Logo
Logo
×
   

Advertisement

নগর-মহানগর

ধর্ষণের শিকার শিশুর সন্তান জন্মদানের লড়াই

‘চকলেট দেব আয়’ ফাঁদে সর্বনাশ

Advertisement

শিপন হাবীব

শিপন হাবীব

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

‘চকলেট দেব আয়’ ফাঁদে সর্বনাশ

Advertisement

চকলেট দেব আয়-এমন ফাঁদে সাড়া দিয়ে বহু অবুঝ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ঘরে-বাইরে, এমনকি অন্দরমহলেও এভাবে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে তারা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অহরহ ঘটছে এমন বর্বর কাণ্ড। এতে শত শত অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এবং জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হচ্ছে। এমনকি বহু শিশু জন্ম দিচ্ছে সন্তান। এসব ঘটনায় প্রতিবছর কয়েকটি মামলা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভয়াবহ বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য-ছোট্ট শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে গর্ভধারণ করলেও অনেক পরিবার আইনের আশ্রয় নেয় না। সামাজিক বিচ্যুতি, মেয়ের ভবিষ্যৎসহ বিয়ে এবং প্রভাবশালীদের চাপে ঘটনাগুলো আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণে সন্তান জন্ম দেওয়া নেত্রকোনার মদনের ১১ বছরের শিশুটির ঘটনায় ফের বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনায় এসেছে। এ ঘটনায় পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। এদিকে ডিএনএ পরীক্ষায় ওই নবজাতকের সঙ্গে অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষক আমানুল্লাহ মাহমুদী ওরফে সাগরের ডিএনএ-এর মিল পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ৬ মে ধর্ষক আমানুল্লাহ মাহমুদী সাগরকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এ ঘটনায় বিচারকাজ চলছে।

সর্বশেষ ২৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে এমন ফাঁদে আরেক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার পর আমিরুল নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

এর কয়েক মাস আগে চট্টগ্রামের খুলশীতে চকলেট ও ফলের লোভ দেখিয়ে ১০ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে মোতালেব নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। মে মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে চকলেট দেওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে রিপন মিয়া এক শিশুকে ধর্ষণ করে। এতে শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। মামলার পর ওই ব্যক্তিকে জেলে পাঠিয়েছেন আদালত।

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে জুলাইয়ে ১১ বছর বয়সি এক শিশুকে চকলেটের লোভ দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে বৈদ্যনাথ নামে এক প্রতিবেশী ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত বছরের ২৮ এপ্রিল রাজধানীর শ্যামপুর এলাকায় একই প্রলোভন দেখিয়ে ৫ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ওই সময় শিশুটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দীর্ঘদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এর আগে ঠাকুরগাঁও বালিয়াডাঙ্গীতে ধর্ষণে ১১ বছরের শিশু অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে।

পুলিশ বলছে, বছরে গড়ে প্রায় সাত হাজার ধর্ষণের মামলা হচ্ছে। আর মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, প্রতিবছর ধর্ষণের ঘটনায় পাঁচ হাজারের মতো মামলা হলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৩৫টি। এর মধ্যে ৬৫টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা।

বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার গবেষণামতে, ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ লোকলজ্জা বা দেরিতে বুঝতে পারায় অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ছে। ধর্ষণের পর ভুক্তভোগী নারী ও শিশুর মধ্যে অনেকেই সন্তান জন্ম দিচ্ছে। আবার সামাজিক লোকলজ্জায় অধিকাংশ ভুক্তভোগী সন্তান গর্ভপাত কিংবা সন্তান জন্মের পর নানা স্থানে ফেলে দিচ্ছে।

ঢামেক হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় সময়ই উদ্ধার হচ্ছে নবজাতক। পরিত্যক্ত স্থান, ডাস্টবিন, ড্রেন, ডোবা-নালা, ঝোপঝাড় থেকে জীবিত অথবা মৃত নবজাতক মিলছে। এমন ঘটনায় জড়িতরা চিহ্নিত হচ্ছে না। পাশাপাশি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবেও দিনদিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এমন অনাকক্সিক্ষত ঘটনা।

রাজধানীর সবুজবাগ থানা সূত্রে জানা যায়, রাজু আহমেদ নামে এক যুবকের একাধিকবার ধর্ষণে ১২ বছরের এক শিশু অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সন্তান জন্ম দেয়। এ ঘটনায় ২০১৯ সালে ধর্ষকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। পাশাপাশি আদালত ওই শিশুর ২১ বছর না হওয়া পর্যন্ত ভরণপোষণ ব্যয় রাষ্ট্রকে বহনের নির্দেশ দেন।

একজন এনজিওকর্মী যুগান্তরকে বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগী সন্তান জন্ম দিলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবার পুরো ঘটনাকে দামাচাপা দিয়ে রাখে। মেয়েকে বিয়ে দিতে হবে-এমন অজুহাতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলাও করে না তারা। তিনি আরও বলেন, ২০০৭ সালে ধর্ষণে জন্ম নেওয়া শিশুকে ধর্ষকের সম্পত্তির উত্তরাধিকার দেওয়া হয়েছে। ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেন। এমন ঘটনার সংখ্যা শতকরা ১ শতাংশেরও কম।

এনজিও সূত্রের খবর, ধর্ষণের কারণে ভুক্তভোগী অন্তঃসত্ত্বা বা সন্তান জন্মের ঘটনাগুলো নামমাত্র প্রকাশ পায়। বিচার তো দূরে থাক, অধিকাংশ ঘটনাই আড়ালে থেকে যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিচার হয় না এমন বর্বর ঘটনার।

এদিকে দণ্ডবিধি অনুযায়ী গর্ভপাত সাধারণভাবে অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়। জীবনরক্ষা ছাড়া যে কোনো ধরনের গর্ভপাত একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এতেও কিছু সংকট তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম যুগান্তরকে বলেন, কন্যাশিশু ধর্ষণ হচ্ছে, অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ সন্তান জন্ম দিচ্ছে। তবে ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অপরাধীদের শাস্তি শতভাগ নিশ্চিত করা হলে এমন বর্বর ঘটনা আর ঘটত না। কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, নারী-শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ রোধে বাস্তবমুখী ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থাসহ সব স্তরের নাগরিককে দায়িত্ব নিতে হবে এবং পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম