Logo
Logo
×
   

নগর-মহানগর

খুলনা মহিলা অধিদপ্তরে বাড়ছে অভিযোগ

মাদক জুয়া যৌতুকে ভাঙছে একের পর এক সংসার

অধিকাংশ ঘটনায় স্বামী মাদকাসক্ত * ম্যাজিস্ট্রেট সংকটে ব্যাহত সেবা

নূর ইসলাম রকি

নূর ইসলাম রকি

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মাদক জুয়া যৌতুকে ভাঙছে একের পর এক সংসার

মাদক, জুয়া ও যৌতুকের ছোবলে খুলনা অঞ্চলে প্রতিনিয়ত ভেঙে পড়ছে একের পর এক সংসার। মাদকাসক্ত স্বামীর মারধর কিংবা যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূ নির্যাতনের ঘটনা এখন নিত্যদিনের চিত্র। এসব ঘটনার সুষ্ঠু প্রতিকার ও আইনি পরামর্শ নিতে খুলনা বিভাগের মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের অধীন ‘মহিলা সহায়তা কর্মসূচি’ কার্যালয়ে ভিড় করছেন বিভিন্ন জেলার ভুক্তভোগী নারী। অনেকেই ভেঙে যাওয়া সংসার জোড়া লাগাতে ঘুরছেন দিনের পর দিন।

দপ্তরটির হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, খুলনা ও এর আশপাশের জেলাগুলো থেকে প্রতিনিয়ত আসছে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ। ২০২৪ সালে এ দপ্তরে ১১৮টি এবং ২০২৫ সালে ১৩৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। আর চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসেই অভিযোগের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬১টিতে। তবে ভুক্তভোগীদের সহায়তায় কার্যালয়টি কাজ করে গেলেও দীর্ঘদিন ধরে চরম লোকবল ও অবকাঠামোগত সংকটে ধুঁকছে খুলনা বিভাগীয় এ কার্যালয়টি।

সম্প্রতি সংস্থাটিতে অভিযোগ জানাতে আসা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বললে বেরিয়ে আসে তাদের জীবনের করুণ গল্প। নগরীর খান জাহান আলী থানা এলাকার এক ভুক্তভোগী গৃহবধূ টুকটুকি (ছদ্ম নাম)। ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি জানান, চার বছর আগে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পরই তিনি জানতে পারেন স্বামী মাদকাসক্ত। ঘরে বসে প্রকাশ্যেই মাদক সেবন করেন। প্রতিবাদ করলেই জোটে অমানসিক শারীরিক নির্যাতন। কোনো সংসার খরচ না পেয়ে বাধ্য হয়ে কোলে সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার অপর এক নারী আক্ষেপ করে জানান, মাদক ও যৌতুকের জেরে ইতোমধ্যে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে। তবে বিচ্ছেদের পরও আইন অনুযায়ী দেনমোহর কিংবা সন্তানের ভরণপোষণ দিচ্ছেন না সাবেক স্বামী। অবুঝ সন্তানের ভবিষ্যৎ ও ন্যায়বিচারের আশায় বাধ্য হয়ে তিনি এই দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

রূপসা এলাকার এক গৃহবধূ জানান, ‘যৌতুক ও নির্যাতনের অভিযোগে তার স্বামীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন। এখন তার স্বামীকে নোটিশ করা হয়েছে খুব দ্রুত সালিশ হবে। আমি শুনেছি, এখানে এলে সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা হয়। সন্তানের কোনো খরচ না দিয়ে উলটো তাকে ঘরছাড়া করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বাধ্য হয়ে তিনি এখানে আইনি সহায়তার জন্য এসেছেন।’ ভুক্তভোগীদের তথ্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা এই সামাজিক ব্যাধির শিকার হচ্ছেন। কিন্তু জনবল সংকটে নির্যাতিত এসব নারীর সহায়তায় কার্যকরভাবে এগিয়ে আসতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় ১০ বছর ধরে বিভাগীয় এই অফিসে কোনো স্থায়ী ম্যাজিস্ট্রেট নেই। ফলে দ্রুত আইনি সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণে চরম বিলম্ব হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশের কার্যকর সহযোগিতার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কার্যালয়টির অধীনে ৩০ জন অসহায় ও নির্যাতিত গৃহবধূ এবং তাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ আবাসিক সুবিধা রয়েছে। তবে সরেজমিন বর্তমানে সেখানে কোনো নিবাসী পাওয়া যায়নি। এর মূল কারণ হিসাবে জানা গেছে, চরম খাদ্য সংকট। সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তিন বেলা খাবারের জন্য বরাদ্দ মাত্র ১০০ টাকা! বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে যা একপ্রকার উপহাসের শামিল। তবে এই বরাদ্দ বাড়াতে সদর দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি দুজন ভুক্তভোগী এখানে ছিল। তারাও চলে গেছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

খুলনা বিভাগীয় মহিলা সহায়তা কর্মসূচির আইন কর্মকর্তা সন্ধ্যা গাইন যুগান্তরকে বলেন, যৌতুক, শারীরিক নির্যাতন ও ভরণপোষণ না দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে গৃহবধূরা আসেন। বেশিরভাগ ঘটনাই আপসের মাধ্যমে সমাধান করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক মো. আজগর আলী খান জানান, খুলনা মহানগরী ও তেরখাদাসহ পার্শ্ববর্তী বাগেরহাট এবং নড়াইল জেলা থেকে বর্তমানে বেশি অভিযোগ আসছে। প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে উঠতে পারলে সেবা প্রদান আরও গতিশীল হবে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .