Logo
Logo
×
   

Advertisement

নগর-মহানগর

কাদের-পলকের কথোপকথনের রেকর্ড ট্রাইব্যুনালে

‘ইন্টারনেট স্লো করে দাও’

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ভিডিও মোবাইলে ধারণ করা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন দিতে না পারে সে জন্য ইন্টারনেট সেবা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। এর অংশ হিসাবে প্রথমেই ইন্টারনেট ধীরগতি করার নির্দেশ দেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এটি করার জন্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমতি নেওয়ার কথা জানান সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। তখন কাদের বলেন, উনাকে (শেখ হাসিনা) জিজ্ঞেস করেই ইন্টারনেট স্লো করে দেও...। জুলাই গণহত্যার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসাবে কাদের-পলকের এমন একটি ফোনালাপ রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।

এদিকে ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের ফোনালাপের প্রমাণও। এতে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও। কথোপকথনে চট্টগ্রামের মুরাদপুরে নিহত একজনকে নিজেদের লোক দাবি করে জানাজা দিয়ে ‘ইস্যু’ করার নির্দেশ দেওয়ার কথা উঠে এসেছে। এছাড়া, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুমের মামলায় বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। প্রসিকিউশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

ইন্টারনেটটা একটু স্লো করে দাও : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার যুক্তিতর্কে এ তথ্য উল্লেখ করেছেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। রোববার তৃতীয় দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন গাজী মোনাওয়ার। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এই যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন-বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। যুক্তিতর্কের প্রথম দিকে ওবায়দুল কাদের ও পলকের একটি কথোপকথন বাজিয়ে শোনানো হয় ট্রাইব্যুনালে। সেখানে ওবায়দুল কাদেরকে বলতে শোনা যায়, ‘ইন্টারনেটটা একটু স্লো করে দাও।’ জবাবে পলক বলেন, ‘একটু নেত্রীর পারমিশনটা নিয়ে নিই?’ তখন ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘নিয়ে নাও।’ পলক বলেন, ‘বলা আছে তো যে উনি না বললে...।’ এরপর উনাকে (শেখ হাসিনা) জিজ্ঞাসা করেই ইন্টারনেট স্লো করতে বলেন ওবায়দুল কাদের।

ওবায়দুল কাদের ও পলকের ফোনে কথোপকথন শুধু আলাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বলে ট্রাইব্যুনালে উল্লেখ করেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার। তিনি বলেন, তারা ডকুমেন্টারি এভিডেন্স (প্রামাণ্য নথি) দিয়ে এটি প্রমাণ করেছেন।

বিটিআরসির সেই নথিতে উল্লেখ আছে, ‘ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, জুনাইদ আহমেদ পলকের মৌখিক নির্দেশনায় বিটিআরসি হতে ইন্টারনেট সার্ভিস বন্ধ/সীমিতকরণসংক্রান্ত কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। ইন্টারনেট সার্ভিস বন্ধ/সীমিতকরণের পদক্ষেপগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে কার্যকর করা হয় মর্মে বিটিআরসিকে প্রতিমন্ত্রী অবহিত করেন।’

সেই নথির গৃহীত পদক্ষেপের তালিকায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা ৩৯ মিনিটে দেশের ৫৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও ৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে (মোট ৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে) মোট ১ হাজার ১৫৩টি সাইটে থ্রি-জি ও ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। সার্বিক বিষয় বিবেচনায় উল্লিখিত নেটওয়ার্ক বন্ধবিষয়ক কার্যক্রমের ভূতাপেক্ষ অনুমোদনের লক্ষ্যে নথি উপস্থাপন করা হয়। সেখানে বিটিআরসির মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সবার সই ছিল।

ওবায়দুল কাদের ছাড়া এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন-আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ। মামলার সব আসামিই পলাতক আছেন।

আমাদের লোকটার জানাজা দিয়ে ইস্যু করো : ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের আরও একটি ফোনালাপ। এতে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও। কথোপকথনে মুরাদপুরে নিহত একজনকে নিজেদের লোক দাবি করে জানাজা দিয়ে ‘ইস্যু’ করার নির্দেশ দেওয়ার কথা উঠে এসেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় এ কল রেকর্ড দাখিল করে প্রসিকিউশন।

রোববার এ মামলায় তৃতীয় দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের তারিখ নির্ধারণ ছিল। এদিন ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে বেশ কয়েকটি কল রেকর্ডের কথোপকথন উপস্থাপনের পাশাপাশি নানক-নাছির ও ওবায়দুল কাদেরের ফোনালাপটিও সামনে আনা হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, জহিরুল আমিন, সহিদুল ইসলাম সরদার, সুলতান মাহমুদ ও মার্জিনা রায়হান।

প্রসিকিউশনের দাবি, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র নাছির উদ্দীনকে ফোন করেন নানক। ফোন কলের শুরুতেই ওবায়দুল কাদেরকে কথা বলতে দেওয়া হয়। ফোনকলে চট্টগ্রামে চালানো সহিংসতার খবরাখবর জানান নাছির। একই সঙ্গে মুরাদপুরের তিনজন মারা গেছেন বলেও জানানো হয়। এর মধ্যে একজনকে নিজেদের লোক বলে দাবি করেন তিনি। প্রত্যুত্তরে ফোনের এপার থেকে বলা হয়, জানাজা-টানাজা পড়িয়ে একটা ইস্যু করেন। এমন নির্দেশ পেয়েও কোনো ইস্যু তৈরি করতে পারল না আওয়ামী লীগ। কারণ নিহত ব্যক্তি তাদের দলের কেউ ছিলেন না। ছাত্র-জনতাদেরই একজন। এজন্য তারা আর এ লাশ নিয়ে কোনো কিছু করেননি। ফোনালাপের শুরুতে হইচই থাকায় কথা স্পষ্ট বোঝা যায়নি। তবে কোনো একজনকে ধন্যবাদ দেওয়ার শব্দ শোনা যায়। এর মধ্যেই ওবায়দুল কাদেরের কণ্ঠ ভেসে ওঠে। তিনি আ জ ম নাছিরের উদ্দেশে কথা বলেন। এ মামলায় প্রসিকিউশনের আরও দুদিন যুক্তিতর্ক চলবে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর তামিম। এরপরই শুরু হবে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীদের যুক্তি উপস্থাপন।

ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন-আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। আসামিরা সবাই পলাতক।

বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা সাইফের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা : ২০১২ সালের এপ্রিলে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুমের ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে এ ঘটনায় বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা উইং কমান্ডার সাইফুর রহমান সাইফের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এর পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা চেয়ে আবেদন করে প্রসিকিউশন। আবেদনটি মঞ্জুর করে পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। রোববার বিকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আদেশ দেন। সম্প্রতি নিজ বাসা থেকে এই কর্মকর্তাকে আটক করে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত বিশেষ সামরিক পুলিশ শাখা (প্রভোস্ট)। পরে তাকে বাহিনীর বিশেষ সেলে হেফাজতে রাখা হয়।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম