Logo
Logo
×
   

নগর-মহানগর

দুই মন্ত্রীর অনুসারীরা দুই বলয়ে

সিলেট বিএনপিতে ফের বিভক্তির ছায়া

দীর্ঘদিনের চেপে রাখা ক্ষোভ, উপদলীয় কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে

Icon

সংগ্রাম সিংহ, সিলেট

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সিলেট বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরবে-এমন প্রত্যাশা ছিল সবার। তবে তা ফিকে হয়ে আসছে। দীর্ঘদিন চেপে রাখা ক্ষোভ, উপদলীয় কোন্দল ও সাংগঠনিক সমন্বয়হীনতা পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ইতোমধ্যে দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর অনুসারীরা দুটি বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে অতীতে এই জেলায় নির্মমভাবে প্রাণ হারান ছাত্রদলনেতা মুন্নাসহ প্রায় এক ডজন সম্ভাবনাময় নেতাকর্মী।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরই পাথর কোয়ারী লুটের ঘটনায় ব্যাপক সমালোচিত হন জেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতারা। গ্রেফতার, বহিষ্কার হন কোম্পানীগঞ্জ বিএনপির সভাপতি শাহাব উদ্দিন। কিছুদিনপর কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড ও বালুমহাল নিয়ে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদল মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এসব কারণে ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে গোয়াইনঘাট উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক শাহাজাহান সিদ্দিকীকে বহিষ্কার করা হয়। পরে ৪ নভেম্বর (২০২৪) ঘোষিত ১৭০ সদস্যের মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নির্বাচিত সভাপতি নাসিম হোসাইনকে বাদ দিয়ে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় রেজাউল হাসান কয়েস লোদীকে। এর জেরে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্যানেলের চরম বিপর্যয় ঘটে। কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় কেন্দ্র থেকে কয়েস লোদী ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরীকে। বিলুপ্ত করা হয় আইনজীবী ফোরামের কমিটি।

২০২৫ সালের মে মাসে পলাতক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর ফোন কলকে কেন্দ্র করে সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী ও কয়েস লোদী পালটাপালটি সংবাদ সম্মেলন করেন। ৩০ মে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকীর সভায় আরিফুল হক চৌধুরী ও কয়েস লোদীর প্রকাশ্য বাগবিতণ্ডা হয়। তৈরি হয় দুই নেতার মধ্যে দূরত্ব।

পরে ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর রাতে বিশ্বনাথ পৌর শহরে বিএনপি চেয়ারপারসনের দুই উপদেষ্টা তাহসিনা রুশদী লুনা ও ড. এনামুল হক চৌধুরীর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে ৫ জন আহত হন। এরপর নির্বাচনি ডামাডোল শুরু হতেই সিলেট-১ আসনে খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ও সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর বলয় এবং সিলেট-৩ আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, ব্যারিস্টার আবদুস সালাম ও এমএ মালিকের অনুসারীদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়।

মনোনয়ন জটিলতার মাঝে গত বছরের নভেম্বরে মহানগর বিএনপি নেতা নাসিম হোসাইনের পদ স্থগিতাদেশ বাতিল করে কেন্দ্র। পুনরায় চলতি বছরের ৬ আগস্ট তাকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব দেওয়া হলেও ২ সেপ্টেম্বর ঘোষিত নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে কয়েস লোদীকেই পুনরায় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দেখানো হয়। এ নিয়ে সৃষ্টি হয় চরম বিভ্রান্তি।

গত মঙ্গলবার ছিল বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এদিন নিজ বাড়িতে মহানগর বিএনপির কার্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ওই অনুষ্ঠানে সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও বর্তমান সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীসহ একাধিক শীর্ষ নেতাকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে দলের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসে।

দাওয়াত না পাওয়ার বিষয়ে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘অনুষ্ঠানের খবর জানি না, যাইনি। সেদিন জেলায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান নিয়ে আমি ব্যস্ত ছিলাম।’

সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপির সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘চরম দুর্দিনে মহানগর বিএনপির শীর্ষ দায়িত্বে ছিলাম, সংগঠনকে গুছিয়েছি। মাত্র কদিন আগে দায়িত্ব ছাড়লাম, ন্যূনতম দাওয়াতটুকু পাওয়ার অধিকার কি আমার নাই? আমি মহানগরের প্রস্তাবিত নয়, কেন্দ্রের অনুমোদিত কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলাম।’

এ বিষয়ে মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘মহানগর বিএনপির অফিস উদ্বোধন হওয়ায় সব ওয়ার্ডের দায়িত্বশীলদের দাওয়াত করেছিলাম। এর বাইরে মন্ত্রীর সঙ্গে অনেকে আসেন এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। সবেমাত্র অফিস উদ্বোধন হয়েছে, সামনে আরও অনুষ্ঠান হবে। নিশ্চয়ই সবাই দাওয়াত পাবেন।’

সিলেট বিএনপিতে সাংগঠনিক সমন্বয়হীনতার বিষয়ে কথা বলতে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এমপিকে মুঠোফোনে কল করা হলেও তারা রিসিভ করেননি।

উল্লেখ্য, সিলেট বিএনপিতে বিরোধের ইতিহাস অন্তত চার দশকের পুরোনো। সিলেট-১ আসনে তিনবার এমপি ছিলেন খন্দকার আব্দুল মালিক। তিনি বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের বাবা। সময়ের ব্যবধানে সিলেটের রাজনীতিতে এম সাইফুর রহমান সক্রিয় হয়ে উঠলে খন্দকার আব্দুল মালিকের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। সিলেট বিএনপিতে দৃশ্যমান হয় সমান্তরাল দুটি ধারা। এক পর্যায়ে জেলার পুরোটাই দখলে যায় সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের। টানা প্রায় দেড়যুগ সাইফুর রহমানের একচ্ছত্র আধিপত্য চলাকালেই আরেকটি বিপরীত বলয় তৈরি হয় এম ইলিয়াস আলীকে ঘিরে। দুটি বলয়ে বিভক্ত হয় সিলেট জেলা বিএনপি। নিখোঁজ হওয়ার আগ পর্যন্ত ইলিয়াস আলীর বলয়টি রাজপথে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। তবে ইলিয়াস নিখোঁজের পর তার অনুসারীরা কেউ কেউ সাইফুর বলয়ে ভিড়েন, অন্যরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। সাইফুর ও ইলিয়াসের অবর্তমানে সিলেট বিএনপির নিয়ন্ত্রণ যায় সাইফুরের রাজনৈতিক উত্তরসূরি আরিফুল হকের হাতে। কাউন্সিলর থেকে একাধিকবার মেয়রের চেয়ারে বসা আরিফুল হক সংসদ নির্বাচমুখি হলে তার মুখোমুখি হন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বিগত সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে মুক্তাদির এবং সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হন আরিফুল। জয়ী হয়ে দুজনেই মন্ত্রী হন। মন্ত্রী হওয়ার পর দুজনের অনুসারীদের মধ্যে ক্ষমতার ছায়া পড়েছে। এখন তারা পরস্পরকে এড়িয়ে চলছেন।

দলের সিনিয়র ত্যাগী নেতারা বলছেন, এখনই লাগাম না টানলে সিলেট বিএনপিকে পুরোনো গ্রুপিং-বিভক্তির ‘ঘোড়ারোগ’ পেয়ে বসতে পারে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম