েছে। নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকোর মতো নতুন ধরনের তামাকজাত দ্রব্য সস্তায় বিক্রির অনুমতি দিয়ে সরকার নিকোটিন নির্ভরতার এক নতুন প্রজন্ম তৈরি করতে চায়। সরকারের এই সিদ্ধান্তে দেশের কোটি কোটি শিশু-কিশোর-তরুণ তথা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নতুন নেশার ফাঁদে আটকে পড়বে যা সার্বিক জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আমদানিতেও অনিয়ম : ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি আমদানিনীতি সংশোধনের মাধ্যমে ই-সিগারেট, ইলেকট্রনিক্স নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম সংশ্লিষ্ট সব পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অথচ ওই বছরের ৪ জুন ঢাকা কাস্টমস দিয়ে হিটেড টোব্যাকো আমদানির একটি বিল অব এন্ট্রির কপি ও আমদানিকৃত পণ্যের নমুনা যুগান্তরের হাতে এসেছে। বিল অব এন্ট্রি (সি-৫৪৯২৫৭) পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ফিলিপ মরিস বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া থেকে কাতার এয়ারওয়েজের মাধ্যমে ৩টি ফ্লেভারের ১৫৯ কেজি হিটেড টোব্যাকো আমদানি করেছে। এ পণ্যটি দেখতে অবিকল সিগারেটের মতো হলেও শুল্কায়ন করা হয়েছে ই-সিগারেট সিস্টেমের উপকরণ হিসাবে। যার চূড়ান্ত করভার ২৯৭ শতাংশ। অন্যদিকে সিগারেটের চূড়ান্ত করভার ৬১০ শতাংশ। তাছাড়া এসব পণ্য বাজারে বিক্রির সময় প্রচলিত আইন মানা হয়নি। তামাকযুক্ত সিগারেটের স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল ব্যবহার বিধিমালার ৭ ধারায় বলা আছে, স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল লাগানো অবস্থায় সিগারেট আমদানি হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে শুল্ক আদায়কারী কর্তৃপক্ষ চালানের শুল্কায়ন করবেন। পাশাপাশি নিরূপিত কর বাবদ প্রদেয় অর্থ থেকে স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল কেনার সময় দেওয়া অর্থ সমন্বয় করে অবশিষ্ট কর বাবদ প্রাপ্য রাজস্ব আদায়ক্রমে সিগারেটের চালান খালাস করা যাবে।

প্রসঙ্গত, সিগারেটের প্যাকেটে স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল লাগানো হয় স্থানীয় পর্যায়ে রাজস্ব আদায় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। বাংলাদেশের উৎপাদিত সিগারেটের স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল লাগানো বাধ্যতামূলক।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম