Logo
Logo
×
   

নগর-মহানগর

বরগুনায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার ফাঁদ

দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে জালিয়াতচক্র

Icon

তরিকুল ইসলাম রতন, বরগুনা

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে জালিয়াতচক্র

বরগুনার বামনা উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা বানানোর নামে দুই কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়া এবং গেজেট বাতিল হওয়ার পরও সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার এক ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র সামনে এসেছে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়া এবং গেজেট বাতিল হওয়া ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা এখনো বহাল তবিয়তে নিচ্ছেন সরকারি ভাতা, ‘বীর নিবাস’ আবাসন সুবিধা এবং ব্যাংক ঋণ।

স্থানীয় সূত্রের তথ্য ও অনুসন্ধানে জানা যায়, বামনার সাবেক ডেপুটি কমান্ডার তোফায়েল আহমেদ (যার নিজের গেজেটও বিতর্কিত ও বাতিল প্রক্রিয়াধীন), সাবেক জেলা কমান্ডার আব্দুর রশিদ মিয়া এবং শফিকুল ইসলাম জাফর মিয়ার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে ওঠে। তারা তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত ও গেজেট প্রকাশের প্রলোভন দেখিয়ে ২২ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছেন।

তাছাড়া জালিয়াতির মাধ্যমে নিজ পরিবারের সদস্যদেরও এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সাবেক ডেপুটি কমান্ডার তোফায়েল আহমেদ নিজের ভাই গোলাম রাব্বানী তারা মেম্বারকে (গেজেট নম্বর-৭৭০) বয়স বাড়িয়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছেন। যদিও পরবর্তী সময়ে জাতীয় যাচাই-বাছাইয়ে গোলাম রাব্বানী তারা মেম্বারের ছেলে সোহেল আহমেদ এবং বুকাবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক শাহজাহান মাস্টারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে ও গেজেট বাতিল হয়।

মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বামনা উপজেলা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বাতিল হওয়া ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রকাশ্যে টানানো হয়নি। ফলে গেজেট বাতিল হওয়া সত্ত্বেও অসাধু প্রক্রিয়ায় এখনো তারা সরকারি সব সুবিধা ভোগ করে যাচ্ছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোলাম রাব্বানী তারা মেম্বার (গেজেট নং-৭৭০) সরকারি ‘বীর নিবাস’ হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ১০ লাখ টাকার লোন সুবিধা ও ভাতা ভোগ করছেন। কামরুল ইসলাম নিজাম মৃধা (গেজেট নং-৭২৬) যাচাইয়ে বাদ পড়ার পরও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বীর নিবাস ও ১০ লাখ টাকার সরকারি সুবিধা হাতিয়ে নেন। ছোনবুনিয়ার শহীদ মাস্টার, উত্তর কাকচিড়ার নেছার উদ্দিন, সাবেক ইউপি সদস্য মনজুরুল আহসান, জাফ্রাখালির শাহজাহান, গোলাম কিবরিয়া বাচ্চু এবং সাবেক উপজেলা কমান্ডার জয়নাল আবেদীনের নামও এই তালিকায় রয়েছে।

প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ হোসেন বলেন, আজ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের কারণে আমাদের সম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এই অসাধু চক্র কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে জাল সনদে সন্তানদের সরকারি চাকরি ও যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছে। মারা যাওয়ার আগে এই অনিয়মের সুষ্ঠু বিচার এবং ভুয়াদের মুখোশ উন্মোচন দেখে যেতে চাই।

সরকারি আদেশ অমান্য করে গেজেট বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা গোপন রাখা এবং তাদের ভাতা অব্যাহত থাকার পেছনে স্থানীয় প্রশাসনের একাংশের গাফিলতি রয়েছে বলে মনে করছে সচেতন মহল। বামনাবাসী ও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা অবিলম্বে এই ২২ জনসহ সব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার নাম প্রকাশ, তাদের গৃহীত সব সরকারি অর্থ ও ঋণ ফেরত আনা এবং এই জালিয়াতি চক্রের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।

বামনা উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা সেলিম সর্দার যুগান্তরকে জানান, গত সরকারের আমলে একটি সার্কুলার অনুযায়ী তারা ২২ জন মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য যেনতেনভাবে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যাটাই-বাছাইয়ে তারা একজনও টেকেননি। ওই যাচাই-বাছাই কমিটিতে আমাকে সভাপতি করেছিল। তখন আমি একটি মিটিং করে দেখলাম ওখানে একজনও মুক্তিযোদ্ধা না। পরে আমি পদত্যাগ করে চলে আসি। কারণ, আমি একজন যুদ্ধকালীন কমান্ডার। পরে তারা আবার নতুন করে জেলা থেকে সভাপতি ও সদস্য সচিবের অ্যাপয়েনমেন্ট নিয়ে এসব করছে। আমি তাদের বারবার নিষেধ করেছি, তোমারা এসবের ভেতর যেয়ো না; কিন্তু তারা তা শোনেনি।

বরগুনা জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার যুগান্তরকে জানান, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তাছাড়া সরকার যখন নির্দেশনা দেবে, তখন তদন্ত করে পুনরায় আমরা যাচাই-বাছাই করব। যখন যাচাই-বাছাই হয়েছে, তখন আমি ছিলাম না।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .