খুলনার ‘শেখ বাড়ি’
ক্ষমতার প্রাসাদে আজ শ্মশানের নীরবতা
রক্তাক্ত জুলাই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘আসিয়াছে জুলাই, খুনি হাসিনারে দেশে আন, ফাঁসিতে ঝুলাই’-খুলনার শেরেবাংলা রোডের ‘শেখ বাড়ি’র ভগ্ন দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে এমনই স্লোগান। একসময় এ বাড়ির নাম উচ্চারিত হতো ভয়ে। সিসি ক্যামেরা, সশস্ত্র পাহারা আর ভিআইপিদের পদচারণায় গমগম করত। পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনীতি, অর্থনীতি ও টেন্ডার-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রিত হতো যে বাড়ি থেকে, সেই প্রাসাদ আজ ধ্বংসের কঙ্কাল। ভেতরে জন্মেছে পরগাছা, বাসা বেঁধেছে সাপ-পোকামাকড়।
স্থানীয়রা জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ভবনের ইট, রড, জানালার গ্রিল, টাইলস থেকে শুরু করে ভেতরের যাবতীয় মূল্যবান জিনিসপত্র ক্ষুব্ধ জনতা পর্যায়ক্রমে খুলে নিয়ে গেছে। কিছু ইট ছাড়া ভবনের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এখন রাতে পথচারীরা এখানে মলমূত্র ত্যাগ করেন। অহংকার আর ক্ষমতার দম্ভ চূর্ণ হওয়ার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটি।
জানা যায়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাঁচ চাচাতো ভাই-সাবেক এমপি শেখ হেলাল উদ্দিন, শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল, বিসিবির সাবেক পরিচালক শেখ সোহেল, শেখ রুবেল ও শেখ বেলালের যৌথ বাসভবন ছিল এটি। স্বয়ং শেখ হাসিনাও একাধিকবার এই ভবনে অবস্থান করেছেন। শেখ বাড়ির পাশের এক মুদি দোকানদার বলেন, ষোলো বছর ধরে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কত ক্ষমতার দাপট দেখেছি তা বলে শেষ করা যাবে না। মধ্যরাত পর্যন্ত এই রাস্তায় বড় বড় নেতা আর পুলিশের দামি গাড়ির বহর লেগে থাকত। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলারও সুযোগ ছিল না। সিভিল ড্রেসে গোয়েন্দারা নজর রাখত। অথচ আজ দেখেন, সেই ঝলমলে প্রাসাদ এখন আস্তাকুঁড়। ক্ষমতার পতন যে এত করুণ হতে পারে, তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। এখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসে শুধু ক্ষমতার এই পরিণতি দেখতে।
পাশের এক চা দোকানদার বলেন, এই সড়ক দিয়ে একসময় সাধারণ মানুষ হাঁটতেও ভয় পেত। শেখ বাড়ির কড়া হুকুম আর দাপটে পুরো এলাকার ছোট-বড় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সবাই একধরনের জিম্মি অবস্থায় ছিল। কিন্তু ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। বাড়িটির বেশির ভাগ ইট, রড, টাইলস যে যেভাবে পেরেছে খুলে নিয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতি এমন যে, রাতে মানুষ এখানে গাড়ি বা ভ্যান থামায়, পথচারীরা প্রস্রাব করে। কেউ কেউ ডাস্টবিনের মতো ব্যবহার করে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট শেখ বাড়িতে প্রথম দফায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরে ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার একটি বিতর্কিত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা আবারও বাড়িতে হামলা করে। বুলডোজার এনে অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেয়। সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বাড়িটিকে কে বা কারা গোপনে পুনরায় প্রাচীর ঘিরে টিনশেড দিয়ে সংস্কারের চেষ্টা করেছিল। তবে বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে এলে দ্রুত সেই টিনশেড উচ্ছেদ করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মী যুগান্তরকে বলেন, শেখ বাড়ি ছিল খুলনাবাসীর জন্য এক আতঙ্ক এবং নানা অনিয়মের আখড়া। প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ-সবাই এই বাড়ির হুকুমে চলতে বাধ্য হতো। ছাত্র-জনতার ক্ষোভের আগুনে সেই বৈষম্যের কেন্দ্রবিন্দু আজ ছাই হয়ে গেছে। খুলনার মানুষ আর কখনো কোনো ‘শেখ বাড়ি’ বা কোনো গডফাদারের সাম্রাজ্য ফিরে আসতে দেবে না।

