রংপুর সিটি করপোরেশন
রাজস্ব যেত চক্রের পকেটে তৈরি হতো ভুয়া রসিদ
মাহবুব রহমান, রংপুর
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) অর্ধশত কোটি টাকার রাজস্ব হাতিয়ে নিয়েছে জালিয়াতচক্র। সাবেক মেয়র জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা ও তার সিন্ডিকেট বিভিন্ন এনজিও এবং বড় প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিয়ে নানা কৌশলে বাগিয়ে নিয়েছে এসব অর্থ। কখনো বহুতল ভবনকে ছোট দেখিয়ে কম কর আদায়, কখনো আদায়কৃত রাজস্ব সরকারি অ্যাকাউন্টে জমা না দিয়ে, কখনো ব্যাংকের সিল-স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া জমা রসিদ তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন মেয়র, সম্পত্তি শাখার কর্মকর্তা, সার্ভেয়ার ও কর আদায় শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গত সাত বছরে কয়েক কোটি টাকা করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি যুগান্তরের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
এর আগে এসব ঘটনায় মাঝেমধ্যে তদন্তে দুর্নীতি প্রমাণিত হলে দু-একজন চুনোপুঁটি ধরা পড়লেও রাঘববোয়ালরা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন। তবে সরকারি রাজস্ব ফাঁকির এমন অভিনব কৌশল প্রকাশ্যে আসায় সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা একে নজিরবিহীন বলে স্বীকার করেছেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, নগরীর দর্শনা রোডের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বুরো বাংলাদেশ’-এর ভবন ১০ তলা। অথচ রসিকের জালিয়াতচক্র একে কাগজে-কলমে দ্বিতল দেখিয়ে কর হিসাব করেছে। ‘সেন্টার ফর হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট’-এর কার্যক্রম চালানো ওই ভবনের প্রতিটি ফ্লোরের আয়তন ৭ হাজার ১৬ দশমিক ৯ বর্গফুট। সেই হিসাবে ওই ভবনের মোট বার্ষিক কর দাঁড়ায় ৪ লাখ ২১ হাজার টাকা। অথচ চার বছরের বকেয়াসহ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওই ভবনের কর আদায় করা হয়েছে মাত্র ৪৮ হাজার ৯১৭ টাকা।
তবে রাজস্ব ফাঁকির এই অভিযোগ অস্বীকার করে বুরো বাংলাদেশের রংপুর আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. মোতাহারুল ইসলাম বলেন, সিটি করপোরেশন রাজস্ব শাখা থেকে দাবি করা টাকাই আমরা দিয়েছি।
একই জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে নগরীর ধাপ রোড এলাকার ‘আলমি বাড়ি’ নামের একটি পাঁচতলা ভবনের ক্ষেত্রেও। সম্প্রতি ভবনটি কিনেছে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেড। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই ভবনের বকেয়া কর ছিল ৯ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮০ টাকা। এই তথ্য গোপন রেখে ভুয়া কর পরিশোধ দেখানোর তথ্য সম্প্রতি মিডিয়ায় ফাঁস হয়। এ বিষয়ে জানতে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রংপুর শাখার ব্যবস্থাপক আব্দুল আহাদ বলেন, এটি আমরা কিনেছি। এর আগের মালিক কী করেছেন, তা আমরা জানি না।
জানা যায়, করদাতাদের বিশ্বাস অর্জন এবং নিজেদের চুরি আড়াল করতে রসিকের ও ব্যাংকের ভুয়া সিল তৈরি করে জালিয়াত সিন্ডিকেটটি লাখ লাখ টাকা নিয়ে বিলের কপিতে ওই জাল সিল দিয়ে দিত। এই টাকা সরকারি ব্যাংক হিসাবে জমা পড়ত না। নগরীর কেল্লাবন্দ এলাকার বাসিন্দা ফিরোজুল ইসলাম, দেওয়ানবাড়ী রোড এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীরসহ অনেকে এমন জালিয়াতির শিকার হয়েছেন।
এমন জালিয়াতির তথ্য স্বীকার করে রসিকের বর্তমান কর আদায় শাখার প্রধান হুমায়ুন কবির সরকার বলেন, নিয়মের তোয়াক্কা না করে এক অভিনব জালিয়াতি করে কর আদায়ের টাকা লুটপাট করা হয়েছে। ওই সাত বছরে অর্ধশত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ জালিয়াতির ঘটনার সময়ে এ শাখার দায়িত্বে ছিলেন মোহাম্মদ আলী। তিনি বর্তমানে পদোন্নতি পেয়ে স্বাস্থ্য শাখার প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোহাম্মদ আলীর কার্যালয়ে সরাসরি গিয়ে কথা বললে তিনি কোনো বক্তব্য দেবেন না বলে জানান।
রাজস্ব শাখার একটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে এই দুর্নীতির প্রমাণ ধ্বংস করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এর আগে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক করদাতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায়ের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি করা হয়। ওই বছরের নভেম্বরে সেসময়ের মেয়রের কাছে সেই প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, তৎকালীন প্রধান কর আদায়কারী ও কম্পিউটার অপারেটররা মিলে ওই জালিয়াতি করেছেন। ওই কমিটির সদস্য সহকারী হিসাবরক্ষক নিশীথ রঞ্জন দাস বলেন, জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছি। তা উল্লেখ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল।
তবে তৎকালীন মেয়র মোস্তাফিজার রহমান বলেন, এ ধরনের কোনো প্রতিবেদন আমার কাছে আসেনি। সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘ সময়ের এই জালিয়াতির বিষয়ে আমি জানি না।
সম্প্রতি এমন এক জালিয়াতির ঘটনায় রসিকের দুই কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন বর্তমান প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন। বরখাস্ত হওয়া কর্মচারী দুজন হলেন সহকারী কর আদায়কারী মো. আয়েজউদ্দীন ও বাজার সহকারী মো. আনোয়ারুল হক।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব অপকর্মের মূলে ছিলেন কম্পিউটার অপারেটর জাতীয় ছাত্র সমাজের সাবেক জেলা আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম ও মাসুদ রানা। তারা এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এ চক্রের অন্যরা হলেন হিসাব শাখার রবিউল ইসলাম, সাবেক সহকারী কর নির্ধারক রাজন মিয়া, সহকারী কর আদায়কারী শফিকুল ইসলাম, সাবেক কর আদায় শাখার প্রধান মোহাম্মদ আলী। তারা জানিয়েছেন, তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কাজ করেছেন। তারা অনিয়মের বিষয়ে কিছু জানেন না।
রসিকের সাবেক প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায় বলেন, ‘আমি এখন এসব বিষয়ে কিছু মনে করতে পারছি না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অফিসে গিয়ে খোঁজ নিতে পারেন।’
করপোরেশনের সচিব রাকিব হাসান বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যোগদানের পর গত জানুয়ারিতে জালিয়াতির বিষয়টি জানতে পারি। সে পরিপ্রেক্ষিতে ২০ জানুয়ারি হোল্ডিং ট্যাক্স শাখার কর আদায়ের অব্যবস্থাপনা ও জালিয়াতি সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মার্চে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চেয়ে পুনরায় মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়। রসিকের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এখন তারা এ বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
