কুমিল্লার সদর দক্ষিণ এখন ইয়াবার ‘আন্তর্জাতিক হাট’
পুলিশ-বিজিবির নাকের ডগায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ৮২ মাদক গডফাদার * মাঝেমধ্যে অভিযান হলেও শীর্ষ অপরাধীদের বাদ দিয়ে ধরা হয় চুনোপুঁটিদের
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার একবালিয়া, বলেরডেপা ও মান্দারির ওপারে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। ভৌগলিকভাবে এলাকাটি দুর্গমও। এমন অবস্থান কাজে লাগিয়ে মাদককারবারিরা সীমান্তের ওপার থেকে সর্বনাশা মাদক ইয়াবার চালান নিয়ে আসে। সীমান্তবর্তী এসব অঞ্চলে হাতবদল হয়ে সেগুলো রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় চলে যায়। স্থানীয়দের কাছে ‘ইয়াবার আন্তর্জাতিক হাট’ হিসাবে পরিচিত এই এলাকায় প্রতিদিন ব্যাগে করে লাখ লাখ টাকার মাদক কেনাবেচার জন্য ঘুরাফেরা করে দুদেশের মাদককারবারিরা। পুলিশ-বিজিবির একেবারে নাকের ডগায় এসব চললেও একেবারে ধরাছোঁয়ার বাইরে শীর্ষ মাদককারবারিরা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উপজেলার একবালিয়া, বলেরডেপা ও মান্দারি-এই তিন সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রতিদিন ভারত থেকে কয়েক লাখ টাকার ইয়াবা আসছে। ত্রিপুরা রাজ্যের সোনামুড়া এলাকার শীর্ষ মাদককারবারিরা সেখানে এসে সদর দক্ষিণের পাইকারি ক্রেতাদের সঙ্গে মিলিত হয়। জানা যায়, ৮২ শীর্ষ মাদককারবারির নিয়ন্ত্রণে এসব চলছে। অভিযোগ রয়েছে, থানা পুলিশ ও বিজিবি ক্যাম্পের দায়িত্বশীলদের ম্যানেজ করে এসব চলে। মাঝেমধ্যে এসব এলাকায় অভিযান চললেও গডফাদাররা গ্রেফতার হন না।
গডফাদাররা দুই শতাধিক সহযোগীর মাধ্যমে এসব কারবার করে। মাদক বহনে এসব অপরাধী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ব্যবহার করছে। বেশির ভাগ ইয়াবার চালান নারীদের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে।
সূত্র জানায়, এসব এলাকা ঘিরে কয়েকটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মান্দারি এলাকার মাদক নিয়ন্ত্রণ করেন নাজমুল হাসান, শামীম, শাকিল, রুবেল, ফারুক ও সুমন। সীমান্তঘেঁষা সূর্য নগর গ্রামের সিন্ডিকেটের চাবি নুরু ও জুলহাসের হাতে। খিল্লাপাড়া এলাকার নেটওয়ার্ক চালান সাইফুল, মুদ্দুত এলাকা চালান আলমগীর হোসেন এবং দলকিয়ার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে শাহীনের হাতে। এসব এলাকার আরও কয়েকজন গডফাদার হলেন আকরম আলীর ছেলে মঞ্জিল, আব্দুল মান্নানের ছেলে রাব্বি, সোলেমানের ছেলে ফয়সাল, একবালিয়ার দাড়িওয়ালা হান্নান, লিটন ও ডিপজল বিল্লাল এবং বলেরডেপার দেলোয়ার ও আকবর।
উলুরচরের বড় বাড়ির মাহবুল, আওলাদ ও আকবর হোসেন মূলত ইয়াবার চালান বিভিন্নভাবে পাঠানোর দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ইয়াবার স্পট এলাকার দায়িত্বে থাকেন লালনগরের হিরণ, লিটন, জসিম, তালতলির সুমন, দশপাড়ার রয়েল, বিল্লাল হোসেন, উলুইনের জালাল, মোশাররফ, ফারুক, মিজান। স্থানীদের অভিযোগ, এসব অভিযুক্তকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর না চেনার কথা নয়। তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এগুলোর প্রতিবাদ করলে উলটে হুমকি ও হয়রানির শিকার হতে হয়। মাদককারবারিদের এমন বেপরোয়া আচরণে এলাকার আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে।
বলেরডেপা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হক বলেন, সদর দক্ষিণ সীমান্ত এলাকা এখন ইয়াবার হাটে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে দুদেশের ইয়াবা-কারবারিরা এসব এলাকায় মিলিত হয়। মান্দারি এলাকার সুমন আহমেদ বলেন, ৮২ গডফাদার এখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। থানা পুলিশ এবং বিজিবি পোস্টের সদস্যদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ থাকতে পারে।
সদর দক্ষিণ থানার ওসি মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, সীমান্ত এলাকায় মাদকের বিস্তার একটু বেশি। নো ম্যান্স ল্যান্ডে ইচ্ছা করলেও আমরা যেতে পারি না। তবে একবালিয়া, বলেরডেপা ও মান্দারি এলাকায় অভিযান চালানো হয়। লক্ষ্মীপুর বিজিবি পোস্টের হাবিলদার সাব্বির আহমেদ বলেন, বিজিবি ইয়াবা-কারবারি দেখলেই ধাওয়া করে। তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হয় না।
কুমিল্লা-১০ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মীর আলী এজাজ বলেন, মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে। ইয়াবা-কারবারিদের ধরতে বিজিবি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। বাহিনীর কোনো সদস্য এসবের সঙ্গে জড়িত নয়। কারও বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

