জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী
ভঙ্গুর এই রাষ্ট্র পুনর্গঠনে এসডিজি ভূমিকা রাখবে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো নির্ধারণবিষয়ক জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে তিনি সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। এ সময় দেশে প্রথমবারের মতো এসডিজি ভিলেজ পাইলট প্রোগ্রামের আওতায় তিনটি গ্রামেরও উদ্বোধন করেন তিনি। পাইলট কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত গ্রামগুলো হলো-দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর, খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী এবং রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিংগাছড়ি।
এসডিজি অর্জনে আগামী পাঁচ বছরের জন্য কৌশলগত কাঠামো নির্ধারণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ সম্মেলনকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসাবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচিত তিন গ্রামের মাধ্যমে এসডিজি ভিলেজ পাইলট কর্মসূচির কার্যক্রম শুরু হলো। তিন দিনের সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো তাদের অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেবে।
প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা বিগত সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ফ্যাসিবাদী শোষণ-শাসন বাংলাদেশকে একটি ঋণ এবং আমদানিনির্ভর ভঙ্গুর রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশসহ সব ক্ষেত্রে ভঙ্গুর এই রাষ্ট্রটি এবার পুনর্গঠনের পালা। দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রাপথে এসডিজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য। তারেক রহমান বলেন, এসডিজির প্রতিপাদ্য ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’-এর সঙ্গে বর্তমান সরকারের ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ নীতির মিল রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯-দফা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং বর্তমানের রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফার সঙ্গে এসডিজির খুব বেশি অমিল নেই। তিনি বলেন, জনগণের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত অর্থনৈতিক কাঠামো বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাকে জাতিসংঘের এসডিজির সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। সরকারের নতুন কাঠামোয় সামাজিক সুরক্ষাকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসাবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কৃষক কার্ড এবং স্বাস্থ্যসেবা সহজ করতে ই-হেলথ কার্ডের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক, স্বল্প আয়ের পরিবার ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি ভর্তুকি, কৃষি উপকরণ, আর্থিক সহায়তা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার কথা জানান তিনি। ক্রীড়া কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের সম্মানি ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারের সহায়তা নেটওয়ার্ক পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে বিস্তৃত করা হচ্ছে। চলতি মেয়াদের মধ্যেই সম্ভাব্য প্রতিটি নাগরিককে সামাজিক সুরক্ষা ও আর্থিক সহায়তার কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণ এবং এসডিজি বাস্তবায়নে অর্জিত অগ্রগতি ধরে রাখতে সরকার ‘পুনরুদ্ধার-পুনর্বাসন-পুনর্গঠন’ এই তিন স্তরের কৌশল গ্রহণ করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসডিজির সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত সহযোগিতা। আশা করি, তিনদিনের এই সম্মেলনে প্রতিটি সমন্বয়কারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের অভীষ্টভিত্তিক অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
গ্রাম থেকে এসডিজি বাস্তবায়নের পরীক্ষা : এসডিজির স্থানীয় বাস্তবায়নকে গুরুত্ব দিয়ে প্রথমবারের মতো তিনটি গ্রামকে পরীক্ষামূলকভাবে ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসাবে নেওয়া হয়েছে। এসব গ্রামে একসঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, কৃষক কার্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ঋণ, স্কুলের পোশাক, মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রাম পর্যটন, নীল অর্থনীতিভিত্তিক কর্মসংস্থান, ‘এক গ্রাম-এক পণ্য’, বৃক্ষরোপণ ও খাল খননের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক সুরক্ষা, মানবসম্পদ, পরিবেশ ও সুশাসনের সঙ্গে যুক্ত করার বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এসডিজি বাস্তবায়নে সরকার একা সফল হতে পারবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এসএম শাকিল আখতার এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
গণতান্ত্রিক, মানবিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র : প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে থাকবে অবাধ নির্বাচন, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি। একটি মানবিক রাষ্ট্র যেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নাগরিক অধিকার হবে সর্বজনীন এবং একটি কল্যাণ রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক সুযোগ ও আন্তঃপ্রজন্ম ন্যায্যতা নিশ্চিত থাকবে।
জুলাই শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ’৭১ ও ’২৪-এ যারা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের লক্ষ্য ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য লড়াই করা, যেখানে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে এবং সবাই শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। সোমবার বিকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ সভাকক্ষে আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ স্কাউটসের শহীদ পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে’ তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ স্কাউটসের শহীদ পরিবারের ১০ জনকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। তাদের হাতে আর্থিক অনুদানের চেক ও সম্মাননা পদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বাংলাদেশ স্কাউটসের সভাপতি নাসিমুল গণি, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিনসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
