আয়নাঘরের মর্মস্পর্শী বর্ণনা আযমী ও সাদাতের
অপহরণ ও গুম বন্ধে কঠোর আইন দাবি
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুমের শিকার হয়ে দীর্ঘদিন গোপন বন্দিশালার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন বিএনপি-জামায়াতসহ ভিন্ন মতাদর্শের শত-সহস্র মানুষ। গুমের শিকার হয়ে পরিবার ও স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যারা এক সময় মৃত্যুর প্রহর গুনেছিলেন, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের অনেকেই ফিরে এসেছেন। তবে বন্দিদশা থেকে ফিরে এলেও তাদের মন থেকে মুছে যায়নি সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর স্মৃতি। এখনো সেই দৃশ্য চিন্তা করলে আঁতকে ওঠেন তারা। যারা জীবন নিয়ে ফিরতে পেরেছেন তাদের মধ্যে বিএনপি নেতা ও ব্যবসায়ী সৈয়দ সাদাত আহমেদ এবং সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমীর সঙ্গে সেই ভয়ংকর দিনগুলোর বিষয়ে নিয়ে কথা হয় যুগান্তর প্রতিবেদকের। দুজনের বক্তব্যে উঠে এসেছে কষ্টের এক সুর।
আয়নাঘরের মতো আর কোনো অন্ধকার প্রকোষ্ঠ চান না তারা। আর কোনো নাগরিকের সঙ্গে যেন ভবিষ্যতে কোনো সরকার আওয়ামী লীগের মতো এমন নিষ্ঠুরতা না করে সে জন্য জাতীয় সংসদে আইন পাশ করা উচিত বলে তারা মনে করেন।
সাদাত আহমেদের ১৩০ দিনের রুদ্ধদ্বার বন্দিদশা ও আযমীর প্রায় ৮ বছরের দীর্ঘ নিঃসঙ্গ বন্দিদশার কথা বলতে গেয়ে তারা জানিয়েছেন, একাত্তরের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চেয়েও নির্মম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন হয় তাদের ওপর। এই দুই ভুক্তভোগীর ভাষ্য, গুম কেবল একজন ব্যক্তির ওপর ব্যক্তিগত নির্যাতন নয়, এটি ছিল পুরো পরিবারকে তিলে তিলে শেষ করে দেওয়ার এক পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় ট্রমা। তারা মুক্ত আকাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের ওপর চলা এই নিপীড়নের বিচার দাবি করে বলছেন-বাংলাদেশের মাটিতে যেন আর কখনো কোনো নাগরিককে এমন বিচারবহির্ভূত রাষ্ট্রীয় গুম ও ‘আয়নাঘর’ নামক ভয়াল সংস্কৃতির শিকার হতে না হয়।
ভবিষ্যতে যাতে কাউকে বিচারবহির্ভূত গুম কিংবা নির্যাতনের শিকার হতে না হয়, সে লক্ষ্যে জরুরি সংস্কারের প্রস্তাব তুলে ধরেন গুমের শিকার হওয়া আযমী ও সাদাত। একই সঙ্গে গুমের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে সহায়তার নামে সিলেক্টেড সুবিধা প্রদান এবং নিজ দলের অভ্যন্তরীণ অবমূল্যায়নের বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তারা।
যুগান্তরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট রাতে রাজধানীর মগবাজারের বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নেওয়া হয়। দীর্ঘ প্রায় ৮ বছর সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও অজ্ঞাত স্থানে (গোপন বন্দিশালায়) আটকে রাখা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৬ ও ৭ আগস্টের মধ্যবর্তী রাতে তাকে চোখ বাঁধা অবস্থায় মুক্ত করে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, গুম ও জোরপূর্বক আটক প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তা মেনে চলার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। আমান আযমী বলেন, জুলাই বিপ্লবে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ও বয়স নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। তৎকালীন শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে জাতি অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ না দিয়ে এই ঐক্য ধরে রাখতে অরাজনৈতিকভাবে সিভিল-সামরিক বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে কাজ করছেন বলে জানান। সামরিক বাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে অরাজনৈতিক রাখার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়ে তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক প্রভাব দিয়ে প্রমোশন বোর্ডে তালিকা পাঠানো বন্ধ করতে হবে। যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিত করা উচিত।
