দেড় বছরে আম্মারের সহিংস কর্মকাণ্ড
তিন তদন্ত কমিটি, রিপোর্ট জমা পড়েনি একটিরও
Advertisement
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সালাহউদ্দিন আম্মার, শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই নন, সারা দেশের শিক্ষাঙ্গনে বহুল আলোচিত-সমালোচিত একটি নাম। রাকসুর জিএস আম্মারের নেতৃত্বে রাবি ক্যাম্পাসে ছোট-বড় অন্তত দশটি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে তিনটি বড় ঘটনা তদন্তে কমিটি করে রাবি প্রশাসন। কিন্তু গত দেড় বছরে একটি কমিটিরও প্রতিবেদন জমা হয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে।
২০২৫ সালের জুলাইতে জুলাই আন্দোলনের বর্ষপূর্তিতে রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ও শিল্প বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে নিজের স্বাক্ষরে চিঠি লিখে কোটি টাকা চাঁদা সংগ্রহে নামেন। এমন কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা শুরু হলে কিছু টাকা আদায়ের পর পিছু হটেন আম্মার। গত মাসে বেলচা হাতে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ঢুকে পাঠরত দুই শিক্ষার্থীকে নৃশংস কায়দায় নির্যাতন করে আবারও দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন আম্মার। সর্বশেষ দেখা যায়, রাকসু জিএস আম্মার ও তার সহযোগীরা রাকসু তহবিলের কোটি টাকা তুলে খরচের হিসাব দেননি। বৃহস্পতিবার ছাত্রদলসহ আরও কয়েকটি ছাত্রসংগঠন শিক্ষার্থীদের এই টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আম্মারসহ রাকসু নেতাদের শাস্তি দাবি করেন।
২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবরের রাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে আম্মার জিএস নির্বাচিত হন। ছাত্রশিবিরের ছায়াসঙ্গী আম্মার সব সময় দাবি করে এসেছেন শিবিরে তার কোনো পদ নেই কিন্তু তিনি পরিবেশগত শিবির। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানান, আম্মার যখনই ক্যাম্পাসে কোনো সহিংসতায় জড়িয়েছে, তার ঢাল হিসাবে পাশে দাঁড়িয়েছে শিবিরের নেতাকর্মীরা। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আম্মারের সহিংস কর্মকাণ্ডের তিনটি ঘটনায় পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কিন্তু দেড় বছরেও একটি তদন্ত কমিটিও কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো প্রতিবেদন দাখিল করেনি। ফলে একের পর এক নৈরাজ্য করেও আম্মার থেকে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। যার ফলে আম্মার হয়েছেন আরও বেপরোয়া।
গত বছরের ২ জানুয়ারি রাবিতে পোষ্য কোটা পুরোপুরি বাতিলের দাবিতে বহিরাগতদের নিয়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয় আম্মার বাহিনী। আম্মার ও তার সহযোগীরা দিনভর লাঠি ও লোহার রড হাতে ভবনের প্রধান ফটক আগলে রাখেন। ক্যাম্পাসে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকলেও আম্মার বাহিনীর ভয়ে তারাও বন্দিদশায় থাকা ২৫০ জন মানুষকে মুক্ত করতে এগিয়ে যায়নি। রাবি প্রশাসনের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ১৪ ঘণ্টা পর রাত ১১টায় প্রধান ফটকের তালা খুলে দেওয়া হয়। এ ঘটনার পরদিন রাবির তৎকালীন প্রশাসন পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলামকে প্রধান করে ১২ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। দুই সপ্তাহের মধ্যে উপাচার্যের দপ্তরে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কমিটিকে। কিন্তু ঘটনার এক বছর আট মাস পরও তদন্ত কমিটি কোনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম শনিবার জানান, কিছু সুপারিশসহ প্রতিবেদন দ্রুত সময়ে জমা হবে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।
অন্যদিকে গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর পোষ্য কোটা আন্দোলনের জের হিসাবে রাবির জুবেরি ভবনে তৎকালীন উপ-উপাচার্য ড. মাঈন উদ্দিনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শারীরিক হেনস্তা, মারধর ও লাঞ্ছিত করে আম্মার বাহিনী। ঘটনা তদন্তে পরদিন ২১ সেপ্টেম্বর রাবি প্রশাসন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এম ফখরুল ইসলামকে প্রধান করে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করেন। দুই সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে গত প্রায় এক বছরেও কমিটি কোনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেননি। কমিটির প্রধান সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক এম. ফখরুল ইসলাম বলেন, আগামী সপ্তাহে তারা উপাচার্য বরাবর প্রতিবেদন জমা দেবেন।
সবশেষ ২৭ জুলাই আম্মার বাহিনী ও শিবিরের একদল সহযোগী ক্যাডার সহযোগে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে পাঠরত দুই শিক্ষার্থীকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে জখম করে। খোদ আম্মার বেলচা হাতে দুই শিক্ষার্থীকে পেটায় বলে অভিযোগ উঠেছে ভুক্তভোগীদের পক্ষে। এঘটনার ভিডিওচিত্র গণমাধ্যমসহ সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হলে ২৮ জুলাই উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম, প্রাণ রসায়ন ও অনুজীব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজাউল করিমকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কবে নাগাদ প্রতিবেদন জমা হবে-জানতে চাইলে অধ্যাপক রেজাউল করিম বলেন, দ্রুত সময়ে প্রতিবেদন দাখিল হবে বলে নিশ্চিত করেন তিনি। রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের বিভিন্ন সহিংস ঘটনার বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা না হওয়া প্রসঙ্গে রাবির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলীম শনিবার জানান, ১৩ আগস্ট সিন্ডিকেট সভায় তিনটি প্রতিবেদন এখনো কেন জমা হয়নি তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রতিবেদনগুলো দ্রুত সময়ে জমা দিতে কমিটির প্রধানদেরকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কমিটির প্রধানরা কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করেছেন চলতি মাসের মধ্যে অন্তত দুটি প্রতিবেদন জমা হবে।