অতীতে সেনাপ্রধানরা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেননি মন্তব্য করে আযমী বলেন, অন্যায় আদেশের প্রতিবাদ করার সাহস থাকতে হবে। গুম ও বেআইনি আটক বন্ধ করতে তিনি নতুন আইন প্রণয়ন ও বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ দাবি করেন। তিনি মন্তব্য করেন, আইনবহির্ভূত আদেশ মানা অপরাধ। ভবিষ্যতে গোয়েন্দা সংস্থা বা কোনো বাহিনীকে যেন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা না হয়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রপতিকে সংসদ-সদস্য বা দলীয় প্রতিনিধি হিসাবে না দেখে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত করার কথা বলেন তিনি, যাতে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০-কে মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের পরিপন্থি উল্লেখ করে এটি বাতিলের দাবি জানান। তিনি বলেন, সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে যে, ধর্মীয় বিধান বা কুরআনের নির্দেশের পরিপন্থি কোনো আইন সংসদে পাশ করা যাবে না। বন্দিদশার স্মৃতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, ওই দীর্ঘ অন্ধকার সময়ে আল্লাহর ওপর ভরসাই ছিল তার মূল শক্তি। অন্যদিকে শনিবার মুঠোফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপি নেতা সৈয়দ সাদাত আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, নাগরিক অধিকার ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈদেশিক বিভিন্ন ফান্ড বা সহায়তার একটি কার্যকর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ ব্যবস্থা দরকার।
গুম ও রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গুমের তালিকা ও সাহায্য-সহযোগিতার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হয়নি। সুবিধাবঞ্চিতদের বাদ দিয়ে কেবল উচ্চশ্রেণি বা সুবিধাজনক ব্যক্তিদের কেন্দ্র করে কাজ করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, স্বজন হারানো প্রকৃত ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বাস্তবে এসব সুবিধা পাচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি বলেন, গুমের শিকার হওয়ার পরও দলকে সার্ভিস দেওয়ার সুদীর্ঘ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও আমাকে বা আমার পরিবারকে কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি।
গুম হওয়ার সেই ভয়াল অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে সৈয়দ সাদাত আহমেদ জানান, কুরবানির ঈদের কিছুদিন আগে হঠাৎ করেই সিভিল ড্রেসে আসা ৩টি মাইক্রোবাসে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি তাকে তুলে নিয়ে যায়। আওয়ামী লীগ সরকার যখন বিএনপিকে দমাতে উঠেপড়ে লেগেছিল, তখনই তাকে টার্গেট করা হয়। তুলে নেওয়ার পর প্রথমেই একটি পুরোনো, দুর্গন্ধযুক্ত এবং জরাজীর্ণ ভবনের কুঠুরিতে বন্দি করা হয়। বন্দিশালার ভয়াবহ চিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, কক্ষগুলোতে দিনের আলো প্রবেশের কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে দিন, বিকাল নাকি রাত-তা বোঝার কোনো উপায় ছিল না। তিনি বলেন, কিউবার কুখ্যাত ‘গুয়ানতানামো বে’ কারাগারের সেলগুলোর চেয়েও আয়নাঘরের পরিবেশ করুণ ছিল। জিজ্ঞাসাবাদকালে একদল কর্মকর্তা কঠোর এবং অন্যদল নরম সুরে কথা বলে মাইন্ড গেম খেলত। আর কাঙ্ক্ষিত বক্তব্য না পেলে চালানো হতো মারাত্মক শারীরিক নির্যাতন। ছোট ছোট খোপের মতো তৈরি করা এসব বন্দিশালায় অন্য মানুষের উপস্থিতি টের পাওয়া যেত, তবে ভয়ভীতির কারণে কেউ কারও সঙ্গে কথা বলার সাহস পেতেন না।
তিনি জানান, ১৩০ দিন আয়নাঘরে বন্দি রাখার পর তাকে তুলনামূলক ছোট আরেকটি সেলে স্থানান্তর করা হয়। পরে চোখ ও হাত বেঁধে গাড়িতে করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ডিবি কার্যালয়ে তাকে ২৮ দিনের মতো রাখা হয় এবং পরে রামপুরা ব্রিজ থেকে নাটকীয় গ্রেফতারের গল্প সাজিয়ে টিভিতে স্ক্রল আকারে দেখানো হয় বলে উল্লেখ করেন। তিনি আওয়ামী সরকারের সময়ে গুম ও জোরপূর্বক আটকের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধে সংসদে কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি জানান।

